জায়গাটা এককথায় বেশ মনোরম। উঁচু-নিচু রুক্ষ পাথুরে বটে তবু অনেকখানি সমতল জায়গা আছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে শালগাছ, আর একরকম কী পাহাড়ি গাছ–নাম জানা নেই। কাছেই চার্চ। প্রতিবছর রঙ ফেরানো হয়। চারিদিকে ফুলের বাগান। বাগানের পরিচর্যার জন্য মালী আছে। চার্চের বাইরে বাগানের ধারে ধারে লোহার বেঞ্চ। জায়গাটি নিস্তব্ধ।
বাঃ! চমৎকার জায়গাটা তো।
বিনয়বাবু দাড়িতে হাত বুলিয়ে স্নিগ্ধ হাসলেন।
কিন্তু সামনেই ফাস্ট এড বক্সটা মোটেই মানাচ্ছে না।
বিনয়বাবু বললেন, ওটা শোভাবর্ধনের জন্যে নয়, প্রয়োজনে। পাশেই ছোটো একটা ঘরকে 0.T. হিসেবে ব্যবহার করা হয়। চলনসই একজন ডাক্তারও আছেন! বুঝতেই পারছেন শুধু প্রেয়ার করলেই তো চলে না। রোগ-ব্যাধি আছে। তাকে তো অস্বীকার করা যায় না। বলে হাসলেন একটু।
টগার শুনে ভালো লাগল। এবার অন্য প্রসঙ্গ তুলল, শুনেছি আর একটা চার্চ নাকি আছে?
বিনয়বাবু বললেন, এর চেয়েও পুরনো একটা চার্চ ছিল ডাচদের আমলের। সেটা এখন ভেঙে পড়েছে। অব্যবহার্য। তার সঙ্গেই ছিল একটা সিমেট্রি। প্রধানত ডাচদের জন্যে। কখনও কখনও ইংরেজদের বডি সমাহিত করা হতো বটে। কিন্তু নেটিভদের বা আদিবাসী খ্রিস্টানদের দেহের ঠাই হতো না, সেইজন্যে ওটা এখন পরিত্যক্ত কবরস্থান। নতুন বা চলতি কবরখানাটা একটু দূরে।
কথা বলতে বলতেই চা আর স্যান্ডুইচ এসে গেল।
বিনয়বাবু যে মিস্টার ফার্নান্ডেজের কাছ থেকে দুর্ব্যবহার পেয়েছেন সে বিষয়ে একটি কথাও তুললেন না। কোনো অজুহাতে নিন্দাও করলেন না। নিন্দা করা যেন তার স্বভাবের বাইরে।
বিনয়বাবু অন্য দু-চারটে কথা বলে জিগ্যেস করলেন, কী জানতে চান বলুন।
টগা সময় নষ্ট না করে সোজাসুজি জিগ্যেস করল, সেদিন রাত্তিরে এক ধরনের ভয়ংকর কুকুরের ডাক শুনেছিলেন তো?
প্রথমেই এই ধরনের প্রশ্ন সম্ভবত বিনয়বাবু আশা করেননি। একটু ইতস্তত করে বললেন, আপনি কি সারমেয়রাজ-এর কথা জিগ্যেস করছেন?
টগা বলল, দেখুন Angry Hound কি সারমেয়রাজ তার কিছুই জানি না। শুধু
দাঁড়ান দাঁড়ান। কি বললেন, Angry Hound? এ নামটা আবার কোথায় পেলেন?
বাঙ্গালোরের পাদ্রিসাহেব মিস্টার ফার্নান্ডেজ কথায় কথায় বলে ফেলেছিলেন। Angry Hound বলতে কী বোঝাতে চেয়েছিলেন তা জানি না। তবে আন্দাজ করেছিলাম কুকুরের গর্জন প্রসঙ্গেই কথাটা বলেছিলেন। আর বলেছিলেন ঐ একবারই।
বিনয়বাবু চুপ করে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, না, ঐরকম নাম আমি শুনিনি। আমি কেন–আমরা কেউই শুনিনি। হতে পারে অন্য জায়গায় ঐ নামটাই প্রচলিত।
টগা একটু আশ্চর্য হয়ে বলল, কার নাম, কী বৃত্তান্ত একটু খুলে বলবেন?
