এইভাবে বিনয়বাবু যেন অনেক কিছু এড়িয়ে গেলেন।
টগার হঠাৎ মহেন্দ্রর একটা কথা মনে পড়ে গেল। বলল, আচ্ছা, একটু আগে আপনি বললেন, এই ভূতটি কিংবা দেবতাটি মাঝে মাঝে বলি চান। এটা আপনি বিশ্বাস করেন?
প্রশান্ত হেসে পাদ্রিবাবা বললেন, আমার বিশ্বাস-অবিশ্বাসের কথা থাক। বই-এ পড়েছিলাম এঁরাও মাঝে মাঝে ক্ষুধিত হন। ক্ষুধিত হলেই গর্জন করেন। সে সময়ে কেউ যদি শিশু মাংস দিতে পারে তার ওপর তিনি খুশি হন। তাকে সর্বশক্তিমান করে দেন।
টগা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেল। মনে মনে বলল, এইজনেই বুঝি ফার্নান্ডেজের আদিবাসীদের একটা ছেলের দরকার পড়েছিল?
বিনয়বাবু জিগ্যেস করলে, আপনার আর কিছু প্রশ্ন আছে?
টগা বলল, আপনার মতো জ্ঞানী মানুষের কাছে বসে থেকে আরও অনেক কিছু জানতে ইচ্ছে করে। কিন্তু আপনার সময়ের দাম আছে। তবু জিগ্যেস করি–আজ না হয় আপনার বয়েস হয়েছে। কিন্তু অল্প বয়েসে কখনও ব্যাপারটা স্বচক্ষে দেখে আসতে ইচ্ছে করেনি?
বিনয়বাবু স্বচ্ছন্দে মাথা নেড়ে বললেন, না।
কেন?
বিনয়বাবু বললেন, দেখুন, মানুষ যতই অহংকার করুক তার জ্ঞানের পুঁজি কিন্তু খুব অল্প। এই পৃথিবীতে কত-না অজানা রহস্য লুকিয়ে আছে, তার কতটুকু মানুষ সমাধান করতে পেরেছে! সব রহস্য জেনে ফেলে লাভই বা কী? আর জানাটা কি খুব সহজসাধ্য? মোটেই না। হিমালয়ের এক-একটা শৃঙ্গ আবিষ্কার করা যায় কিন্তু হিমালয়ের বিশাল দেহে গভীর জঙ্গলে এখনও কত রকম হিংস্র, নিরীহ প্রাণী লুকিয়ে আছে, তা কি সব আবিষ্কৃত হয়েছে বলে মনে করেন? না, হয়নি। তাতে মানুষের কোনো ক্ষতিও হয়নি।
একটু থেমে বললেন, পশ্চিম পাহাড়-অঞ্চলে এখনও বিরাট বিরাট বাড়ির ধ্বংসাবশেষ পড়ে আছে বলে শুনেছি। ওখানে নাকি এক সময়ে অত্যাচারী নীলকর সাহেবরা ছিল। অকথ্য অত্যাচার করেছে তারা গরিব দুর্বল চাষীদের ওপর। অনেক চাষীকে মরতে হয়েছে। কেউ কেউ বলে তাদের আত্মা এখনও প্রতিশোধ নেবার জন্যে ঘুরে বেড়ায় ঐ অঞ্চলে। আবার টম সাহেবের কথাও শুনেছি। তার নাকি বিরাট একটা হাউন্ড বা শিকারী কুকুর ছিল। চাষীদের পিছনে হাউন্ডটাকে লেলিয়ে দিত। হাউন্ডটা তাদের দাঁতে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলত।
তারপর একদিন নীলচাষীরা হৈ হৈ করে গিয়ে হাউন্ডটার খাঁচায় আগুন ধরিয়ে দেয়। সেদিন টম সাহেব গুলি করে অনেক নীলচাষীকে মেরেছিল কিন্তু আগুনের হাত থেকে টমও বাঁচেনি, তার শয়তান কুকুরটাও না। বই-এ লেখা না থাকলেও এখানকার অনেকে বিশ্বাস করে সেই হাউন্ডটার প্রেতাত্মা নাকি এখনও পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়ায় মানুষের রক্তপানের নেশায়।
এই পর্যন্ত বলে বিনয়বাবু একটু থামলেন। বললেন, এসব আমি যেমন বিশ্বাস করি না তেমনি অবিশ্বাস করার সাধ্যও আমার নেই তপেন্দুবাবু। তাই ভাবি, কিছু কিছু রহস্য না হয় অমীমাংসিতই থাক। ক্ষতি কী?
