স্বামীজির কথা রেখেছি। কাউকে বলিনি তার কথা। তা ছাড়া কেইবা বিশ্বাস করবে কেউ একজন একটি কিশোরীর বিদেহী আত্মা সঙ্গে করে পথে পথে দেশে দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন উদ্ভ্রান্ত হয়ে?
তারপর একদিন
ব্যান্ডেল চার্চে বেড়াতে গিয়েছি। হঠাৎ দেখা স্বামীজির সঙ্গে।
উনি আমায় আবেগে জড়িয়ে ধরলেন।
বললাম–আপনি এখানে?
উনি বললেন, চলুন গঙ্গার ধারে গিয়ে বসি।
দুজনে নিরিবিলি গঙ্গার ধারে এসে বসলাম। উনি অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, লুইসাকে আজ এতদিন পর ছেড়ে দিলাম।
আমি চমকে উঠলাম।
উনি শান্তভাবে বললেন, ভেবে দেখলাম এভাবে চলতে পারে না। সেই লোকটা আমাদের দুজনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। লুইসাও ভয় পাচ্ছিল। ও বুঝতে পারছিল, আমার কাছেও ও নিরাপদ নয়। তাই অনেক ভেবে আজ ওকে মা মেরীর কাছে সমর্পণ করে এলাম। মা মেরী তো শুধু যীশুখৃস্টের মা নন, চরাচরে সমস্ত মানুষের মা। তার কোলের চেয়ে নিরাপদ আশ্রয় আর তো কোথাও নেই অনিমেষবাবু। লুইসাও খুব খুশি।
এই বলে স্বামীজি চুপ করলেন। আর একটি কথাও বললেন না।
সন্ধ্যার অন্ধকার ঘন হয়ে এল।
আমি ডাকলাম–স্বামীজি!
বলুন।
–এবার আমি উঠি। অনেক দূর যেতে হবে।
–আসুন। সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলেন স্বামীজি।
–আপনি উঠবেন না?
–না। কোথায় আর যাব? ভাবছি এখন থেকে এখানেই কোথাও পড়ে থাকব। তবু তো মেয়েটার কাছাকাছি থাকতে পারব। বলতে বলতে উনি হাত দিয়ে চোখের জল মুছলেন।
পাথরমহল
পরিত্যক্ত কবরস্থানে
মাঠাবুরু পাহাড়ের পিছনে সূর্য তখন ডুবছে। সামনে হাঁটুডোবা জল। সরু নদীটার ওপারে শাল, মহুয়ার অরণ্য। জায়গাটায় জনবসতি কম। এমনিতেই সমস্ত দিন নিরিবিলি, নিস্তব্ধ। এখন পড়ন্ত বিকেলে চারিদিক যেন নিঃসাড়। থমথম করছে।
নদীর ধারে বড়ো বড়ো গাছপালার আড়ালে একটা পুরনো কবরস্থান। কবরস্থানটা পরিত্যক্ত। শহরের বাইরে এই কবরস্থানে কেউ এখন আর কবর দিতে আসে না। চোরকাটা আর বুনো গাছের ঝোপে ভর্তি।
সেদিন পড়ন্তবেলায় হঠাৎ এই পরিত্যক্ত কবরস্থানেই একটা কালো কফিন কাঁধে করে কয়েকজন লোক এল। সাধারণত কবর দেবার সময় শবদেহের সঙ্গে আত্মীয়-স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী অনেকেই আসে। কিন্তু এই মৃতদেহের সঙ্গে লোক ছিল খুব অল্প। আর যারা ছিল তারাও যেন কেমন ভয়ে কাঁটা হয়ে ছিল। যেন কোনো গোপন ব্যাপার তাড়াতাড়ি চুকিয়ে ফেলতে এসেছে। এমনকি স্বয়ং পাদ্রিসাহেবের চোখেমুখেও অস্বস্তির ছাপ ফুটে উঠেছে।
