ওঠবার সময় টগা বলল, কাল রাত্রে সেই কুকুরের ডাকটা পশ্চিমের ঐ পাহাড়টার দিক থেকে আসেনি?
তাই তো মনে হয়েছিল।
নিজেদের ঘরে ফিরে আসতে আসতে টগা আর একবার পাদ্রিসাহেবের ঘরের দিকে তাকাল। না, তিনি এখনও ফেরেননি।
.
পাথরমহলের পথে
দুপুরে লাঞ্চ সেরে ওরা তিনজন ঘরে এসে ঢুকল। বিকু তৎক্ষণাৎ লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল। ছুটির দিনে দুপুরে ফার্স্ট ক্লাস একখানি ঘুম দিতে না পারলে তার চলে না। চপল বিছানায় বসে দেশলাই-এর কাঠি দিয়ে আরাম করে কান পরিষ্কার করছিল। কেবল ছটফট করছিল টগা। রহস্য ভেদ করতে গেলে কি পেট ভরে খাওয়া আর কুম্ভকর্ণের মতো ঘুম দিলে চলে?
এই চল না একটু ঘুরে আসি।
বিকু কোনো উত্তরই দিলো না।
চপল বলল, এই দুপুর রোদে কোথায় যাবি?
দুপুর রোদ! শীতের দিনে পাহাড়ে রোদ যে কত আরামের
তেমন শীত এখনও পড়েনি। তাছাড়া কাল রাতে ঘুমটা ভালো জমেনি। কী যে ছাই একটা বিশ্রী ডাক শোনা গেল, ব্যস ঘুম গেল চটে। এখন মেক আপ দিতে হবে।
সেই ডাকটা সম্বন্ধে জানতে কৌতূহল হয় না?
হবে না কেন? তা বলে সারা দুপুর পাহাড়ে, রাস্তায় ঘুরে বেড়ালেই কি কৌতূহল মিটবে?
টগা বলল, সত্যি যদি রহস্য বলে কিছু থাকে তা হলে পশ্চিমের ঐ পাহাড়গুলোর কাছেই আছে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে কল্পনায় রহস্য ভেদ করা যায় না। আচ্ছা, তোরা ঘুমো। আমি একটু ঘুরে আসি।
চপল বলল, নতুন জায়গা। গোঁয়ার্তুমি করে বেশি দূর যাস নে। তাছাড়া এখানে সন্ধ্যে নামে তাড়াতাড়ি।
টগা সে কথায় কান না দিয়ে বেরিয়ে গেল।
ঠিক কোথায় যাচ্ছে জানে না। কিন্তু কোন দিকে যাচ্ছে জানে। তার দৃঢ় বিশ্বাস পশ্চিম দিকে ঐ যে পাহাড়টা গাছপালায় কালো হয়ে আছে তারই কোনো গহ্বর থেকে কুকুরের সেই অস্বাভাবিক গর্জন শোনা গিয়েছিল। কিন্তু কেমন সেই জন্তু যা মাত্র একবারই ডাকে? কত জনে হয়তো একবছর-দুবছরে মাত্র একবারই ডাক শুনেছে। কিন্তু সে ডাক যে জীবন্ত কোনো প্রাণীর তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
টগার মাথার ভেতর কেমন সব গোলমাল হয়ে গেল। কিসের গর্জন ওটা? কুকুরের মতো। কিন্তু কুকুরের গর্জন কি অত ভয়ংকর হয়? যদি মেনেও নেওয়া যায় ওটা কুকুরেরই ডাক তাহলে কত বড়ো সেই কুকুরটা যার গর্জন পাহাড়-টিলা কাঁপিয়ে এত দূর পর্যন্ত এসে পৌঁছয়?
আচ্ছা কুকুরের গর্জনের সঙ্গে কি অন্য কোনো প্রাণীর স্বরও মিশেছিল? অনেকটা যেন অতিপ্রাকৃত জগতের মানুষের মতো?
