চপল বলল, আমার মনে হচ্ছে এই বৃদ্ধটি এখানকার নন।
টগা বলল, আমি আরও বলে দিচ্ছি শোন, ইনি একজন পাদ্রি। এবং আসছেন দক্ষিণ ভারতের কোনো জায়গা থেকে।
বিকু বলল, পাদ্রিই যে কী করে জানলি?
গলায় ক্রুশ ঝুলছে।
তাহলে আমিও বলে দিচ্ছি ইনি এখানে এসেছেন মাত্র গতকাল রাতে। উঠেছেন বনবাংলোয়।
তিনজনেই জোরে হেসে উঠল।
চুপ! ভদ্রলোক এদিকে আসছেন।
ভদ্রলোক কাছে এসে দাঁড়ালেন।
এক্সকিউজ মি। আপনারা নিশ্চয় বাইরে থেকে এসেছেন?
টগা মজা করে বলল, আশ্চর্য! কী করে জানলেন?
সে কথার উত্তর না দিয়ে ভদ্রলোক বললেন, আই অ্যাম ডিক ফার্নান্ডেজ ফ্রম বাঙ্গালোর। যদিও আমি এখানে অনেকবার এসেছি। আচ্ছা, এখানে কি কোনো তিব্বতী ছেলেকে দেখলেন যে অ্যান্টিক নিয়ে বসেছিল?
টগা বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ, একটু আগে বসেছিল ঐ গাছতলাটার নিচে।
এরই মধ্যে উঠে গেল?
তাই তো দেখলাম।
আচ্ছা, ওর কাছে কোনো জীবজন্তুর মুখ ছিল?
ছিল বৈকি।
বৃদ্ধ যেন আরও ব্যস্ত হয়ে উঠলেন।
কোনদিকে গেল?
এই দিক দিয়ে নেমে গেল।
মিস্টার ফার্নান্ডেজ একটু ভাবলেন। তারপর তিব্বতী ছেলেটা যে পথে নেমে গিয়েছিল সেই পথে দ্রুত নেমে গেলেন। তার পা দুটো বয়েসের ভারে আর পাথরে ঠোক্কর লেগে টলছিল। মনে হচ্ছিল এই বুঝি পড়ে গেলেন–কিন্তু পড়লেন না।
.
ফার্নান্ডেজ দ্রুত চোখের আড়ালে চলে গেলেও তিনজন কেমন হতভম্বর মতো সেই দিকে তাকিয়ে রইল। লোকটা যেন খানিকটা ইন্দ্রজাল ছড়িয়ে দিয়ে গেল।
বিকু বলল, আমায় যদি তোমরা বৃদ্ধটির সম্বন্ধে জিগ্যেস করো, তাহলে নির্দ্বিধায় আমি বলব, লোকটি পাগল।
চপল বলল, মোটেই নয়। পাগল হলে এই আশি বছর বয়েসে কেউ বাঙ্গালোর থেকে এখানে বেড়াতে আসতে পারে? বেড়াবার আর জায়গা পেল না? আসলে ভালো করেই জানে এখানে এমন কিছু সম্পদ আছে যা অন্য কেউ জানে না।
টগা বলল, লোকটি যে সাধারণ মানুষ নয় সেটা সহজেই বোঝা যায়। উনি বারে বারে অকারণে এখানে ছুটে আসেন না। সদাশিববাবুও বললেন, এখানে এসে সারা দিন তিনি কোথায় থাকেন, কী করেন তা তিনিও আজ পর্যন্ত জানতে পারেননি। রহস্যটা এখানেই।
বিকু বলল, কেস জটিল। এভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গেজিয়ে লাভ নেই। তার চেয়ে চলো ঐ চায়ের স্টলটায় বসে চা খেতে খেতে কথা বলা যাক।
টগা আড়ালে চপলের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল। অর্থাৎ বিকুর মতো ছেলের মনেও রহস্যের ঘোর লেগেছে।
পাহাড় থেকে একটু নেমে এসে তিনজন বসল তিন কাপ চা নিয়ে।
এ-কথা ওকথার পর টগা বলল, পাদ্রিসাহেব সম্বন্ধে এ পর্যন্ত যা শুনেছি আর আজ তাকে দেখে আমি কয়েকটা পয়েন্ট পেয়েছি। যেমন এক, কোনো বিশেষ গোপন আকর্ষণে তিনি বাঙ্গালোর থেকে এখানে ছুটে আসেন এই বয়েসেও। দুই, বিষয়টা এতই গোপন যে তিনি কাউকেই কিছু বলেন না। তিন, কালো চশমায় চোখ ঢেকে রাখেন। চার, অলৌকিক কুকুরের ডাক সম্বন্ধে তিনি অনেক কিছু জানেন। পাঁচ, পাহাড়ের ওপরের তিব্বতী ছেলেটাকে তিনি চেনেন। যে কোনো উদ্দেশ্যেই তাকে দরকার। মনে হয়, ছেলেটার কাছে যে কুকুরের মূর্তিটা আছে সেটাই তার প্রধান আকর্ষণ।
বিকু অবাক হয়ে বলল, কেন?
