এই একটা জিনিস লক্ষ্য করছি ইয়ং ছেলেরা অনেকেই সিগারেট খাচ্ছে না। খুব ভালো।
টগা বলল, কালকে রাত্তিরের সেই অদ্ভুত গর্জনটা কিছুতেই ভুলতে পারছি না। আচ্ছা, শব্দটা ঠিক কোন দিক থেকে আসে বলে মনে হয়?
এ প্রশ্ন তো আগেও করেছেন। উত্তরও দিয়েছি। আবার বলছি, আন্দাজ করি পশ্চিম দিকে যে টিলা-পাহাড়গুলো আছে, ঐ দিক থেকেই আসে।
টগা দেওয়ালে ভালো করে ঠেসান দিয়ে বলল, ওটা কী ব্যাপার খোঁজখবর করতে ইচ্ছে করে না? হাজার হোক বিজ্ঞানের যুগে তো আমরা বাস করছি।
সদাশিববাবু হাত নেড়ে বললেন, না মশাই। অত কৌতূহল আমার নেই। শুধু আমি কেন, কাছে-পিঠে তো অনেকেই বংশানুক্রমে বাস করেন। তাঁরা কেউ রহস্যভেদ করতে গেছেন? ও মশাই, রহস্য রহস্যই থাক। ও নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই।
এতক্ষণে বিকু বলল, আমারও তাই মত। এই দেখুন না, টগা আজ দুপুরে ঐ দিকে গিয়েছিল।
সদাশিববাবু চমকে উঠলেন, অ্যাঁ!
টগা হেসে বলল, ওর কথা বাদ দিন। আচ্ছা, এখানে তো বেশিরভাগ আদিবাসী। তারা ঐ গর্জনটাকে কীভাবে নেয়?
তারা? তারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে ঐ শব্দটা অশুভ। কোনো ক্রুদ্ধ দেবতার গর্জন। আর সেই দেবতা থাকেন ঐদিকের পাহাড়ে। তারা মনে করে ঐ গর্জনের পরিণতি একদিন মারাত্মক হয়ে উঠবেই এখানকার মানুষদের জীবনে। যে রাতে গর্জন শোনা যায় পরের দিনই ওরা সেই দেবতার উদ্দেশ্যে মুর্গি বলি দেয়। কৃপা ভিক্ষা করে।
এই পর্যন্ত বলে সদাশিববাবু থামলেন। তারপর বেল বাজিয়ে শতপথীকে ডাকলেন। শতপথী এসে দাঁড়াল। টগা তার মুখের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল। হঠাৎ যেন কিসের ভয়ে তার মুখের সমস্ত রক্ত নিঃশেষ হয়ে গেছে। সদাশিববাবু অত লক্ষ্য করলেন না। তিনি ফের চার কাপ চা দিতে বললেন।
টগা জিগ্যেস করল, এখানে পাথরমহল কোন জায়গাটাকে বলে?
সদাশিববাবু বললেন, এ নামটা শুনলেন কোথা থেকে?
শতপথী চলে যেতে গিয়েও থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। করুণ চোখে টগার দিকে তাকাল।
টগা মিথ্যে কথাই বলল। আজই দুপুরে বেরিয়েছিলাম ঐদিকে। বেশ লাগছিল। একজন আদিবাসীকে জিগ্যেস করে জানলাম ঐ জায়গাটাকেই পাথরমহল বলে।
সদশিববাবু একটু হেসে বললেন, তবে আর কি, উত্তর তো পেয়েই গেছেন। কী রে! তুই হাঁ করে দাঁড়িয়ে রয়েছিস কেন?
মহেন্দ্র যেন কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়ে চলে গেল।
টগা ইতস্তত করে বলল, উত্তর পেয়েছি বটে কিন্তু খটকা আছে।
কীরকম?
