টগাও একটু হেসে বলল, ও ঐরকমই। একটু বেশি হুঁশিয়ার।
বিদেশে একটু বেশি হুঁশিয়ার হওয়া কিন্তু ভালো। তা হলে ওঁর চা-টা—
মহেন্দ্র বলল, ঘরে দিয়ে এসেছি।
বেশ।
টগা বলল, পাদ্রির কথা বলছিলেন, তা অত দূর থেকে এই পাণ্ডব-বর্জিত দেশে তাঁর আসার কারণ?
সদাশিববাবু দু হাতের ভঙ্গি করে বললেন, জানি না। একটু চুপ করে থেকে বললেন, এবার নিয়ে উনি তিন-তিন বার এলেন। কিন্তু কেন আসেন তা বলেন না।
আপনি জিগ্যেস করেন না?
সদাশিববাবু বললেন, কোনো বোর্ডারকে কি জিগ্যেস করা যায়, যদি তিনি নিজে না বলেন? এমনিতেই নিজে থেকে কোনো কথা বলতে চান না। এর আগে দেখেছি এখানে এসেই বেরিয়ে যেতেন। ফিরতেন সন্ধ্যেবেলা। ওঁর মতো অত বয়েসের লোকের পক্ষে এত পরিশ্রম করা কঠিন ব্যাপার। অলৌকিক কোনো ক্ষমতা না থাকলে পারতেন না।
এখানে থাকতেন কত দিন?
সাত-আট দিনের বেশি নয়।
এই কদিন তিনি কী করতেন আপনি জানতেন না?
সদাশিববাবু মাথা নাড়লেন। আমি কেন? কেউ জানত না। আমিও কোনো আগ্রহ দেখাতাম না।
এরপর কিছুক্ষণ তিনজনেই নিঃশব্দে চা খেতে লাগল।
চপল বলল, আচ্ছা সদাশিববাবু, আপনি তো এখানে অনেক দিন আছেন, রহস্যজনক কোনো ব্যাপার কখনও ঘটতে দেখেছেন?
সদাশিববাবু হেসে বললেন, এখনও গোটা একদিন হয়নি আপনারা এসেছেন। এর মধ্যেই রহস্যের গন্ধ পেলেন নাকি?
চপল একটি অপ্রস্তুতে পড়ল। হাসবার চেষ্টা করে বলল, আসলে এখানকার পরিবেশটাই যেন কিরকম। সবসময়ে মনে হচ্ছে কিছু যেন ঘটবে।
সদাশিববাবু হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলেন। একটু চুপ করে থেকে বললেন, তা বটে।
টগা একটু ঝুঁকে পড়ে কৌতূহলের সঙ্গে জিগ্যেস করল, আপনিও তাহলে সেরকম কিছু ফিল করেন?
না, তেমন কিছু নয়। তবে এইসব বহু প্রাচীন নির্জন জায়গায়, যেখানে প্রকৃত ভৌগোলিক কিংবা ঐতিহাসিক তত্ত্ব মানুষ এখনও পুরোপুরি আবিষ্কার করতে পারেনি, বিজ্ঞানের আলো যেখানে এসে তেমন পড়েনি, হাজার কুসংস্কার জড়িয়ে মানুষ যেখানে কতকগুলো অলৌকিক কিংবদন্তির মধ্যে ডুবে আছে সেখানে রহস্যজনক ঘটনা না ঘটলেই অবাক হতে হয়।
তারপর একটু হেসে বললেন, নইলে এত জায়গা থাকতে পাদ্রিসাহেব সুদূর বাঙ্গালোর থেকে এরকম চুপিচুপি এখানেই বা আসতে যাবেন কেন?
চপল বলল, সত্যিই তো কেন আসেন এখানে?
সদাশিববাবু বললেন, তার উত্তর অন্তত আমার জানা নেই।
কথায় কথায় রাত আটটা বেজে গেল। সদাশিববাবুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ওরা এসে ঢুকল তাদের পাঁচ নম্বর ঘরে। আপাদমস্তক চাদর মুড়ি দিয়ে বিকাশ ওরফে বিকু শুয়েছিল। শুয়েই রইল।
টগা বলল, ঘুমুচ্ছিস নাকি?
