যাই হোক, শেষ পর্যন্ত টগলা বনবাংলোয় এসে পৌঁছল। ওকে দেখে চপল, বিকু জিগ্যেস করল, কোথায় ছিলি সারা দুপুর?
বেড়াচ্ছিলাম। ছোট্ট উত্তর দিয়েই টগা ঘর থেকে বেরিয়ে এল। নিচু গলায় জিগ্যেস করল, পাদ্রিসাহেব এখনও ফেরেননি তো?
চপল বলল, অনেকক্ষণ ফিরেছেন।
টগা চমকে উঠল, সে কী! আমি তো দেখলাম—
বিকু বলল, তা ঘণ্টাখানেকের উপর হলো উনি এসেছেন।
টগা নিজের মনে সময়ের হিসেব করে নিয়ে বলল, ঘণ্টাখানেক আগে! অসম্ভব! তাহলে কাকে দেখলাম অনেক দূরে, কোট-প্যান্ট পরা, টুপি মাথায়, এক-একটা পাথর টপকে দিব্যি এগিয়ে আসছে? সে কি অন্য কেউ? নাকি পাথরমহলের ইন্দ্রজাল?
.
নীলকর সাহেবদের কথা
সদাশিববাবু বলেছিলেন বটে সন্ধ্যের সময়ে তেমন কাজ থাকে না, সেই সময়ে অফিসঘরে আসতে–গল্পগুজব করা যাবে। কিন্তু দেখা গেল সদাশিববাবু তখন টিভি খুলে বসে আছেন আর বোর্ডাররা নিউজ শোনার জন্য সেখানেই জাঁকিয়ে বসেছে।
টগা অধৈর্য হয়ে উঠেছে। সদাশিববাবুর কাছ থেকে কিছু জানতে চায়। বিশেষ করে আজ দুপুরে ঐ জনশূন্য পাথুরে রাজ্যে গিয়ে দূর থেকে ভাঙা বাড়ি, বাড়ির পিছনে ধোঁয়া আর ওখানে পাদ্রিসাহেবকে দেখে তার সন্দেহ দৃঢ় হয়েছে যে, ওখানে গভীর রহস্য কিছু আছেই।
আচ্ছা, যদি ভুল দেখে না থাকে তাহলে ঐ বুড়ো পাদ্রিসাহেবের পক্ষে কী করে সম্ভব হলো অত তাড়াতাড়ি বাংলোয় ফিরে আসা? এ যে অমানুষিক ব্যাপার! সত্যি ফিরে এসেছে তো? ভেবে পাদ্রিসাহেবের ঘরের দিকে তাকাতেই দেখল কে একজন অন্ধকারে পাদ্রিসাহেবের ঘর থেকে চকিতে বেরিয়ে গেল। চিনতে দেরি হলো না। মহেন্দ্র শতপথী।
আশ্চর্য! পাদ্রিসাহেবের ঘরে এই সময়ে মহেন্দ্র কী করছিল?
টগাও যথাসম্ভব অন্ধকারে নিজেকে গোপন করে মহেন্দ্রর ঘরের দিকে গেল।
মহেন্দ্র!
মহেন্দ্র চমকে উঠল। আপনি বাবু এখানে?
কয়েকটা কথা জিগ্যেস করব। ঠিক ঠিক উত্তর দিও।
টগার গলার স্বরে মহেন্দ্ৰ ভড়কে গেল। কোনরকমে বলল, বলুন।
পাদ্রিসাহেব কেমন লোক ঠিক করে বলো তো।
মহেন্দ্র ইতস্তত করে বলল, কী করে বলব? কদিনই বা দেখছি।
তুমি ভালো করেই ওঁকে জান। একটু আগে ওঁর ঘরে কী কথা হচ্ছিল সত্যি করে বল।
মহেন্দ্ৰ ভয় পেয়ে গেল। ভাবল কলকাতার এই বাবু নিশ্চয় আড়াল থেকে তাদের কথা শুনেছে। তাই হাতজোড় করে বলল, বিশ্বাস করুন বাবু, আমি রাজী হইনি।
কিসে রাজী হওনি?
আজ্ঞে ও পাদ্রি নয়, আস্ত শয়তান। আদিবাসীদের ঘর থেকে একটা ছোটো ছেলেকে ধরে এনে দিতে বলেছিল। ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে আনতে বলেছিল। ওষুধের সঙ্গে একশোটা টাকা দিতে চেয়েছিল। আমি রাজী হইনি। তাইতে খুব রেগে মারতে এসেছিল। আমি পালিয়ে এসেছি।
টগা স্তম্ভিত হয়ে গেল। বলল, ছেলে নিয়ে কী করবে?