টগা একটু হাসল। বলল, তা ঠিক বলতে পারব না। তবে আমি নিশ্চিত ঐ কুকুরের ডাক শুধুই কোনো একটা কুকুরের ডাক নয়। ঐ ডাকের মধ্যে মিশে আছে অলৌকিক কোনো ভয়ংকর কণ্ঠস্বর। পাদ্রিসাহেবও তা বোঝেন। আগেও তিনি ঐ গর্জন শুনেছেন বলেই কাল রাত্তিরে সবাই যখন ঘর থেকে বেরিয়ে এল তিনি বেরোননি। আজ সকালে তিনি ঐ তিব্বতী ছেলেটার খোঁজেই পাহাড়ে উঠেছিলেন।
টগার কথা শেষ হলে সবাই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। শুধু বিকুই পার্স খুলে সকলের চায়ের পয়সা মিটিয়ে দিয়ে বলল, আর এখানে দেরি করে লাভ নেই। বাংলোয় চলো।
টগা একটু বিরক্ত হয়ে বলল, শোন বিকু, তুই যদি আজই কলকাতায় ফিরে যেতে চাস তো চলে যা। আমি কিন্তু থাকব।
চপল বলল, বাঃ রে! তুই থাকবি আর আমি থাকব না? রহস্যের সন্ধান যখন পেয়েছি
বিকু বলল, কলকাতায় আমি ফিরছি না। ঐ পাদ্রিসাহেবের ব্যাপারটা কী আমাকেও জানতে হবে। আমার মনে হয় এখানে বসে না গেজিয়ে বাংলোয় গিয়ে পাদ্রিসাহেবের সঙ্গে আলাপ জমানোটাই কাজের কাজ হবে।
অন্য সময়ে বিকুকে এরা বড়ো একটা পাত্তা দেয় না। কিন্তু এখন এই শেষ কথাটা খুবই যুক্তিযুক্ত বলে ওদের মনে হলো। ওরা পাহাড় থেকে নেমে চুপচাপ বাংলোর দিকে এগিয়ে চলল।
.
সদাশিববাবু কেমন লোক?
ওরা ব্রেকফাস্ট সেরেই পাহাড়ে গিয়েছিল। কাজেই একটা বড় কাজ হয়ে গেছে।
এখন সকাল প্রায় নটা। হাতে অফুরন্ত সময়। সময় কাটাবার উপযুক্ত উপায় পাদ্রিসাহেবের সঙ্গে গল্প করা। গল্প করতে করতে যদি পাদ্রিসাহেবের পেট থেকে কথা বার করা যায়! আর সেই উদ্দেশ্যেই তো ওরা তাড়াতাড়ি বাংলোতে ফিরে এসেছে।
কিন্তু পোড়া কপাল। পাদ্রিসাহেবের ঘরের সামনে গিয়ে দেখা গেল দরজায় তালা ঝুলছে। এটাই তো স্বাভাবিক!
তা হলে?
এমনি সময়ে ওদিকের অফিস-ঘর থেকে সদাশিববাবু ডাকলেন, তপেন্দুবাবু!
তপেন্দু অর্থাৎ টগা হাত তুলে সাড়া দিল। বাংলোর খাতায় এদের ভালো নামগুলো লেখা হয়ে আছে।
পাদ্রিসাহেব নেই। কাজেই অগতির গতি সদাশিববাবু। কাল রাত্তিরে যতটুকু কথাবার্তা হয়েছে তাতে তারা বুঝেছে মানুষটি ভালো। আর এখানকার অনেক কিছুই জানেন। টগার ইচ্ছে, একবার চেষ্টা করে দেখা যদি কোনো কথা বের করা যায়।
