সদাশিববাবু ভীতস্ত বোর্ডারদের শান্ত করে বললেন, আমি বলছি কোনো ভয় নেই। এর আগেও ওরকম শব্দ শোনা গেছে। কোনো বিপদ হয়নি। রাত আড়াইটে বাজল। আপনারা শুতে যান।
একে একে সবাই যে যার ঘরে শুতে চলে গেল। টগারাও চলে গেল। চপল শুধু বলল, সবাই বেরিয়েছিল। শুধু পাদ্রিসাহেব বেরোননি।
.
পাহাড়-পুজোর মেলায়
পরের দিন সকালে মিষ্টি রোদে ঝলমল করে উঠল মাঠাবুরু। গত রাত্রে যে গা-ছমছমে ভাব ছিল আজ সকালে তার রেশমাত্র নেই। সেই অলৌকিক কুকুরের ডাক যা তারা সকলেই শুনেছিল, সকালের তাজা রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল যেন দুঃস্বপ্ন–অবাস্তব।
আজ পাহাড় পুজোর দিন। নীরস পাহাড়ও যে মানুষকে কিছু দেয়—তা সে গাছপালাই হোক, ফলমূলই হোক কিংবা বন্যপ্রাণী, তারই জন্যে কৃতজ্ঞতা জানাতে আদিবাসীরা করে পাহাড়-পুজো। আজ তাই ভোর থেকেই দূর-দূরান্ত গ্রাম থেকে দলে দলে আসছে আদিবাসীরা। মেলা বসে গেছে ইতিমধ্যে সামনের মাঠে। রঙিন চুড়ি, পুঁতির মালা, লিপস্টিক, আর্শি, কানের দুল, টিপের পাতা, মাটির পুতুল ছাড়াও কোদাল, গাঁইতি, হাঁড়ি, কড়া, কী নেই মেলায়? ঝালদা, বিহার থেকেও দোকানিরা এসেছে। কিন্তু আসল লক্ষ্য পুজো। মাঠের শেষে শালের অরণ্যের মধ্যে দিয়ে ধাপে ধাপে উঠতে হবে পাহাড়ে। প্রায় হাজার ফুট ওপরে খোলা আকাশের নিচে বাবার থান। থানে সাজানো পোড়া মাটির ঘোড়া। সেই কোন সকাল থেকে শুরু হয়েছে ভক্তদের আসা-যাওয়া। কাঁধে তাদের মানত করা ছাগল কিংবা মোরগ। বলি হবে বাবার থানে। আবার কারও কারও হাতে থাকে খড়ের মোড়কে পায়রা। বলি দেবার জন্যে নয়, বাবার সামনে, বাবাকে সাক্ষী করে পাহাড়ের ওপর থেকে উড়িয়ে দেয় সকলের জন্যে মঙ্গল কামনা করে। অন্য দিকে পুজো দিয়ে ভক্তরা নেমে আসে মুণ্ডুহীন ছাগল কিংবা মোরগ নিয়ে মহা উল্লাসে। বলির এই মাংস দিয়েই আজ তাদের হবে আনন্দভোজ। তারপর সন্ধ্যে থেকে শুরু হবে ধামসা, মাদলের সঙ্গে নাচগান। তখন মাঠাবুরুর আর এক রূপ।
ওরা তিনজনও পাহাড়ে উঠেছে। বাবার থানের কাছে বেজায় ভিড় দেখে ওরা ওদিকে গেল না। নিচে যেমন মেলা বসেছে, পাহাড়ের ওপরেও তেমনি মেলা। তবে ওপরের মেলায় না দেবদেবীর মূর্তির দোকানই বেশি। নাড়ুগোপাল থেকে কালী, ছিন্নমস্তা সব কিছুই আছে।
টগা বলল, এখানে অনেকক্ষণ ধরে দেখার কিছু নেই। নেমে চল।
চপল বলল, পাহাড়ের ওপর রোদটাও বড়ো চনচনে।
বিকু বলল, আমি তো আগেই বলেছি জায়গাটা বাজে। তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে দুপুরেই পুরুলিয়া চলে যাব। তারপর নিজেদের জায়গা কলকাতায়।
চপল, টগা এ কথার কোনো উত্তর দিল না। ঘুরতে ঘুরতে তারা পাহাড়ের অন্য দিকে চলে গেল। এদিকে দোকানপাট তেমন নেই। কাজেই ভিড় নেই। কয়েকটা কেন্দু আর সেগুন গাছ। তারই তলায় কিছু লোক জড়ো হয়েছে। নিচু হয়ে কী যেন দেখছে। বোধহয় কেউ কিছু বিক্রি করছে। কোনো নিষিদ্ধ জিনিস কি? নইলে দোকান করেনি কেন?
