পুরুলিয়া জেলার দক্ষিণাংশ ছাড়া গোটা জেলা এই মালভূমির মধ্যে। গ্রানাইট জাতীয় শিলায় তৈরি এই অঞ্চলের পাহাড়গুলো বেশ উঁচু উঁচু। অযযাধ্যা পাহাড়, পাঞ্চেৎ পাহাড়, বাঘমুণ্ডি পাহাড়, পঞ্চকূট পাহাড়, রঘুনাথপুরের চণ্ডী পাহাড়–পাহাড়ের যেন আর শেষ নেই। গোর্গাবুরু অযোধ্যা পাহাড়ের সবচেয়ে উঁচু চুড়ো।
হ্যাঁ, গোর্গাবুরু। সারা মানভূমে বিচিত্র সব পাহড়ের নাম কড়াকুবুরু, মাঠাবুরু, গজবুরু। জায়গার নামও আর-পাঁচটা নামের মতো নয়। চরসা গ্রাম যদিও চেনা-চেনা মনে হয়, কিন্তু সিধিয়াটাড়? এ যেন কোনো রহস্যময় জায়গার নাম। কেন এই নাম তারও ব্যাখ্যা আছে। সাঁওতালি ভাষায় ব্লাড় মানে রুক্ষ। আসলে এই অঞ্চলটাই রুক্ষ। শস্যশ্যামল গাঙ্গেয় অববাহিকার কোমলতা এখানে নেই। এখানে পাহাড়ই সব। মাঘ মাসের প্রথম দিনটিতে যেমন সাঁওতালদের নতুন বছর আরম্ভ, তেমনি পাহাড়-পুজোরও দিন। পাহাড়-পুজো! ভাবতে পারা যায়? জীবনের প্রয়োজনে পাহাড়ের গাছপালা, ফল-মূল আর বন্যপ্রাণী–সবই পাহাড়-দেবতার সৃষ্টি। সেই পাহাড়ের দেবতাকে তুষ্ট করার জন্যে করতে হয় পুজো। তাই এইসব অঞ্চলের অনেক কিছুই সাধারণ জীবনের সঙ্গে মেলে না। যেখানে শক্ত কঠিন নীরস পাহাড়কে দেবতা বলে পুজো করা হয় সেখানে এমন অনেক কিছুই ঘটে যা কল্পনা করা কঠিন। নইলে সমাধিক্ষেত্রে কবর দিতে গিয়ে অমন গোঁজামিলের ঘটনা ঘটে?
হাওড়া থেকে রাত্রের আদ্রা-চক্রধরপুর প্যাসেঞ্জার পুরুলিয়ায় পোঁছয় পরদিন সকালে। স্টেশন থেকে রিকশায় বাসস্ট্যন্ড। সেখান থেকে বাসে করে মাঠামোড়। মাঠামোড় থেকে মাঠা বনবাংলো কয়েক মিনিটের পথ।
একদিন বিকেলের দিকে ঐ বাংলোতে এসে পৌঁছলে জনা তিনেকের একটি ছোট দল। পিঠে তাদের রু্যাক আর হাতে একটা করে ভি. আই. পি. মার্কা মাঝারি ব্রিফকেস। ঠিক ছিল তারা কয়েকদিন পুরুলিয়ায় থেকে মাঠাবুরুর পাহাড়-পুজো দেখে যাবে। মাঠা বানবাংলোয় থাকতে পারলে জায়গাটা কাছে হবে, তাছাড়া শহরের বাইরে একেবারে পাহাড়ের কোলে শালের বনের মধ্যে একটা নিরিবিলি নিঝুম বাংলোতে থাকার অভিজ্ঞতাও হবে।
পাহাড়ের কোল ঘেঁষে এই বনবাংলোটা। অল্প কয়েকটা দোকানপাট, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে সাঁওতাল পল্লী। তাই নিয়ে এই মাঠা অঞ্চল। তবু এখানকার এই বাংলোয় বছরের নানা সময়ে অল্প হলেও লোক আসে। বুকিং-এর জন্যে রীতিমতো লিখতে হয় পুরুলিয়ায় ডিভিশনাল ফরেস্ট অফিসারের (বন দফতর) কাছে। নিছক বেড়াতে আসা ছাড়া এখানে আসার আর তেমন কোনো উদ্দেশ্য থাকে না। দু-চার দিন থেকেই তারা চলে যায়। যেখানে মানুষজন নেই বললেই হয় সেখানে শুধু পাহাড়, রুক্ষ অসমতল পথপ্রান্তর, শাল-মহুয়ার অরণ্য আর সন্ধ্যে হতেই জীবজন্তুর ডাক শুনে কত দিন থাকা যায়!