জানি না বাবু। তবে—
তবে কী?
ঐ পাথরমহলে অনেক কিছু ঘটে বলে শুনেছি। ওখানে নাকি একটা ভয়ংকর দেবতা আছে–যেনার সঙ্গী, রাতে যেনাদের নাম করতে নেই।
টগা চুপ করে শুনল। তারপর বলল, তুমি ঠিক বলছ?
জগরনাথের নামে দিব্যি। একটু থেমে বলল, আপনি আজ দুপুরে পাথরমহলের দিকে গিয়েছিলেন। আর যাবেন না।
কে বলেছে ওদিকে গিয়েছিলাম?
সে আর নাই শুনলেন। আপনি এখন যান। পাদ্রিসাহেব যদি দেখে ফেলেন আপনার সাথে কথা বলছি তাহলে মেরে ফেলবে। আপনার ওপর খুব রাগ।
টগা বলল, কেন? আমি তার কী করেছি?
তা আমি জানি না।
মেরে ফেলা অত সহজ নয়। তুমি একটা খবর আমাকে জানাতে চেষ্টা কর কী আছে ঐ পাথরমহলে? আর আদিবাসীদের ছেলে নিয়ে কী করতে চায় পাদ্রিসাহেব?
জানবার চেষ্টা করব। আর আমি যা বললাম তা কাউকে বলবেন না।
তারপর হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে বলল, আপনি ইঁদারার পাশ দিয়ে চলে যান বাবু। নইলে পাদ্রিসাহেব হয়তো দেখে ফেলবেন।
মহেন্দ্রের সঙ্গে কথা বলে টগা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল। মহেন্দ্র যা যা বলল, তা কি সব সত্যি? কোন ভয়ংকর দেবতা আছেন ঐ পাথরমহলে? পাদ্রিসাহেবের সঙ্গে ঐ জায়গার সম্পর্কই বা কী? কেনই বা তিনি আদিবাসী ছেলের খোঁজ করছেন? কী করবেন তাকে নিয়ে?
এইসব ভাবতে ভাবতেই গা ঢুকল সদাশিববাবুর অফিসঘরে। সেখানে তখন চপল আর বিকু চাড়া আর কেউ ছিল না।
টগাকে দেখে সদাশিববাবু হেসে বললেন, কোথায় ছিলেন এতক্ষণ ভাই? আপনার সঙ্গে তো অ্যাপয়েন্টমেন্ট হয়ে আছে।
টগা বলল, পাদ্রিসাহেবের ঘরের কাছে ঘুরছিলাম। দেখা হলে আলাপ করতাম।
সদাশিববাবু যেন চমকে উঠলেন। বললেন, ওঁর ঘরের কাছে ঘুরছিলেন! সর্বনাশ! দেখতে পেলে রক্ষে রাখতেন না।
টগা হেসে বলল, কেন? আলাপ করা বুঝি পছন্দ করেন না?
সদাশিববাবু বললেন, মোটেই করেন না। মেজাজও খুব। বুঝলেন না একে বাঙ্গালোরের পাদ্রি, তার ওপর টু পাইস আছে।
টগা খুব সাবধানে ভেবে ভেবে প্রশ্ন করছিল। বলল, আজ দুপুরে কি উনি বেরিয়েছিলেন?
ও বাবা! বেরোনোই তো ওঁর কাজ।
ফিরলেন কখন?
সেটা লক্ষ্য করিনি।
আচ্ছা, উনি বড়ো ঘর চাইছিলেন কেন?
জানি না। তবে মনে হয় কিছু রাখবেন। কারণ ছুতোর মিস্ত্রিরও খোঁজ করছিলেন।
চপল বলল, তা হলে বোধহয় এবার এখানে বেশ কিছুদিন থাকবেন?
সেইরকমই মনে হচ্ছে।
টগা বলল, এবার আসল ব্যাপারটা সম্বন্ধে জিগ্যেস করি।
বলুন। যদি জানা থাকে তাহলে সত্য উত্তর পাবেন। বলে পকেট থেকে সিগারেট ধরালেন।
চলবে?
নাঃ। তিনজনেই একসঙ্গে উত্তর দিলো।
