কিন্তু অবাক কাণ্ড! দিন দশেক পরে ঐ পাঁচ বছরের ছেলে নিজেই বাড়ি ফিরে আসে। ঐটুকু ছেলের এমনই অভিমান যে, কী করে আসতে পারল তা কাউকে বলল না। বাড়ি ফিরে এসে সে আরও ভয়ংকর হয়ে উঠল। তার সমার ওপর রাগ, তার বাবার ওপর রাগ। রাগ সমবয়সী সব ছেলেদের ওপর। আমি যতটুকু জানতে পেরেছিলাম–তা হল এইটুকুই।
পাদ্রীবাবা গম্ভীর ভাবে বললেন, এই জন্যেই ওর এই পরিণতি। যাক, আপনার সঙ্গে ওর সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত কী রকম দাঁড়াল বলুন।
বললাম, সে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। ছেলেটাকে পছন্দ না করলেও যেমন আমি ওর গান পছন্দ করতাম, তেমনি ও-ও আমাকে পছন্দ না করলেও আমার বাজানোটা পছন্দ করত। ও চাইত ও যখনই যেখানে গান করবে তখনই আমি যেন ওর সঙ্গে থাকি। এ এক ধরনের অর্ডার। মোহনদের বাড়ি গেলে আমরা ভয়ে ভয়ে থাকতাম এই বুঝি ঝড়ের মতো চারু এসে হাজির হল!
ক্রমশ চারু আমার উপর জুলুম শুরু করল। যখনই ও গাইবে তখনই আমাকে বাজাতে হবে। শুধু মোহনের বাড়িতেই নয়, অন্য কোথাও গাইতে গেলে ও ওদের বাড়ির কাজের লোকের হাত দিয়ে চিঠি পাঠাত, অমুক দিন আমার সঙ্গে যাবে। কোনো অজুহাত শুনব না।
এ তো অনুরোধ নয়, আদেশ। রাগে গা জ্বলে যেত। বেশির ভাগ সময়ে ছলছুতো করে এড়িয়ে যেতাম।
এড়িয়ে যেতেন কেন? আপনিও তো আর্টিস্ট। প্রশ্ন তুললেন পাদ্রীবাবা।
বললাম, ও হয়তো মন্দ গান করত না। কিন্তু তার সেই পাথরের মতো খসখসে, উঁচু নিচু মুখ, সাপের মতো হিম দৃষ্টি আমি বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারতাম না। তাছাড়া ওর কুচুটে মনের পরিচয় যে কেউ পেয়েছে সেইই এড়িয়ে চলত। কথায়-বার্তায় এতটুকু নম্রতা ছিল না। নিজেকে যে কী মনে করত তা ওই জানত। আমাদের মনে হত, ও আমাদের ওর বাবার মাইনে করা কর্মচারী মনে করত। তাই কখনও অনুরোধ করত না। করত আদেশ।
আর আমি যখনই ওর ডাকে সাড়া দিইনি তখনই ও আমার বাড়িতে এসে হুমকি দিয়ে গেছে। আপনি ওকে, শিল্পী বলে সম্মান করছেন, কিন্তু এই কি শিল্পীর আচরণ?
একটু চুপ করে থেকে পাদ্রীবাবা বললেন, কী করে আপনাদের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেল সেই কথাটা বলুন।
বললাম, আমি ওকে ছাড়তে চাইলেও ও আমাকে ছাড়তে চাইত না। আমি দেখলাম যেমন করে হোক ওর সঙ্গে বাজানো আমাকে বন্ধ করতেই হবে। তাই একটা ফাংশানে গিয়ে বাজাতে বাজাতে তাল কেটে দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে ও রাগে ফেটে পড়ল। হারমোনিয়াম ঠেলে সরিয়ে দিয়ে আমার বাঁয়া-তবলা ভেঙে দেবার জন্যে তাড়া করে এল। আমি কোনোরকমে সে দুটি বুকে আগলে পালিয়ে এলাম। ঠিক করলাম, আর কখনও ওর ত্রিসীমানায় যাব না।
কিন্তু এর পরই একটা ঘটনায় আমি চমকে উঠলাম। সেই সপ্তাহেই একদিন ঘুম থেকে উঠে বাইরের ঘরে ঢুকে দেখলাম জানলার শিকগুলো দুমড়ানো। কী হল? চোর ঢুকেছিল? কিন্তু বাইরের ঘরে কী পাবে? এ বাবা! বাইরের দরজায় খিলও খোলা!