আশ্চর্য, গত রাতে সেই ডাক শোনার পর থেকে সে যতটা ভাবছে, চপল, বিকু বা বাংলোর অন্য কেউ তারা কিছুই ভাবছে না।
টগা সেই দুর্গম পাথুরে পথ ধরে, ছোটো-বড়ো ঢিবি টপকে হেঁটেই চলেছে। শীতের দিন বলে ক্লান্তি নেই।
কিন্তু ভয়ংকর সেই ডাকের চেয়েও অদ্ভুত মানুষ ঐ পাদ্রিটি। পাদ্রিদের ওপর সাধারণত মানুষের শ্রদ্ধা হয়। পাদ্রিদের দেখে মনে হয় তারা যেন সংসারের যাবতীয় লোভ, হিংসা, স্বার্থপরতার অনেক ঊর্ধ্বে। কিন্তু বাঙ্গাললারের এই ডিক ফার্নান্ডেজকে দেখলে পাদ্রি বলে মোটেই শ্রদ্ধা করতে ইচ্ছা করে না। কেন? তার কারণ বোধহয় লোকটি ধূর্ত, মতলববাজ। কারও সঙ্গে মিশতে চান না। সব সময়ে যেন কালো চশমা পরে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে চান। শুধু তাই নয়, এই যে মানুষটা সকালে বেরিয়ে সেই রাত্তিরে ফেরেন–সারাদিন কী করেন? কোথায় থাকেন?
এদিকে এই পাহাড়ি জায়গায় এমন ঘর-বাড়ি চোখে পড়ছে না যে সেখানে তিনি থাকবেন। তাহলে তার থাকবার একমাত্র জায়গা পুরুলিয়া কিংবা পুরুলিয়ার কাছগছি কোথাও। তাই যদি হয় তাহলে তিনি মরতে এত দূরে এই বাংলোয় থাকতে এলেন কেন? নিশ্চয় পাহাড় পুজো দেখাই তার উদ্দেশ্য নয়।
হঠাৎ টগার হুশ হলো। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। পিছন ফিরে দেখল–কোথায় কত দূরে তাদের বনবাংলোটা? দেখাই যাচ্ছে না। আপন মনে হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূরে এসে পড়েছে। মনে হচ্ছে, ইচ্ছে করে আসেনি, কেউ যেন ঠেলে নিয়ে এসেছে।
কিন্তু কী লাভ হলো এত দূরে এসে? গাছ নেই, পালা নেই, মানুষজনের সাড়া নেই, শুধু পাথরের রাজ্য। এদিকে শীতের বেলা ফুরিয়ে আসছে।…
হঠাৎ টগার নজরে পড়ল অনেক দূরে একটা ভাঙা বাড়ির মতো কী যেন রয়েছে। আর তার গা বেয়ে সরু হয়ে বেরোচ্ছে ধোঁয়া।
টগা অবাক হলো। এই জনমানবশূন্য পাথুরে রাজ্যে ধোঁয়া আসছে কোথা থেকে?
খুব ইচ্ছে করছিল আরও একটু জোরে হেঁটে ভাঙা বাড়িটা দেখে আসে। অন্তত বুঝতে পারে সত্যি বাড়ি, নাকি চোখের ভুল! বাড়ি হলে কিসের বাড়ি? কিন্তু এই সন্ধ্যের মুখে অত দূরে যেতে সাহস হলো না। ফিরতে হলো। একটা কথা মনে হলো। এই পাথুরে রাজ্যে তো মানুষের থাকার আশ্রয়ই নেই। তাহলে আদিবাসীদের বাস কোন দিকে? সকালের সেই তিব্বতী ছেলেটাই বা কোন দিকে গেল!
টগা আর একবার পিছন ফিরে তাকাল। সঙ্গে সঙ্গে তার দৃষ্টি নিশ্চল হয়ে গেল। অবাক কাণ্ড! দেখল বেশ কিছুটা দূরে টুপি মাথায়, কোট-প্যান্ট পরা কঞ্চির মতো সোজা একজন বৃদ্ধ টপাটপ পাথর টপকে এগিয়ে আসছেন। বুঝতে বাকি রইল না লোকটি কে? শুধু বুঝতে পারল না সারাদিন মানুষটা কোথায় ছিলেন?
যাই হোক, আর দেরি না করে টগা বাংলোমুখো পা চালাল। কিন্তু মিনিট দশেক হাঁটার পরই বুঝতে পারল পাথরের রাজ্যে পথ চিনে বাড়ি ফেরা কত কঠিন। কাছে-পিঠে, সামনে পিছনে এমন কোনো চিহ্ন নেই যা দেখে পথ চিনবে। পথ? এই ছড়ানো পাথর, নুড়ি আর ঘাসের মধ্যে পথ কোথায়? অনেক দুর্গম জায়গায় পায়ে চলা পথও থাকে। এখানে তাও নেই। তাহলে ঐ বুড়ো মানুষটি কোন পথ ধরে অত দূর গেলেন?
