সকালে বেরিয়েছিলেন?
টগা বলল, হ্যাঁ, পাহাড়ে উঠেছিলাম।
কেমন লাগল পাহাড়-পুজো?
ভিড় দেখে পুজোর দিকে আর এগোইনি। এদিক-ওদিক ঘুরলাম। তবে পাদ্রিসাহেবের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। শুধু দেখাই।
কীরকম?
নিজের পরিচয় দিয়ে জানতে চাইলেন কোনো তিব্বতী ছেলেকে অ্যান্টিক বেচতে দেখেছি কিনা। তার খবর দিতেই তিনি ছেলেটার খোঁজে তাড়াতাড়ি নেমে গেলেন।
এ ছাড়া আর কোনো কথা বলেননি?
না। হঠাৎ গায়ে পড়ে আমাদের সঙ্গে আলাপই বা করবেন কেন? আমরা এসেছি জানবেনই বা কী করে?
সদাশিববাবু বললেন, কাল রাত্রেই জেনেছেন।
কী করে জানলেন?
ওঁর এবার একটু বড়ো ঘর দরকার বলে আপনাদের ঘরটাই নিতে চাইলেন। তখনই আপনাদের কথা বলতে হলো।
তাতে উনি কী বললেন? টগা জিগ্যেস করল।
বুড়ো মানুষ তো। কৌতূহলটা বেশি। তাই কজন এসেছেন, কোথা থেকে এসেছেন, কেন এসেছেন, কতদিন থাকবেন জিগ্যেস করলেন। একটু চা খান।
চপল বলল, পাহাড়ে চা খেয়ে আসছি।
তা হোক। শীতের দিন, চা খেতে খেতে গল্প করা যাবে।
মহেন্দ্র শতপথী কাঁধে গামছা ফেলে দুবালতি টাটকা জল পাদ্রিসাহেবের দরজার সামনে রেখে কিচেনের দিকে যাচ্ছিল, সদাশিববাবু চার কাপ চায়ের অর্ডার দিলেন। তারপরেই য়েন কিছু মনে পড়ল, একটু বসুন, আমি আসছি, বলেই উঠে গেলেন।
এরা তিনজন চুপচাপ বসে রইল।
চপল খোলা জানলা দিয়ে তাকিয়ে রইল দূরের পাহাড়গুলোর দিকে। তার মনে হতে লাগল গাছপালায় ঢাকা ঐ পাহাড়গুলোর পাথরে পাথরে যেন রহস্য কত কাল ধরে দানা বেঁধে আছে।
বিকু লক্ষ্য করছিল মহেন্দ্রকে। চায়ের ট্রে হাতে করেই ওদিকের বারান্দায় একজন গুণ্ডামতো লোকের সঙ্গে নিচু গলায় কথা বলছে।
কী এত কথা? চুরি-ডাকাতির ষড়যন্ত্র চলছে না তো?
আর টগা তাকিয়েছিল ফার্নান্ডেজের ঘরের দিকে। সব জানলাগুলো বন্ধ, এমনকি ভেতর দিকের জানলাগুলোও।
টগা অবাক হলো। এত সতর্কতা কিসের?
খুব হচ্ছা করল ঘরটার চারপাশ ঘুরে দেখে। সেইরকম মনে করে উঠতে যাচ্ছিল, এমনি সময়ে সদাশিববাবু ঢুকলেন। পিছনে মহেন্দ্র শতপথী। টগার আর ঘরটা ঘুরে দেখা হলো না।
চা খেতে খেতে সদাশিববাবু বললেন, পাহাড়-পুজো তো দেখলেন। এবার কী দেখবেন?
টগা বলল, পুজো আর দেখা হলো কই? শুধু লোকের ভিড়। ভিড় দেখার জন্যে তো এখানে আসিনি।
তাহলে কি ফিরেই যাবেন?
চপল বলল, এখানে আর কিছু তো দেখার নেই?
আছে বৈকি। সিধিয়ার্টাড়ের সতীমেলার থান।
সে আবার কোথায়?
