সদাশিববাবু উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, সে কী! মহেন্দ্র এখনও আপনার খাবার দেয়নি?
ও এখন আমাকে অবজ্ঞা করে।
মহেন্দ্র তখনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। পাদ্রিসাহেব শুধু একবার টগাদের দিকে চোখ ফিরিয়ে দেখে নিলেন। কালো চশমার মধ্যে দিয়েই তার ক্রুদ্ধ দৃষ্টি আগুনের মতো জ্বলে উঠল।
.
দুই পাদ্রি
ভোরবেলায় উঠে টগা কোথায় বেড়াতে গিয়েছিল। ফিরল যখন বেলা প্রায় নটা। বিকু তখনও ঘুমোচ্ছিল। চপল বলল, বাবাঃ, এতক্ষণ ধরে কোথায় বেড়ালি?
জায়গাটা একটু ঘুরে দেখছিলাম। দূরে একটা পাহাড় আছে। দেখলাম তার রঙটা অদ্ভুত ধরনের কালো। দেখলে কেমন যেন ভয় করে।
চপল সে কথায় গুরুত্ব না দিয়ে বলল, এদিকে একটা কাণ্ড হয়েছে।
কী হলো আবার?
বাঙ্গালোর থেকে পাদ্রি এসেছে শুনে এখানকার চার্চের পাদ্রি সকালবেলাতেই আলাপ করার জন্যে ছুটে এসেছেন।
সে তো ভালো কথা।
ভালো আর হলো কই? আমাদের পাদ্রিসাহেব বললেন, অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া তিনি কারও সঙ্গেই দেখা করেন না। এখানকার চার্চের পাদ্রি খুব লজ্জা পেলেন। তিনি আন্তরিকতার সঙ্গে আলাপ করতে এসেছিলেন। সদাশিববাবুও মিস্টার ফার্নান্ডাজেকে বিশেষ করে অনুরোধ করলেন শুধু পাঁচ মিনিটের জন্যে দেখা করতে। কিন্তু কোনো ফল হলো না। এখন তুই আলাপ করতে চেয়েছিলি শুনে তোর জন্যে বসে আছেন।
আমার জন্যে বসে আছেন! কোথায়?
সদাশিববাবুর অফিস-ঘরে।
টগা তখনই ছুটল।
সাদাসিধে সরল মানুষটি। বৃদ্ধ হয়েছেন। মুখে শুভ্র দাড়ির সঙ্গে শুভ্র হাসি। দেখলেই শ্রদ্ধা হয়। নাম বিনয় মজুমদার। গলায় কালো কারে ঝুলছে পবিত্র ক্রুশচিহ্ন। এখানে যে ছোটোখাটো চার্চটি আছে সেখানেই প্রার্থনা করেন প্রতি রবিবার। এখানে খ্রিস্টান পরিবার বেশি নেই, থাকবার কথাও নয়। তবে যে কজন আছেন তাঁরা নিয়মিত চার্চে যান। সুদূর বাঙ্গালোর থেকে একজন অবাঙালি পাদ্রি এসেছেন অখ্যাত, অল্প পরিচিত এই মাঠাবুরু অঞ্চলে, এ কি কম কথা! এর আগেও তিনি যখন এখানে পায়ের ধুলো দিয়েছিলেন তখন দেখা করতে পারেননি। যেদিন দেখা করতে এসেছিলেন তার আগেই তিনি চলে গিয়েছিলেন।
একজন পাদ্রি হয়ে সুদূর বাঙ্গালোর থেকে এতদূর এলেন বার তিনেক, তবু কোনোবারই স্থানীয় চার্চে গেলেন না, এখানকার খ্রিস্টানদের সঙ্গে আলাপ করলেন না, এমনকি চার্চটিও দেখলেন না–এ ক্ষোভ এঁদের সবার মনে থাকলেও খুব ইচ্ছে ছিল এবার তাকে এখানকার খ্রিস্টান সমাজ থেকে সংবর্ধনা দেবে। কিন্তু কী আশ্চর্য! ভদ্রলোক নিজে পাদ্রি হয়েও আর একজন পাদ্রির সঙ্গে দেখা পর্যন্ত করলেন না! বিনয় মজুমদার এর জন্যে মনে মনে দুঃখ পেলেও টগার কাছে তার জন্যে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন না। উলটে বললেন, দোষ তো আমারই। আগে থেকে না জানিয়ে এলে এই সব ব্যস্ত ভি. আই. পি. মানুষের কি দেখা পাওয়া যায়?(অথচ মিস্টার ফার্নান্ডেজ তখন দরজা বন্ধ করে নিজের ঘরেই রয়েছেন।)