টগা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, যাবার সময় আমার শেষ প্রশ্ন–যদিও মিস্টার ফার্নান্ডেজের সঙ্গে আপনার দেখা হয়নি তবু তাঁর সম্বন্ধে আপনার ধারণা কিরকম?
হঠাৎ এ কথায় বিনয়বাবুর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। কঠিন গলায় বললেন, শুনুন, তিনি আমার সঙ্গে দেখা করেননি সেটা ওঁর মতো লোকের পক্ষে কিছু অস্বাভাবিক নয়। ভদ্রলোকটি নামেই একজন পাদ্রি। আসলে একজন বিপজ্জনক মানুষ। আপনি আমার ছেলের মতো তাই পরামর্শ দিচ্ছি যতটা সম্ভব ওঁকে এড়িয়ে চলবেন। এখানে উনি মাঝে মাঝে যে আসেন সেটা যে কতটা অসৎ উদ্দেশ্যে তা ভাবতে পারবেন না।
টগা অবাক হয়ে জিগ্যেস করল, আপনি তার সঙ্গে একটি কথাও না বলে তাকে জানলেন কি করে?
একটু অপেক্ষা করুন। বলে বিনয়বাবু ভেতরে চেলে গেলেন। একটু পরে ফিরলেন একটা খাম হাতে করে।
বাঙ্গালোর চার্চ থেকে এই টেলিগ্রামটা আমার নামে এসেছিল। পড়ে দেখলেই বুঝতে পারবেন কেন তার সঙ্গে গায়ে পড়ে আলাপ করতে গিয়েছিলাম।
টগা পড়ে ফেলল। তারপর টেলিগ্রামটা ফেরত দিয়ে বলল, এখন আমার কাছে সব। পরিষ্কার হয়ে গেল। ধন্যবাদ আপনাকে। বলে টগা বেরিয়ে গেল।
.
অ্যাংরি হাউন্ড
পাদ্রিবাবার কাছ থেকে ফিরে এসে টগা খুব অন্যমনস্ক হয়ে রইল। অনেকরকম চিন্তা তার মাথায় ঘুরতে লাগল। দেখল সদাশিববাবুর কথার সঙ্গে বিনয়বাবুর কথার অনেক মিল। তবে বৃদ্ধ বিনয়বাবু এই অঞ্চলের রহস্য নিয়ে অনেক কিছু পড়াশোনা করেছেন। তবু তিনিও পরিষ্কার বলতে পারলেন না সারমেয়রাজ বলে বাস্তবে কিছু আছে, না ওটা টম সাহেবের শিকারী কুকুরের প্রেতাত্মা! না কি কুকুরের গর্জনটা প্রাকৃতিক একটা হঠাৎ শব্দ মাত্র! আসলে রহস্য নিয়ে তিনি মাথা ঘামাতে চান না। তিনি চান রহস্যটা রহস্যই থাক।
বাস্তবে কুকুর-দেবতা বা কুকুর-ভূত থাক বা না থাক পুরনো ইংরিজি বই পড়ে জেনেছেন এই সারমেয়টি মাঝে মাঝে শিশু-রক্তের জন্যে তৃষ্ণার্ত হয়ে ওঠে আর তখনই গর্জন করে। বিনয়বাবুর এই কথার সঙ্গে অদ্ভুত মিল পাওয়া গেল বন-বাংলোর মহেন্দ্র শতপথীর কথার। ফার্নান্ডেজ সাহেব নাকি ওকে আদিবাসীদের একটা ছোটো ছেলে যোগাড় করে দিতে বলেছিলেন। ফার্নান্ডেজ সাহেব যে সেই নীলকুঠিতে অন্তত একবার গিয়েছিলেন টগা তার প্রমাণ পেয়েছে। কাজেই সেই রাত্রে সেই ভয়ংকর গর্জন শোনার পর Angry Hound বা সারমেয়রাজ এর কাছে বলি দেবার জন্যেই যে ফার্নান্ডেজ সাহেব আদিবাসী-শিশুর খোঁজ করছিলেন তাতে আর সন্দেহ নেই। কিন্তু এসব তথ্য ছাড়াও বিনয়বাবু তাকে যে টেলিগ্রামটি দেখিয়েছিলেন, সেটা পড়ে টগা স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। কী উদ্দেশ্যে তার এখানে আসা সে বিষয়ে ইঙ্গিত আর সেইসঙ্গে ফার্নান্ডেজের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখার জন্যে অনুরোধ করেছিলেন বাঙ্গালোরের চার্চের কর্তৃপক্ষ। আর এইজন্যেই বিনয়বাবুর মতো একজন বৃদ্ধ পাদ্রি নিজে এসেছিলেন আলাপ করতে।
