অনেকক্ষণ ঘুমোতে পারেননি স্বামীজি। বারে বারেই চৌকির নিচে উঁকি দিয়ে দেখেছেন। না, কিছু নেই। ফাঁকা–যেমন ছিল। শুধু জায়গাটা বরফের মতো ঠাণ্ডা।
.
কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলেন খেয়াল ছিল না। হঠাৎ কিসের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। শব্দটা আসছে মাথার দিকের জানলার কাছ থেকে। তিনি মশারির ভেতর থেকেই টর্চ জ্বাললেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর শরীরের পেশীগুলো শক্ত হয়ে উঠল।
দেখলেন কবরখানার সেই ভয়ংকর লোকটা দুহাতে জানলার শিকগুলো উপড়ে ফেলবার চেষ্টা করছে…
স্বামীজি লাফ দিয়ে উঠে দেওয়ালের কোণ থেকে তাঁর ত্রিশূলখানা নিয়ে ছুঁড়ে মারলেন। জানলার শিকে লেগে ত্রিশূলটা ঝনঝন্ করে মাটিতে পড়ে গেল। আর ধুপধাপ শব্দ করে লোকটা ছুটে পালাল।
এরপরেও বার তিনেক ঐ ঘরে ঢোকবার চেষ্টা করেছিল লোকটা–যাকে লুইসা বলে শয়তান। কিন্তু ঘরে ঢুকতে পারেনি। সবসময়ে স্বামীজি বাড়ি পাহারা দিয়েছেন।
কদিন পর স্বামীজি কলকাতা থেকে চলে এলেন বর্ধমান। বর্ধমান থেকে রানীগঞ্জ, আসানসোল, গোমো, তিনপাহাড়। যেখানেই তিনি লুইসাকে নিয়ে পালাচ্ছেন সেখানেই শয়তানটা ধাওয়া করছে। সুইসাকে সে ধরবেই। কি করে সে সন্ধান পাচ্ছে সেটাই আশ্চর্য!
শেষে এখন পুরীর এই নির্জন জায়গায় আত্মগোপন করে আছেন স্বামীজি। তাঁর আশা–শয়তানটা এখানে ওঁদের কিছুতেই খুঁজে পাবে না।
কথা শেষ করে স্বামীজি থামলেন। আমি বিস্ময়ে স্তম্ভিত।
মেয়েটি কি এখনও এখানে আছে? স্বামীজি একটু হাসলেন। বললেন, আছে বৈকি। তার তো আর কোথাও যাবার জায়গা নেই।
–কোথায় আছে?
–ঐ ঘরে। বলে আঙুল দিয়ে পাশের ঘরটা দেখিয়ে দিলেন।
আমি ঘরটার দিকে তাকালাম।
দেখতে চান ঘরটা?
বিনীতভাবে বললাম–খুব ইচ্ছে করছে।
স্বামীজি নিয়ে গেলেন পাশের ঘরে। ঘরটা সন্ধ্যের পরও অন্ধকার।
আমার মনের কথা আন্দাজ করে স্বামীজি বললেন, ও অন্ধকারেই থাকতে ভালোবাসে।
তিনি ঘরে ঢুকেই সবুজ আলোটা জ্বেলে দিলেন। আমি এক পা এগোতেই ধূপের গন্ধর সঙ্গে এক ঝলক কনে বাতাসের ধাক্কা খেলাম। বুঝলাম, সে আছে।
একটা চৌকিতে সাদা ধবধবে চাদর পাতা। চাদরটা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে মেঝে পর্যন্ত।
–এগিয়ে আসুন।
আমি পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম। আমার হাত দুটো আপনা থেকেই শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের জন্যে জড়ো হয়ে গেল।
–লুইসা, জেগে আছ?
কয়েক মুহূর্ত নিস্তব্ধতা। তারপর বিছানার চাদরটা একটু কেঁপে উঠল।
সুইসা, আমার এক নতুন বন্ধু তোমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। ইনি খুব ভালো লোক।
সঙ্গে সঙ্গে বিছানার চাদরটার ওপর দিয়ে যেন ঢেউ খেলে গেল। স্বামীজি নিচু গলায় বললেন, আপনি দেখতে এসেছেন জেনে ও খুব খুশি।
কিন্তু তারপরেই চাদরটা যেন এক অদৃশ্য ঝড়ের ধাক্কায় এলোমেলো হয়ে গেল।
স্বামীজি সভয়ে বলে উঠলেন–কি হলো লুইসা?