সদাশিববাবু বললেন, এখান থেকে মাইল দশেক দূরে সিধিয়ার্টাড়। টাড় মানে রুক্ষ। এর কাছেই চরসা গ্রাম। সেই গ্রামের বধূ সরলাদেবী স্বামীর সঙ্গে এক চিতায় পুড়ে পুণ্যবতী সতী হয়েছিলেন। সেই সতীর স্মরণেই প্রতি বছর এই সময়ে ওখানে মেলা বসে। যেখানে চিতা জ্বলেছিল সেখানে একটা বেদি তৈরি করা হয়েছিল। তার ওপর ওড়ে লাল নিশান। গ্রামের বৌ-রা সেই বেদিতে স্বামীর কল্যাণে সিঁদুর লেপে দেয়। বহু নারী-পুরুষ আসে গ্রাম গ্রামান্তর থেকে।
টগা বলল, সতী মাথায় থাকুন। ও জায়গা দেখবার আগ্রহ আমার মোটেও নেই।
হ্যাঁ, বরঞ্চ অন্য কোনো জায়গা যদি কাছেপিঠে থাকে, চপল বলল।
সদাশিববাবু হতাশ হয়ে বললেন, না, তেমন দ্রষ্টব্য জায়গার কথা তো আমি জানি না।
এরপর নিঃশব্দেই চা খাওয়া শেষ হয়ে গেল। কেউ কোনো কথা বলছে না। বিকুই নীরবতা ভাঙল। হেসে বলল, টগা একমনে কী এমন ভাবছে?
সদাশিববাবুও টগার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, তপেন্দুবাবু কাল রাতের সেই কুকুর ডাকের কথা ভুলতে পারছেন না বোধহয়।
টগা গম্ভীরভাবে বলল, ও যে ভোলার ব্যাপার নয় সদাশিববাবু। যদি আমি নিজে কানে না শুনতাম তা হলে হয়তো বিশ্বাসই করতাম না। কিন্তু যাক সে কথা। আমি ভাবছিলাম মিস্টার ফার্নান্ডেজের কথা। আচ্ছা, এবার উনি বড়ো ঘর চেয়েছিলেন কেন? মানুষ তো একা।
সদাশিববাবু যেন একটু অবাক হলেন। বললেন, তাই তো। কথাটা তো আমি ভেবে দেখিনি।
টগা বলল, সদশিববাবু, মাত্র এক রাত্তির এখানে কাটিয়েই আমি বুঝতে পেরেছি এখানে রহস্যজনক কিছু আছেই। আর সেই রহস্যের সঙ্গে প্রধানত জড়িয়ে আছে দুটি জিনিস। এক কোনো পশুর অলৌকিক গর্জন আর দুই–প্রায় আশি বছরের ঐ বুড়ো পাদ্রির অস্বাভাবিক ঘোরাঘুরি, দাপাদাপি।
সদাশিববাবু আঁৎকে উঠলেন। বললেন, চুপ চুপ, পাদ্রিসাহেব শুনতে পেলে এমন কাণ্ড বাধাবেন–
টগা সে কথায় কান না দিয়ে বলল, এই দুটো রহস্য ভেদ না করে আমরা এখান থেকে নড়ছি না। আর সত্যিই যদি এই রহস্য ভেদ করতে হয়, তাহলে সব আগে দরকার হবে আপনার সাহায্য। কেননা আপনি এখানে অনেক দিন আছেন অনেক কিছুই জানেন। অথচ আমাদের কাছে বলতে চাচ্ছেন না।
টগার এইরকম সোজাসুজি কথায় সদাশিববাবু যেন ধরা পড়ে গেলেন। ইতস্তত করে বললেন, ঠিক আছে। সন্ধ্যেবেলায় আসবেন। তখন কাজ থাকে না, আমি যতটুকু জানি তা বলব। তবে মিস্টার ফার্নান্ডেজ সম্বন্ধে আমি বেশি কিছুই জানি না তা বলে রাখলাম।
টগা সে কথা যেন শুনতে পেল না। বলল, আর একটা কথা। এখানে যিনি স্থানীয় পাদ্রি আছেন তাঁর সঙ্গে আমাদের আলাপ করিয়ে দিতে হবে।
সদাশিববাবু বললেন, এখানে একজন পাদ্রি আছেন বটে তবে তার সঙ্গে বিশেষ আলাপ নেই। আমি চার্চে যাই না। চার্চের কেউ বড়ো একটা এদিকে আসেন না। তবু আলাপ করিয়ে দেবার চেষ্টা করব। ঐ লাঞ্চের ঘণ্টা পড়ল। আপনাদের তো স্নানও হয়নি। তাড়াতাড়ি স্নান সেরে ডাইনিংহলে আসুন।