মহল কথাটাই গোল বাধাচ্ছে। আমরা নবাবী আমলে অনেকবার মহল কথাটা পেয়েছি। তাতে নির্দিষ্ট কোনো জায়গাকে বোঝায়। যেমন তাজমহল, শিশমহল, রঙমহল। তাই আমার ধারণা পাথরমহল বলতেও কোনো অঞ্চল নয়, নির্দিষ্ট জায়গা বোঝায়। আমার কৌতূহল সেই বিশেষ জায়গাটা কোথায়? কী ছিল সেখানে? আর এর উত্তর একমাত্র আপনিই দিতে পারেন।
সদাশিববাবু মনে মনে খুশি হলেন। মাথা চুলকে কিছুক্ষণ ভাবলেন। তারপর বললেন, এখান থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার পশ্চিমে পাহাড়ের কোলে অনেকখানি জায়গা জুড়ে বড়ো বড়ো কয়েকটা বাড়ির চিহ্ন পড়ে আছে। বাড়িগুলোর যে অংশগুলো এখনও দাঁড়িয়ে আছে। তা দেখলে নাকি মনে হয় যেন আগাগোড়া পাথরের তৈরি। কেউ বলে ওগুলো বাঘমুণ্ডির রাজাঠাকুর বয়ার সিংহের কাছারিবাড়ি। কেউ বলে নীলকর সাহেবদের ঘাঁটি।
নীলকর! হঠাৎ বিকু বলে উঠল, এই ব্যাপারটা খুব শুনেছি। কিন্তু ঠিক জানি না। আগে নাকি নীলের চাষ হতো। এখন হয় না কেন?
সদাশিববাবু কিছু বলার আগেই টগা বলে উঠল, ডাই অর্থাৎ নীল রং তৈরির জন্য একসময়ে এই নীল গাছের চাষ হতো খুব। সাহেবরা এদেশে এসে এই নীলের চাষ করে বড়োলোক হয়ে গিয়েছে।
চপল বলল, সে নীল উঠে গেল কেন?
টগাই উত্তর দিলো, এখন কেমিক্যাল ডাই বেরিয়ে গেছে।
সদাশিববাবু বললেন, সে সময়ে এই নীল চাষ নিয়ে যে বিরাট কর্মযজ্ঞ হতো তা ভাঙাচোরা নীলকুঠিগুলো দেখলেই বোঝা যায়। চাষীদের ওপর কম অত্যাচার করেছে সাহেবরা! দীনবন্ধু মিত্র তাই নিয়েই নীলদর্পণ নামে নাটক লিখে ফেললেন। সেই নাটক দেখতে দেখতে বিদ্যাসাগরমশাই রাগে সাহেবের দিকে চটিই ছুঁড়ে মারলেন। ভুলেই গিয়েছিলেন ওটা অভিনয় হচ্ছিল। এসব তো ইতিহাস!
টগা বলল, সেই পাথরমহলে কেউ এখন থাকে?
সদাশিববাবু হাসলেন। বললেন, যদি কেউ থাকে তাহলে তারা সাহেবদের হাতে খুন হওয়া হতভাগ্য চাষীদের আত্মা।
এই পর্যন্ত বলে সদাশিববাবু থামলেন। বললেন, রাত হয়েছে। আজ আর নয়।
মহেন্দ্র ঘরে ঢুকল চায়ের কাপ নিয়ে যাবার জন্য।
টগা বলল, আর একটা কথা জিগ্যেস করব।
সদাশিব নিঃশব্দে হাসলেন।
বলুন।
বাঙ্গালোর থেকে আসা বৃদ্ধ পাদ্রিটিকে আপনার কীরকম লাগে? কেন তিনি মুখে কুলুপ এঁটে থাকেন?
সদাশিববাবু বললেন, জানি না।
আচ্ছা, আমাদের সম্বন্ধে তাঁর কৌতূহল কেন?
তাও জানি না ভাই। একবার শুধু জিগ্যেস করেছিলেন কোথায় কোথায় ঘুরবে ওরা? বলেছিলাম জানি না। এই পর্যন্ত।
টগা বলল, খুব ইচ্ছে ছিল একবার ওঁর মুখোমুখি হওয়া। দেখা যাক—
ঠিক সেই মুহূর্তেই যে লম্বা, শীর্ণ, বৃদ্ধ, প্যান্ট-শার্ট পরা মূর্তিটি উত্তেজিতভাবে দরজার সামনে এসে দাঁড়াল, বুঝতে বাকি রইল না তিনিই বাঙ্গালোরের পাদ্রিসাহেব। রাতের বেলাতেও তার চোখে কালো চশমা!
চাপা খসখসে গলায় তিনি বললেন, মিস্টার ম্যানেজার, অনুগ্রহ করে আমার রাতের খাবারটা ঘরে পৌঁছে দিতে বলবেন? অনেক রাত হয়েছে।
