অনেক কিছুই ঢুকতে পারে মানে?
বিকু উত্তর দিল না।
ও বোধহয় ভূত-প্রেতের কথা বলতে চাইছে। বিদ্রূপ করে বলল টগা।
বিকু এবারও উত্তর দিল না। বিরক্ত হয়ে ভেতরে চলে গেল।
ক্রমে অন্ধকার নেমে এল পাহাড়গুলোর গা বেয়ে। পাখির দল ঝাক বেঁধে উড়ল বনের এক মাথা থেকে অন্য মাথায়। চারিদিক নিঝুম হয়ে এল। ওরা দুজনে ভেতরে চলল।
বনবাংলোটা একতলা হলেও অনেকখানি জায়গা জুড়ে। সদর দরজা দিয়ে ঢুকতেই একটা বেশ বড়োসড়ো চৌকোনো ঘর। গোটা চারেক সোফা, গোটা দুই কৌচ রয়েছে। মাঝখানে একটা সেন্টার টেবিলে খবরের কাগজ থেকে আরম্ভ করে ইংরেজি-বাংলা পত্র-পত্রিকা। দেওয়ালে নানা দেশের ছবি। সব দেশই যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে–বেরিয়ে পড়ো, বেরিয়ে পড়ো ঘর থেকে। দেখে যাও আমাদের….প্রকৃতির অফুরন্ত ভাণ্ডার। দেখলেই বোঝা যায় এটা ড্রয়িংরুম। বাংলোর অতিথিরা এখানে বসে আলাপ-পরিচয় করে। কিন্তু এই মুহূর্তে ড্রয়িংরুম ফাঁকা। বোধহয় বাবুরা বাইরে বেড়াতে গেছে। এখনও ফেরেনি।
ফতুয়া-পরা মাঝবয়সী একটা লোক বারান্দা থেকে সুইচ টিপে আলো জ্বালাতে জ্বালাতে এসে ড্রয়িংরুমে ঢুকল। সামনেই এদের দেখে হকচকিয়ে গেল। কাছে এসে মাথা চুলকে বললে, বেরিয়েছিলেন?
চপল বলল, না। বাইরে বসেছিলাম।
হ্যাঁ, বেরোবেন আর কোথায়? এ তো আর পুরুলিয়া টাউন নয়। একমুঠো জায়গা। শুধুই পাহাড়। আপনাদের সঙ্গে মেলামেশা করার যুগ্যি লোক তো নেই।
তবু তো লোক আসে এখানে। বলল টগা।নইলে আর বাংলোটা রাখা হয়েছে কেন?
লোকটা বলল, হ্যাঁ, লোক আসে। তবে দু-তিন দিনের বেশি থাকে না।
চপল জিগ্যেস করল, কেয়ারটেকারবাবু আর তুমি ছাড়া আর কজন থাকে?
আর আছে জমাদার। ঝাড়পোঁছ, ধোওয়া-মোছা করে। রাঁধুনি-বাবুর্চি আছে।
আর বোর্ডার?
লোকটা ঠোঁট উল্টে বলল, যতগুলো ঘর আছে তার অর্ধেকও যদি বোর্ডার থাকত তাহলে বাংলোর চেহারা ফিরে যেত। তাছাড়া কিজন্যেই-বা লোক আসবে? পাহাড় ছাড়া আর তো কিছু নেই। আর বছরে একদিন পাহাড়-পুজো। সে কাহিনীই বা কজন জানে?
একটু থেমে টগা জিগ্যেস করল, তোমায় কী করতে হয়?
বাজার-দোকান করা। আর আপনাদের দেখাশোনা করা।
তোমার নাম কী?
আজ্ঞা, মহেন্দ্র শতপথী।
তুমি ওড়িয়া?
আজ্ঞা।
এখানে কতদিন আছ?
দুবছর হয়নি এখনও। আপনারা চা খাবেন তো?
