তারপর আর কয়েক দিন এসে কলকাতার বাইরে চলে যাই। অনেক দিন আর আসা হয়নি।
এই পর্যন্ত বলে তিনি থামলেন। বললেন, সন্ধ্যে হয়ে গেছে। আমার নিত্যকর্মটি সেরে নিই।
স্বামীজি উঠে গেলেন। তারপর প্রায় পনেরো মিনিট ধরে শাঁখ-ঘন্টা বাজিয়ে পুজো করে ফিরে এসে আবার বলতে শুরু করলেন।
তিনি এরপর যা বলে গেলেন তা এইরকম—
প্রায় বছরখানেক পর স্বামীজি আবার একদিন সেই সমাধিক্ষেত্রে এলেন।
শীতকাল।
বেলা তখন প্রায় দুটো। রোদের তেমন তেজ নেই। দারোয়ান সে সময়ে ছিল না। হয়তো বিড়ি-টিড়ি কিনতে গিয়েছিল।
স্বামীজি তাড়াতাড়ি মেরিয়া লুইসার সমাধির কাছে এগিয়ে গেলেন। লুইসাকে দেখার জন্যে তিনি ব্যাকুল। কিন্তু যা দেখলেন তাতে তার চক্ষুস্থির! সমাধিটা ভেঙে তছনছ। দামী পাথরের ফলক উধাও।
তিনি তখনই ছুটে এলেন দারোয়ানের কাছে। তখন দারোয়ান ফিরে এসেছে। তাকে জিজ্ঞেস করে স্বামীজি জানলেন কয়েকদিন আগে রাত্রে চোর এসে সমাধি ভেঙে পাথর নিয়ে চলে গেছে।
স্বামীজি বিমর্ষমুখে আবার সেই ভাঙা সমাধির কাছে এসে বসলেন।
কতক্ষণ বসে রইলেন। তারপর ক্রমে সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়ল। একে শীতকালের বেলা, তার ওপর গাছে ঢাকা সমাধিক্ষেত্র। দেখতে দেখতে অন্ধকার হয়ে এল। তিনি উঠব-উঠব করছেন, হঠাৎ দেখলেন সেই মেয়েটি একটা গাছের আড়াল থেকে চোখ মুছতে মুছতে তার দিকে আসছে। অল্প ঘষা কাচের মধ্যে দিয়ে কাউকে যেমন আবছা দেখা যায়, একেও তেমনি দেখা যাচ্ছিল।
লুইসা!
মেয়েটি খুব নিচু গলায় ইংরিজিতে অল্প কয়েকটি কথা বলল।
–থাকবার জায়গা ভেঙে দিয়েছে।
–ঘুরে বেড়াচ্ছি।
–একটা শয়তান আমার পিছনে লেগেছে।
–ভয় পাচ্ছি…
স্বামীজি স্পষ্ট তার কথা শুনে অবাক। একটু সামলে নিয়ে বললেন, আমি ছিলাম না…আজই এসেছি…কালই তোমার জায়গা নতুন করে গেঁথে দেবার ব্যবস্থা করব।
এমনি সময়ে দারোয়ান হাঁকল–বাবুজি! পাঁচটা বাজল।
-হ্যাঁ, যাই। স্বামীজি চেঁচিয়ে সাড়া দিলেন।
–শোনো লুইসা, ভয় পেও না। আমি কালই ব্যবস্থা করব।
উত্তরে মেয়েটি বোধহয় নিশ্চিন্ত হতে পারল না। দুবার মাথা নেড়ে যেন বোঝাতে চাইল–এখানে আর থাকতে পারবে না। তারপর মিলিয়ে গেল।
সিমেট্রি থেকে চিন্তিত মনে বেরিয়ে এলেন স্বামীজি। হঠাৎ একটা কনকনে বাতাস মুহূর্তের জন্যে তাকে কাঁপিয়ে দিয়ে গেল। তিনি অবাক হলেন। যদিও এটা পুরোদস্তুর শীতকাল তবু মুহূর্তের জন্যে এমন ঠাণ্ডা বাতাস বইল কেন?