কবর আগেই কাটা হয়েছিল। দড়ি বেঁধে খুব তাড়াতাড়ি কফিনটা নামিয়ে দেওয়া হলো। তখন পাশের ইউক্যালিপটাস গাছটার ওপর একঝাক পাখি কিচিরমিচির করে উঠল। যেন তারাও কিছু বলতে চাইল।
প্রথামতো যে কজন লোক দাঁড়িয়েছিল তারা নিচে কফিনের ওপর একমুঠো করে মাটি ছুঁড়ে দিল। তখন গম্ভীর গলায় পাদ্রিসাহেব পড়ছিলেন–যেহেতু সর্বশক্তিমান ঈশ্বর আপন পরম দয়াতে প্রসন্ন হইয়া এক্ষণে পরলোকগত আমাদের প্রিয় ভ্রাতার আত্মাকে–
প্রিয় ভ্রাতা কথাটি উচ্চারণ করতে গিয়ে পাদ্রিসাহেবের গলার স্বর হঠাৎ আটকে গেল। তিনি দুবার স্বর পরিষ্কার করে নিয়ে ফের পড়তে লাগলেন–প্রিয় ভ্রাতার আত্মাকে আপনার নিকট লইয়াছেন, অতএব আমরা তাহার শরীর ভূমিতে সমর্পণ করি, মৃত্তিকাতে মৃত্তিকা, ভস্মেতে ভস্ম, ধূলাতে ধূলা, এই সত্য ও নিশ্চিত ভরসায় যে, আমাদের প্রভু যীশুখৃস্ট দ্বারা অনন্ত জীবন পুনরুত্থান হইবে।
পরে সকলে চোখ বন্ধ করে হাত জোড় করে পাদ্রির সঙ্গে গলা মিলিয়ে সমবেত কণ্ঠে এই কটি কথা উচ্চারণ করল–
হে প্রভু, আমাদের প্রতি দয়া করো।
হে খৃস্ট, আমাদের প্রতি দয়া করো।
হে ত্রাতা, আমাদের প্রতি দয়া করো।
যারা এর আগে পাদ্রিসাহেবের প্রার্থনা শুনেছে তারা লক্ষ্য করল আজ আর তার সেই ভরাট গম্ভীর গলা নয়, পরিবর্তে যেন ক্ষীণ স্বর তার কণ্ঠ রুদ্ধ করে দিচ্ছিল। অথচ সে স্বর কিছুতেই অঞরুদ্ধ নয়।
কেন এই কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন?
শুধু পাদ্রিসাহেবেই নন, যারা উপস্থিত ছিল তারা কেউই প্রার্থনা মন দিয়ে শুনছিল না। প্রার্থনা শেষ হতেই কবরে মাটি ভর্তি করেই তাড়াতাড়ি কবরস্থান থেকে বেরিয়ে এল। যেন এখান থেকে চলে যেতে পারলেই বাঁচা যায়।
আরও আশ্চর্য ব্যাপার বাইরে বেরিয়ে এসে তারা কেউ মৃতের বিষয়ে একটি কথাও আলোচনা করল না। প্রত্যেকেই শুধু নিজের জামার ওপর চোখ বুজিয়ে ক্রুশচিহ্ন আঁকল। তারপর দ্রুত যে যার বাড়ির উদ্দেশে পা চালাল।
পরিত্যক্ত নির্জন কবরস্থানে পড়ন্তবেলায় মাত্র কয়েক মিনিটের এই অনুষ্ঠানটি বাইরের যদি কেউ দেখত তা হলে সে অবাক হতো। অবাক হতো এই ভেবে যে, অনুষ্ঠানটি এমন গোঁজামিল দিয়ে সারা হলো কেন? কোনোরকমে মৃতদেহটি মাটি দিয়ে পালাতে পারলেই যেন সবাই বাঁচে। এত ভয় কিসের? প্রিয় ভ্রাতার আত্মা বলতে গিয়েই বা পাদ্রির স্বর আটকে যাচ্ছিল কেন?
এসবের উত্তর কে দেবে? এ নিয়ে কাউকে প্রশ্ন করাও যাবে না। কাজেই যা চুপচাপ হয়ে গেল তা চাপা থাকাই ভালো।
.
অদৃশ্য কুকুরের গর্জন
বিচিত্র জায়গা পশ্চিমবঙ্গের এই মালভূমি অঞ্চল। সেদিনের মানভূম, সিংভূম ছাড়াও গোটা পুরুলিয়া জেলা, বাঁকুড়া, মেদিনীপুর, বীরভূম ও বর্ধমান জেলার অংশবিশেষ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিমের মালভূমি অঞ্চল।