বিনয়বাবু ধীরে ধীরে বললেন, হ্যাঁ, সেই অদ্ভুত গর্জন আমিও শুনেছি। অনেকদিন পরপর দু-একবার শোনা যায়। এখানকার সাধারণ লোক বলে ওটা ক্রুদ্ধ দেবতার গর্জন। বলি চাইছেন। ঐ হুংকার শুনলে সে বছর কিছু না কিছু ক্ষতি হবেই। কিন্তু মজা এই–তেমন কোনো ক্ষতি এতকালের মধ্যে হয়নি, আর সেই ক্রুদ্ধ দেবতাটি কে জানেন? ভয়ঙ্কর একটি শিকারী কুকুর।
টগা বলল, যাকে মিস্টার ফার্নান্ডেজ বলেছিলেন Angry Hound আর আপনি বললেন সারমেয়রাজ অর্থাৎ কুকুরের রাজা।
রাইট!
সত্যিই জীবন্ত কোনো কুকুর আছে নাকি? থাকলে তার কাজ কী? ঠিকানাই বা কী?
দাঁড়ান ভাই, অত ব্যস্ত হবেন না। আপনি যখন আমার কাছে জানতে এসেছেন তখন যতটুকু যা জানি তাই বলছি।
বিনয়বাবু একটু থামলেন। তারপর বলতে লাগলেন, এখানে আসার ঢের আগে, আমার যৌবনকালে কলকাতার একটু পুরনো বই-এর দোকানে একটা অতি পুরনো ইংরিজি বই পেয়েছিলাম। বইটার নাম The God and Goddess of the uncivilized class অর্থাৎ অসভ্য জাতির দেবদেবীরা। এই বইটার মধ্যে একটা অধ্যায় ছিল–Ghost in the guise of Dog–অর্থাৎ কুকুররূপী ভূত। আমাদের দেশে এবং বিদেশে ভয়ংকর সব ভূতের গল্পে কালো বেড়ালের একটা বিশেষ ভূমিকা দেখা গেছে। কিন্তু কুকুর-ভূতের কথা শুনিনি। ঐ বইটাতেই প্রথম পড়লাম।
টগা বলল, এই কুকুর-ভূতদের কোথায় দেখা মেলে?
বিনয়বাবু বললেন, বিশেষ করে ছোটোখাটো পাহাড়ের রেঞ্জ যেখানে আছে সেখানেই এদের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়–আর তা ভারতের যে কোনো জায়গায় হতে পারে। সেইজন্যেই বোধহয় মিস্টার ফার্নান্ডেজ তার জ্ঞনমতো বলেছিলেন Angry Hound। আমাদের এখানে তার পরিচয় সারমেয়রাজ।
খুব ইনটারেস্টিং লাগছে। উৎসাহিত হয়ে টগা বলল। কিন্তু এই কুকুর-দেবতা বা কুকুর ভূতের ক্রিয়াকলাপ কী? শুধুই কিংবদন্তির মধ্যে বেঁচে আছে, না কুকুরের চেহারা নিয়ে থাকে? কারাই বা তার পুজো করে? কীভাবে করে? সেই গর্জনটাই বা কিসের?
এবার বিনয়বাবু হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলেন। অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, তপেন্দুবাবু, খোলাখুলি বলি। এখানকার বেশির ভাগ মানুষ সংস্কারাচ্ছন্ন। তাদের বিশ্বাস এখান থেকে মাইল তিনেক পশ্চিমে যে পাহাড়ের রেঞ্জ দেখা যায়–সেখানে রহস্যময় ভয়ংকর কিছু ব্যাপার আছে বহুকাল থেকে। সেটা যে ঠিক কী তা আমি বলতে পারব না। বাস্তবে কোনো কুকুরের অস্তিত্ব আছে কিনা তাও আমি জানি না। আবার এও ভাবি যদি কুকুর নাই থাকে তাহলে সারমেয়রাজ নাম প্রচার হলো কেন? গর্জনটাই বা কিসের? সবই অনুমান। কারণ আমি কখনও সেখানে যাইনি। যাবার ইচ্ছেও নেই।