তিনি হাঁটতে লাগলেন পার্ক স্ট্রীট ধরে। পার্ক স্ট্রীট থেকে ঢুকলেন রডন স্ট্রীটে।
জায়গাটা খুবই নির্জন। স্বামীজি হনহন করে হাঁটছেন তাঁর বাসার দিকে। এরই মধ্যে বেশ অন্ধকার হয়ে এসেছে। হঠাৎ মনে হলো কেউ যেন তার পিছন পিছন আসছে। তিনি তখনই ঘুরে দাঁড়ালেন।
না, কেউ নেই।
কেন কে জানে তিনি একটু সাবধান হলেন।
এরকম হলো আরও দুবার। তিনি স্থির বুঝলেন, কেউ তার পিছু নিয়েছে। কিন্তু তাঁর মতো নিঃস্ব মানুষ–যাঁর টাকাপয়সা কিছুই নেই, তার পিছু নেবার কারণ কি?
আবার সেই পায়ের শব্দ–এবার বেশ স্পষ্ট। তিনি তৎক্ষণাৎ ঘাড় ঘোরালেন। দেখলেন বেশ দূরে একটা লম্বা মতো লোক। হ্যাঁ, কবরখানার সেই লোকটাই সতর্কভাবে তাঁকে অনুসরণ করছে।
কিন্তু…সে তো বেশ দূরে রয়েছে। খুব কাছে পরপর তিন বার সেটা তবে কার পায়ের শব্দ?
তিনি আর ভাবতে পারলেন না। তাঁর মতো মানুষেরও কিরকম ভয় করতে লাগল। তিনি আরও জোরে হাঁটতে লাগলেন যাতে তাড়াতাড়ি বাড়ি পৌঁছতে পারেন।
এক সময়ে তিনি বাড়ি এসে পৌঁছলেন। তাড়াতাড়ি তালা খুলে ভেতরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিলেন। আলো জ্বাললেন। জানলাগুলো খোলা ছিল, চটপট বন্ধ করে দিলেন।
তারপর রাত নটার পর সামান্য কিছু খেয়ে যখন মশারি টাঙিয়ে শুতে যাবেন, দেখলেন মশারির বাইরে ছায়া-ছায়া মূর্তি নিয়ে মেয়েটি দাঁড়িয়ে।
স্বামীজি চমকে উঠে বসলেন।
আরে সব্বনাশ! ও কি করে এখানে এল? তা হলে কবরখানা থেকে বেরিয়ে সেই যে কয়েকবার হালকা পায়ের শব্দ পাওয়া গিয়েছিল সেটা এরই।
–তুমি এখানে?
–তোমার সঙ্গে সঙ্গেই তো আসছি।
–কেন?
–বাঃ রে! আমি থাকব কোথায়? ওখানে চোরে আমার ঘর ভেঙেছে, শয়তান ফাঁদ নিয়ে আমায় ধরার জন্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তুমি ছাড়া আমার তো আর কেউ নেই!
স্বামীজি মাথা চুলকে বললেন, কিন্তু তুমি মৃত, আমি জীবিত। একসঙ্গে থাকা সম্ভব কি করে?
মেয়েটি একটু হাসল। বলল–No problem uncle.
–তবু–স্বামীজি চিন্তা করতে লাগলেন।
–বেশ, তবে থাকো। কিন্তু থাকবেটা কোথায়?
তার উত্তর না দিয়ে কিশোরীটি রিরিনে গলায় বলল, আমাকে নিয়ে থাকতে তোমার কি ভয় করবে?
স্বামীজি ঢোঁক গিলে বললেন, না না, তোমাকে আর ভয় কিসের? তুমি তো আমারই মেয়েটার মতো।
না আঙ্কেল, মৃত আত্মাকে সকলেই ভয় পায়। আমি আমার দাদাকে খুব ভালোবাসতাম। মরে গিয়েই দাদাকে দেখা দিলাম। ও তখন কাঁদছিল। কিন্তু আমাকে দেখেই ভয়ে অজ্ঞান হয়ে গেল।
স্বামীজি তখন বোধ হয় অন্য কথা ভাবছিলেন। সেই একই সমস্যার কথা তুললেন।
–তুমি থাকবে কোথায়?
–আমার শোবার জায়গা আমি করে নিচ্ছি। বলে মেয়েটি সুরুৎ করে চৌকির নিচে চলে গেল।
এ এক অদ্ভুত অবস্থা। যে চৌকিতে স্বামীজি শুয়ে রয়েছেন তারই নিচে একটি প্রেতাত্মা। হোক সে কিশোরী তবু তো সে মানুষ নয়। তার দাদাও বোনকে দেখে ভয় পেয়েছিল।