উত্তর শোনা গেল না বটে কিন্তু চাদরটা ওলোট-পালোট হয়ে গেল।
লক্ষ্য করলাম স্বামীজির মুখে ছায়া নেমেছে।
বললেন, যে কোনো কারণেই হোক ও ভয় পেয়েছে। কিন্তু বুঝছি না। হঠাৎ কিসের ভয়?
আমি আর দেরি না করে বিদায় চাইলাম।
স্বামীজি বললেন, টর্চ এনেছেন তো?
বললাম–হুঁ।
–আমি আপনাকে এগিয়ে দিতে পারছি না বলে দুঃখিত। বোধ হয় সেই শয়তানটা এখানেও এসেছে। কাছেই কোথাও আছে। সাবধানে যাবেন।
খুব ভয়ে ভয়েই সেদিন নিজের আস্তানায় ফিরে এলাম।
পরের দিন বেলা দশটা নাগাদ স্বামীজির সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। কালকের ব্যাপারটা ভুলতে পারিনি। একবার খবর নেওয়া দরকার।
গিয়ে দেখলাম স্বামীজি খুবই ব্যস্ত। জিনিসপত্র বাঁধাছাদা করছেন। আমায় দেখে হাসলেন একটু।
–আসুন।
–কি ব্যাপার?
–এখান থেকেও উঠতে হলো।
–সে কী!
স্বামীজি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, ঐ লোকটির সঙ্গে যে আমি পেরে উঠব না কাল রাত্তিরে তা হাড়ে হাড়ে বুঝেছি। লোকটি শুধুমাত্র একজন ওঝা বা ঐ ধরনের কিছু নয়। আমার ধারণা যদি ভুল না হয় তাহলে সে রীতিমতো প্রেতসিদ্ধ। এদের অসীম ক্ষমতা। এরকম লোক আগে দেখা যেত। তাদের পিশাচসিদ্ধও বলা হতো। শ্মশানে, গোরস্থানে ঘুরে বেড়াত মৃত আত্মার সন্ধানে। এরা আত্মা চালান পর্যন্ত করতে পারত।
আমি অবাক হয়ে বললাম–সেটা আবার কি জিনিস?
–আমিও সঠিক জানি না। যতদূর জানি, এইসব প্রেতসিদ্ধরা একজনের মৃতদেহে অনন্যর আত্মা ধরে এনে ঢুকিয়ে দিতে পারত। মৃতদেহ বেঁচে উঠত। চেহারায় এক মানুষ–কিন্তু মনে-প্রাণে অন্য। সে এক বিশ্রী ব্যাপার।
একটু থেমে বললেন, আমার মনে হয় এ লোকটাও সেই সম্প্রদায়ের। এত দিন পরেও সুইসার আত্মা নতুন জন্ম পায়নি, এটা স্বচক্ষে দেখে ওকে ধরবার জন্যে পিছু নিয়েছে। মেয়েটাও খুব ভয় পাচ্ছে। এখন তো দেখলাম লোকটা তার দুর্দান্ত শক্তির বলে এখানেও আমাদের সন্ধান পেয়েছে। কাজেই পালাতে হচ্ছে। জানি না শেষ পর্যন্ত কোথায় এমন নিরাপদ আশ্রয় পাব যেখানে লোকটা মাথা গলাতে পারবে না।
বেশিক্ষণ থাকিনি। চলে আসবার সময়ে স্বামীজিকে আমার দেশের ঠিকানা দিয়ে এলাম। বললাম–যদি সম্ভব হয় মাঝে মাঝে চিঠি দিয়ে আপনার আর লুইসার খবর জানাবেন।
উনি সম্মত হলেন।
.
বছর তিনেক কেটে গেছে।
মাঝে মাঝে স্বামীজির চিঠি পাই। তিনি লুইসাকে নিয়ে লুকিয়ে বেড়াচ্ছেন কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত। কিন্তু পিছনে লেগেই আছে সেই প্রেসিদ্ধ লোকটা। যেখানে স্বামীজি যাচ্ছেন, সেখানেই সে। তাই স্বামীজির চিঠির ছত্রে ছত্রে শুধু ভয় কি করে, কোন নিরাপদ আশ্রয়ে গেলে মেয়েটা রক্ষা পাবে।