এরা তিন বন্ধু টগা, চপল আর বিকু। সকলেরই বয়েস কুড়ি থেকে বাইশ। যাকে বলে তরতাজা যুবক।
এখানে আসার উদ্দেশ্য পাহাড়-পুজো দেখা ছাড়াও অ্যাডভেঞ্চার করা। অ্যাডভেঞ্চার বলতে যা বোঝায় তা পশ্চিম বাংলার গন্ধমাখা এই মানভূম, পুরুলিয়ায় আর কোথায় পাবে? নিতান্তই শান্ত, জনবসতিবিরল, নিঝাট জায়গা। তবু একঘেয়ে কলকাতা শহর আর ভালো লাগছিল না। তাই বেরিয়ে পড়েছিল কলকাতা থেকে দূরে নির্জন কোনো জায়গার সন্ধানে। সেইদিক দিয়ে পুরুলিয়ার এই জায়গাটি বেশ পছন্দ হয়ে গেল। বিশেষ করে এই মাঠা বনবাংলোটি। অ্যাডভেঞ্চার করার সুযোগ নেই বটে, তবু অজানা, অচেনা নির্জন এই পাহাড়ে জায়গাটা অ্যাডভেঞ্চারের বেশ উপযুক্ত কল্পনা করেও আনন্দ।
অনেকখানি জায়গা জুড়ে কম্পাউন্ড। তারই মধ্যে বাংলো। ফুলে-পাতায় ঢাকা গেটের ভেতরে মোরাম বিছানো রাস্তা। দুপাশে ফুলের বাগান। কম্পাউন্ডের মধ্যে একটা বকুল গাছ। কম্পাউন্ডের পিছনে উঁচু-নিচু পাথুরে পথ কোথায় কোন গ্রামের দিকে চলে গেছে।
এখন পাহাড়ের পিছনে সূর্য ডুবছে। চারিদিক স্তব্ধ। কম্পাউন্ডের মধ্যে সিমেন্ট-বাঁধানো বেঞ্চিতে বসে টগা মুগ্ধস্বরে বলে উঠল, ফাইন!
চপল বলল, সত্যি এমন দৃশ্য কলকাতায় দেখা যায় না।
পাশেই দাঁড়িয়েছিল বিকু। তাকে যেন একটু অস্থির বলে মনে হচ্ছিল। দুবন্ধুকেই সূর্যডোবার দৃশ্যে মুগ্ধ দেখে বিরক্ত হয়ে বললে, একটা কথা মনে করিয়ে দিই, আমাদের ঘরের জানালার ছিটকিনিটা কিন্তু ভাঙা। আর জানলাটা আবার পিছনের দিকেই।
টগা বলল, থাম তো। তোর স্বভাবই হচ্ছে যে কোনো ব্যাপারে শুরুতেই তাল কেটে দেওয়া। ভালো জিনিস নিজেও এনজয় করতে পারিস না, অন্যদেরও করতে দিস না।
বিকু কিছুমাত্র রাগ না করে বলল, কী করব ভাই, আমি তোদের মতো কবি-দার্শনিক নই। আমি প্র্যাকটিকাল। এখানে যে ঘরটা আমাদের দেওয়া হলো তা ভালো করে না দেখেই তোদের পছন্দ হয়ে গেল কিন্তু আমার হয়নি।
কেন? ভুরু বেঁকিয়ে জিগ্যেস করল চপল। যথেষ্ট বড়ো ঘর, একসঙ্গে আমরা থাকতে পারব, এটাই কি যথেষ্ট নয়?
বিকু বললে, কিন্তু ঘরের সিকিউরিটি নেই। সবচেয়ে পুরনো ঘর এটা। দরজাটা নড়বড়ে। জানলার ছিটকিনি নেই। বিদেশ-বিভুই। বিপদ ঘটতে কতক্ষণ?
চপল বলল, বিপদ! তুই কি ভাবছিস জানলা ভেঙে চোর ঢুকবে?
চোর কেন অনেক কিছুই ঢুকতে পারে।
দুজনেই অবাক হয়ে বিকুর দিকে তাকাল।