তা খেলে মন্দ হয় না। কিন্তু আমাদের আর-একজন।
কাছেই কোথাও আছেন নিশ্চয়ই। আপনারা ঘরে গিয়ে বসুন। আমি তিন কাপ চা দিয়ে আসছি। বলে মহেন্দ্র বাইরের বারান্দার আলো জ্বালাতে গেল।
এরা ড্রয়িংরুম থেকে ভেতরে ঢুকল। টানা বারান্দা। দুপাশে পর্দা ফেলা ঘর। ঘর যত সেই তুলনায় বোর্ডার যে বেশি নেই তা তো মহেন্দ্রর মুখেই শোনা গেল। বাঁ দিকের কোণের একটা ঘরে আলো জ্বলছিল। ধুতি-পাঞ্জাবি পরা একজন ভদ্রলোক কিছু খাতাপত্র নিয়ে, সেই ঘরে ঢুকছিলেন, দূর থেকে এদের দেখে দাঁড়িয়ে পড়লেন। অগত্যা এরা নিজের ঘরে না ঢুকে ভদ্রতা করে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেল।
ভদ্রলোকের নাম সদাশিব রায়। এই বাংলোর ম্যানেজারগোছের। কেউ কেউ বলে– কেয়ারটেকার। আসলে বাংলোর সব দায়িত্ব তার ওপরে। বয়েস চল্লিশের কাছে। ছোটো ছোটো চুল। মুখে না-কামানো দাড়ি। বেশ আলাপী মানুষ।
হেসে বললেন, বেরিয়েছিলেন?
নাঃ। প্রথম দিন। আলসেমি হচ্ছিল। কম্পাউন্ডের মধ্যেই বসেছিলাম। বললে চপল।
হা। বেরোলে বেলাবেলি বেরোবেন। আর অন্ধকার হবার আগেই ফিরে আসবেন।
টগা একটু অবাক হয়ে বলল, কেন? এখানে সেরকম কোনো ভয় আছে নাকি?
সদাশিববাবু হেসে বললেন, ভয় কোথায় নেই বলুন। নতুন জায়গা হলে অনভ্যস্ত চোখে অনেক কিছুই অস্বাভাবিক ঠেকে–তাছাড়া পাহাড়ি জায়গা তো। এসব অঞ্চলে যারা থাকে তারা শহর-বাজারের শিক্ষা পায়নি–নানা কুসংস্কার। যাকগে ওসব কথা। একটু চা খাবেন তো?
মহেন্দ্র আমাদের ঘরে চা দিয়ে আসবে। আচ্ছা, এখানে বোর্ডার কতজন আছে?
সদাশিব চোখ বুজিয়ে হিসেব করে বললেন, আপনাদের নিয়ে সাতজন। আর একজন আসবেন।
কখন আসবেন?
সদাশিববাবু বললেন, আর একটু পরে।
টগা অবাক হয়ে বলল, অতদূর পুরুলিয়া থেকে রাত্রেও লোক আসে?
সাধারণত রাতে কেউ আসে না। কিন্তু ইনি আসবেন। আর আগাম টাকা পাঠিয়েছেন যাতে স্টেশন থেকে আসার জন্যে গাড়ি রাখা হয়।
চপল হেসে বলল, তাহলে তো ভি. আই. পি. লোক।
সদাশিববাবু বললেন, ভি. আই. পি. কিনা জানি না, তবে তিনি বাঙ্গালোর থেকে আসছেন। একজন উঁচুদরের পাদ্রি। এই প্রথম নয়, এর আগেও এসেছেন।
এখানে চার্চ-টার্চ আছে নাকি?
সদাশিববাবু হেসে বললেন, চার্চ কোথায় নেই বলুন।
টগা বলল, চার্চ যখন আছে তখন পাদ্রিও তো আছে।
তা তো আছেই। প্রতি বছর খ্রিস্টমাস ডে-তে, ইংরিজির নববর্ষের দিনে, গুডফ্রাইডেতে বেশ ঘটা করে চার্চে প্রেয়ার হয়।
এখানকার, খৃস্টানরা কি সবাই বাঙালি?
বাঙালিই বেশি। সেই সঙ্গে অবাঙালিও আছে। আর আছে আদিবাসীরা। এই যে মহেন্দ্র এখানে তিনকাপ চা দিয়ে যাও।
চপল বলল, আমাদের আর একজন আছে—
হ্যাঁ, বিকাশবাবু। এই তো একটু আগে আমার কাছে এসেছিলেন।
কেন?
একটা হাতুড়ি আর পেরেকের খোঁজে।
হাতুড়ি-পেরেক!
হ্যাঁ, আপনাদের ঘরের একটা জানলার ছিটকিনি খুলে গেছে না ঢিলে হয়ে গেছে, তাই। বললাম, কাল সকালেই ছুতোর ডেকে ব্যবস্থা করে দেব, তো উনি সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চাইলেন না। বলে একটু হাসলেন।