বিরক্ত হয়ে বিকু বলল, সন্ধ্যে থেকে পড়ে পড়ে ঘুমোই তারপর সারারাত জেগে থাকি– এত বোকা আমি নই।
ও বাবা, জানলায় ছিটকিনি লাগানো হয়ে গেছে। টগা ঠাট্টা করে হাসল।
বিকু বলল, ছিটকিনি-ভাঙা জানলা নিয়ে আমি শুতে পারি না।
কেন? চোর ঢুকবে?
শুধু চোর কেন, অনেক কিছুই ঢুকতে পারে।
চপল কি বলতে যাচ্ছিল, এমনি সময়ে দূরে সাইকেল-রিকশার হর্ন শোনা গেল।
বাবা, এত রাত্তিরে কে আবার আসছে এখানে?
কে আসছে টগা, চপল জানে ভালো করেই। টগা বলল, তাকে এখনই একবার দেখতে ইচ্ছে করছে।
চপল বলল, সেটা বড় বাড়াবাড়ি হবে। ঐ যে মহেন্দ্র ব্যস্তভাবে ছুটল বিশেষ ব্যক্তিটির মোটঘাট আনতে। আর সদাশিববাবু পাক খাচ্ছেন অফিসঘরের সামনে। রিসিভ করতে যাবার জন্যে মন চাইছে না, আবার নিশ্চিন্তে বসেও থাকতে পারছেন না।
রাত নটার সময়ে মহেন্দ্র এসে জেনে গেল তাদের রাতের খাবার ঘরে দেবে, না, ওরা ডাইনিংহলে যাবে।
টগা ওদের ডাইনিংহলে যাবার ইচ্ছে জানাল। উদ্দেশ্য–যদি পাদ্রিসাহেবও খেতে আসেন।
পাদ্রিসাহেব যে সকলের কাছ থেকে তফাত রেখে চলতে চান টগার তা বুঝতে দেরি হয়েছিল।
রাতের খাওয়া শেষ হলো। যে যার ঘরে চলে গেল। দরজায় দরজায় খিল পড়ল। মহেন্দ্র শতপথী বাংলোর দরজাগুলো ভালো করে পরীক্ষা করে অল্প দূরে ইঁদারার পাশ দিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল।
তারপর সব চুপচাপ। গোটা বনবাংলো সুপ্তির কোলে ঢলে পড়ল।
.
রাত তখন গভীর।
একে নির্জন পাহাড়ি এলাকা, তার ওপর শীতকাল। সমস্ত জায়গাটা থমথম করছে।
হঠাৎ একটা তীক্ষ্ণ চিৎকার–ঠিক যেন একটা পাগলা কুকুরের ভয়ংকর চাপা গর্জন পশ্চিম দিকের পাহাড় কাঁপিয়ে এদিকে ছুটে এল। একবার নয়–তিন-তিন বার। তারপরই প্রতিধ্বনির রেশ রেখে থেমে গেল।
এদের তিনজনেরই ঘুম ভেঙে গেল। বিকু ভয়ে ভয়ে জিগ্যেস করল, কিসের শব্দ?
চপল তাকাল টগার মুখের দিকে।
টগা বলল, বুঝতে পারলাম না।
ততক্ষণে ঘর থেকে সবাই বেরিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে বাংলোর লনে। সবার চোখেমুখেই আতংকের ছাপ। এরা ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
আপনারাও শুনেছেন তো?
ঐ ডাক না শুনে উপায় নেই। বদ্ধ কালাও লাফিয়ে উঠবে।
সকলের মুখেই একটি প্রশ্ন–কিসের গর্জন ওটা? কোথা থেকে এল?
সদাশিববাবুকে দেখে এরা এগিয়ে গেল। চপল বল, আপনি তো এখানে অনেক দিন। আছেন। এর আগে শুনেছেন কখনও?
মাঝে মাঝে শুনেছি। খুব সহজভাবে বললেন সদাশিববাবু।
কিসের গর্জন ওটা?
সদাশিববাবু তেমনি শান্ত স্বরে বললেন, তা বলতে পারব না। শুধু আমি কেন, এ অঞ্চলের কেউই বলতে পারে না।
এ তো মহা মুশকিল হলো। এরকম গর্জন তো কোথাও শুনিনি। এ যে দেখছি বেড়াতে এসে প্রাণটি খুইয়ে যেতে হবে।