কৌতূহলী হয়ে এরা গাছতলায় এসে দাঁড়াল। একটা তিব্বতী ছেলে। কেমন যেন ভীতু ভীতু চোখ। রুক্ষু চুল। গায়ে একটা ময়লা ছেঁড়া সোয়েটার। পেটের দায়ে সুদূর তিব্বত কিংবা নেপাল থেকে এসেছে। অ্যান্টিকের অস্থায়ী দোকান পেতেছে। খবরের কাগজের ওপর সাজানো হরেকরকমের পুরনো জিনিস–যা এ যুগের সাধারণ মানুষ চোখেও দেখেনি কোনোকালে।
এই অ্যান্টিকের ওপর খুব আগ্রহ টগার। কেনই-বা না থাকবে। কতকাল আগের পুরনো দুষ্প্রাপ্য জিনিস সব। এখন যেন ইতিহাস হয়ে গেছে। তাছাড়া এই বিশেষ অ্যান্টিকে মনে হয় এমন কিছু নিষিদ্ধ জিনিস আছে যা একসময়ে ব্যবহার করত তান্ত্রিক, ওঝারা। ভূত, প্রেতের কারবারিরা, পিশাচ-সিদ্ধরা।
টগা আঙুল দিয়ে একটা মূর্তির বিকট মুখ দেখিয়ে জিগ্যেস করল, ওটা কার মুখ?
ছেলেটি তিব্বতী হলেও টগার প্রশ্নটা বুঝল। জড়ানো স্বরে বলল, মহাকাল।
মহাকালের নাম অনেকেই জানে। নেপালের এক ভয়ংকর দেবতা।
কিছুক্ষণ থেকে বাবার থানের কাছে একটা চাপা হল্লা শোনা যাচ্ছিল। এখন যেন সেটা আরও বেড়ে যাচ্ছে। টগার মন সেদিকে ছিল না। সে অ্যান্টিকগুলো দেখছিল। হরিণের শিঙের একটা মূর্তি তার খুব পছন্দ হয়েছিল। কিন্তু বেজায় দাম–
আরে ওটা কি?
জিনিসটা প্রকাশ্যে রাখা ছিল না। ঝুলির ভেতর ঢোকানো ছিল। প্রায় অর্ধেকটা বেরিয়ে ছিল। সেটা দেখেই টগা চমকে উঠল। একটা ভয়ংকর জানোয়ারের মুখ। অনেকটা কুকুরের মতো–চোয়ালের দুপাশ থেকে ঝকঝকে দাঁত হিংস্র উত্তেজনায় বেরিয়ে এসেছে। লালা ঝরছে দুপাশের কষ বেয়ে। প্রায় এক হাত লম্বা কালো পাথরের মূর্তিটা। মূর্তি নয়, যেন জ্যান্ত একটা জন্তু। এটা কি শিল্পী নিছক কল্পনা করে তৈরি করেছে না বাস্তবে কিছু দেখে?
দেখি, দেখি ভাই ওটা।
দোকানি কেন যেন একটু ইতস্তত করে ওটা বের করতে যাচ্ছিল, হঠাৎ এমনি সময়ে দুদ্দাড় করে লোকে ছুটে নিচে নামতে লাগল। এরা দেখল পুলিশ তাড়া করেছে। সঙ্গে সঙ্গে তিব্বতী যুবকটিও তার দোকান গুটিয়ে একটা পুটলির মধ্যে সব জিনিসগুলো ঢুকিয়ে তড়বড় করে নিচে নামতে লাগল। কি যে হলো টগারা কিছুই বুঝতে পারল না। পুলিশের কখন যে কী মর্জি হয়–
ওরা পাহাড়ের এদিক-ওদিক উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরছে, হঠাৎ দেখল লম্বা কালো একজন বৃদ্ধ, পরনে কালো প্যান্ট, কালো কোট, টাই, টুপি, এইমাত্র পাহাড়ে উঠে ব্যস্ত হয়ে কী যেন খুঁজছেন। চোখে কালো রোদচশমা।