বেশিক্ষণ ভাবতে হল না। হঠাৎ আলমারির মাথায় চোখ পড়ল। কেমন ফাঁকা ফাঁকা। ওপরেই বাঁয়া-তবলাটা তোলা থাকে। চারুর হাত থেকে বাঁচাবার জন্য ওগুলোকে বাড়ি নিয়ে এসে কোনোরকমে আলমারির মাথায় রেখে দিয়েছিলাম। চোর হঠাৎ বাঁয়া-তবলা নিয়ে গেল কেন? তবলা শিখবে নাকি?
হঠাৎ লক্ষ পড়ল আলমারির নীচে একটুকরো কাগজ ভাঁজ করে রাখা রয়েছে। তুলে নিয়ে পড়লাম। চিঠিই বলা যায়। সেটা এইরকম–
তবলচি সাহেব, আমার কথা যারা মান্য করে না তাদের এই রকম শাস্তিই দিই। জানি এক সেট বায়া-তবলা ফের করাতেই পার। কিন্তু এটা যে তোমার ঠাকুর্দার জিনিস। মূল্যবান স্মৃতিচিহ্ন! কী বল? তাই এটাই হাতালাম।
পার তো পুলিশকে জানিয়ে এ দুটো উদ্ধার কোরো।
—ইতি
চারু বিশ্বাস।
চিঠিটা শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে মুখ থেকে একটা কথাই ছিটকে বেরিয়ে এল–শয়তান। কিন্তু শত্রুকে উপযুক্ত শাস্তি না দিয়ে শুধু বাড়ি বসে গাল পাড়াটা অক্ষমের কাজ। তাই আমি চারুকে শাস্তি দেবার কথা চিন্তা করতে লাগলাম।
শাস্তি দিলেন?
হ্যাঁ, দিলাম বৈকি। তবে একটু অন্যভাবে। যাকে বলে শঠে শাঠ্যং সমাচরেৎ।
কী করলেন? পাদ্রীবাবা নড়েচড়ে বসলেন।
বলছি, দাঁড়ান। তার আগে একটু জল খাই। বলেই হাঁক মারলাম, নকুল, একটু ঠান্ডা জল দাও। কথা বলতে বলতে গলা শুকিয়ে গেছে।
নকুল দুজনের জন্য দু গেলাস জল নিয়ে এল।
আমাকেও খেতে হবে?
খান। এক যাত্রায় পৃথক ফল কেন?
দুজনেই জল খেয়ে খালি গেলাস দুটো নকুলের হাতে দিয়ে আবার কথা শুরু করলাম। বললাম, সত্যিই গলা শুকিয়ে যায়নি। নকুলকে ভালো করে দেখাবার জন্যই ডাকলাম।
পাদ্রীবাবা অবাক হয়ে তাকালেন, ভালো করে দেখার দরকার হল কেন?
কারণ আছে। হ্যাঁ, এবার চারু বিশ্বাসকে কীভাবে শাস্তি দিয়েছিলাম বলি। একটু থেমে বললাম, আপনি নিশ্চয়ই জানেন কোনো কোনো ছিঁচকে চোর, দিব্যি ভদ্রসমাজে থেকে যায়। পাবলিক তাদের চেনে। পুলিশও। তবু তাদের ধরে না। নিতান্ত পেটের দায়ে গেরস্ত বাড়িতে কাজ করে। তারপর সুবিধে পেলে ঘটিটা, বাটিটা হাতসাফাই করে সরিয়ে নেয়। কখনও নেয় শাড়ি, ব্লাউজ যা হাতের কাছে পায়। আমরা ছোটোবেলা থেকে এদের চিনতাম। হয়তো পুরোনো শিশি-বোতল কিনতে বাড়ি ঢুকেছে। মা অমনি সবাইকে বলে দিত, সাবধান। অমূল্য এসেছে। শুধু অমূল্য কেন, আরও কয়েকজন ছিল–গোবরা, পটকা, হারু।