বিনয় মজুমদার একবারও জানতে চাইলেন না কী উদ্দেশে মিস্টার ফার্নান্ডেজ এখানে এসেছেন। অহেতুক কৌতূহল প্রকাশ করাটা যে অভদ্রতা এই বৃদ্ধ পাদ্রি তা জানেন।
যাই হোক, খুব অল্প সময়ের মধ্যে টগার সঙ্গে আলাপ করে তিনি খুশি হলেন। এমনকি চার্চে তার কোয়ার্টারে যাবার নেমন্তন্ন পর্যন্ত করলেন।
টগা মনে মনে এই সুযোগটাই খুঁজছিল। বলল, আমি আজই বিকেলে যাব। আপনার মতো অভিজ্ঞ মানুষের সঙ্গ পেলে এখানকার বিষয় অনেক কিছু জানতে পারি।
একটু হতাশ হয়ে বিনয়বাবু বললেন, এখানে এমন কী ইতিহাস আছে যা বলে আপনার মতো কলকাতার একজন আধুনিক ছেলের কৌতূহল নিবারণ করব? ঠিক আছে। আপনি আসুন তো। তবে বিকেলে যদি আসেন অবশ্যই টর্চ সঙ্গে নেবেন। অন্ধকার হয়ে গেলে পথঘাট নানা কারণে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
বলে বিনয়বাবু মাথায় হ্যাট পরে বাইরে এসে সাইকেলে চেপে বসলেন।
বিনয়বাবু চলে যেতেই আর এক কাণ্ড! মিস্টার ফার্নান্ডেজ খুব চেঁচামেচি করে মহেন্দ্রকে ডাকলেন। ভয়ে ভয়ে মহেন্দ্র গিয়ে দাঁড়াল। পাদ্রিসাহেব কৈফিয়ৎ চাইলেন, কেন তার ঘুম ভাঙানো হয়েছে?
নিরপরাধ মহেন্দ্র যখন জানাল এখানকার পাদ্রিবাবা দেখা করতে এসেছেন বলেই ম্যানেজারবাবু তাকে ডাকতে বলেছিলেন, তখন রাগে অন্ধ হয়ে ফার্নান্ডেজ সদাশিববাবুর কাছে একরকম ছুটে গিয়ে বললেন, আপনাদের এই ভৃত্যটি বড়োই দুর্বিনীত, অবাধ্য। তা ছাড়া সে প্রায়ই আমার ঘরে ঢুকে তত্ত্ব-তালাশ করে। একে তাড়িয়ে দিন। নইলে আমি এখানে থাকব না।
সদাশিববাবু এমনিতে খুব ধীর, শান্ত মানুষ। কিন্তু ফার্নান্ডেজের মেজাজ, অকারণে নির্দোষ মহেন্দ্রের ওপর দোষারোপ তিনি বরদাস্ত করতে পারলেন না। বললেন, মহেন্দ্র এখানে অনেকের চেয়ে পুরনো লোক। কাজেই কেউ ভয় দেখালেও তাকে এখান থেকে আমি সরাব না।
তাই নাকি? আচ্ছা–কিন্তু Angry Hound যদি নিজেই সরাতে ইচ্ছে করেন? বলে একটানে চশমাটা খুলে ফেললেন। চশমা খোলা অবস্থায় তাকে বড়ো একটা দেখা যায় না। এই মুহূর্তে তার লাল লাল চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে সদাশিববাবু আঁৎকে উঠলেন। ও তো মানুষের চোখ নয়, হিংস্র কুকুর জাতীয় কোনো পশুর।
মিস্টার ফার্নান্ডেজ তাড়াতাড়ি চশমাটা পরে নিজের ঘরে চলে গেলেন।
.
সারমেয়রাজ
বিকেল হতে না হতেই টগা বিনয়বাবুর কোয়ার্টারে চলে এল। খুব একটা দূরে নয়। খুঁজতেও অসুবিধে হয়নি। এখানে সবাই তাঁকে পাদ্রিবাবা বলে। খুব শ্রদ্ধা-ভক্তিও করে।
