শুনে অবাক হবেন, তীর্থ দর্শনের চেয়ে দেশে যেখানে যত বড়ো বড়ো কবরস্থান আছে সেসব জায়গাতেই যেতে পছন্দ করতাম।
জিজ্ঞেস করলাম কেন? আপনি কি ভূত-প্রেত নিয়ে গবেষণা করেন?
উত্তরে উনি হাসলেন একটু। বললেন না। ভূত-প্রেতে আমার কোনো বিশ্বাসই ছিল না। আমি শুধু কবরের গায়ে লাগানো পাথরের ফলকের ওপর খোদা লেখাগুলো পড়তাম। কার কি নাম, কবে, কোথায় মারা গেছে ইত্যাদি। পড়তাম আর কল্পনা করতাম কতজনকে দিয়ে এরা একদিন চোখ বুজেছিল। আবার, যারা সেদিন কেঁদেছিল তারাও হয়তো আজ আর কেউ নেই।
স্বামীজি আবার একটু থামলেন। তারপর বললেন, আসল কথা কি জানেন অনিমেষবাবু? আমি নিজে শোকা স্বামী, শোকার্ত পিতা। তাই অন্যের শোক অনুভব করতে পারতাম। তা সে চেনাই হোক আর অচেনাই হোক।
একটু থেমে বললেন, কলকাতায় গেলে আমার সবচেয়ে বেশি আকর্ষণের জায়গা ছিল পার্ক স্ট্রীটের পুরনো সিমেট্রিটা। ঐ পুরনো কবরখানাটা আপনি দেখেছেন?
দেখেছি। বাইরে থেকে।
বাইরে থেকে কিছু বোঝা যাবে না। ভেতরে যাবেন। পাঁচিল ঘেরা বিরাট জায়গা জুড়ে কত-না গাছ। বোধহয় আমগাছই বেশি। তারই ঠাণ্ডা হয়ার নিচে নানারকমের মনুমেন্ট। তারই তলায় ঘুমিয়ে আছে কত মানবাত্মা। তারা ওখানেই শুয়ে আছে প্রায় দেড়শো বছর ধরে। অদ্ভুত জায়গা। যদি যান দেখবেন শান্তি পাবেন।
তা আমি সেখানে প্রায়ই যেতাম। আর ঘুরে ঘুরে পাথরের মনুমেন্টের গায়ে লেখাগুলো পড়ে মনে মনে সেই মৃত মানুষদের সঙ্গে আলাপ করে নিতাম। উঠে আসতে ইচ্ছে করত না। কিন্তু পাঁচটার পরই গেট বন্ধ হয়ে যায়। ওখানে তখন আর কারও থাকার অধিকার নেই। এখন অবশ্য মানুষের -ডর-বিবেকবোধ কমে যাচ্ছে। তাই নিষ্ঠুর, লোভী এক শ্রেণীর মানুষ রাতের অন্ধকারে পাঁচিল টপকে ভেতরে ঢুকে কবরের ওপরের দামী দামী পাথরের ফলক ভেঙে নিয়ে যায়। প্রচুর টাকায় সেগুলো বিক্রি করে।
আমি খুব দ্রুত কথা বলছি, আপনার বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে না তো?
–কিছুমাত্র না। আপনি বলে যান।
–এখানে প্রায়ই আসতে আসতে সিমেট্রির দারোয়ানের সঙ্গে আমার বেশ আলাপ হয়ে গিয়েছিল। লোকটি খুব ভালো। তবে মাঝে মাঝে ওর কাছে একজন অন্যদেশীয় লোক আসত। যেমন লম্বা তেমনি চওড়া চেহারা। তার পরনে থাকত কালোরঙের কুর্তা আর ঢিলে পাঞ্জাবি। মাথায় পাগড়ী। চোখদুটো ছিল সাপের চোখের মতো হিংস্র। তাকে আমার মোটেই ভালো লাগত না। সেও যে আমায় পছন্দ করত না তা তার চাউনি দেখেই বুঝতে পারতাম। কিন্তু কেন লোকটা আমায় পছন্দ করত না তা আমি জানি না।
একদিন কবরখানায় ঘুরতে ঘুরতে একটা মনুমেন্টের কাছে এসে তার গায়ে লেখাটা পড়লাম।
১৮০১ সালে মেরিয়া লুইসা নামে কোনো একটি চোদ্দ বছরের মেয়ে প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিল। তার বাবা এখানে একজন উচ্চপদস্থ কর্মচারী ছিলেন।
মাত্র চোদ্দ বছরের মেয়ে! আহা!
সঙ্গে সঙ্গে আমার নিজের মেয়েটার কথা মনে পড়ল। সেও চোদ্দ বছর বয়েসে মারা গিয়েছিল। আমার মনে হলো আমার মেয়েই যেন এখানে শান্তিতে শুয়ে আছে।
তারপর থেকে কলকাতায় এলেই আমি মেরিয়া লুইসার কবরের সামনে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতাম।
স্বামীজি এবার উঠে ঘরে আলো জ্বেলে দিলেন।
তারপর বলতে লাগলেন–একদিন বসে থাকতে থাকতে বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সামান্য একটু শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। দেখলাম সুন্দরী একটি মেয়ে কবরের ফলকের আড়ালে দেখা দিয়েই মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে গেল।
কী ব্যাপার! তখনই উঠে দাঁড়িয়ে চারিদিকে খুঁজলাম। কিন্তু কাউকে দেখতে পেলাম না।
অথচ আমি তাকে পরিষ্কার দেখেছি। ফর্সা টকটকে রঙ, কাঁধ পর্যন্ত পশমের মতো নরম কটা চুল, পরনে স্কার্ট, বয়েস বছর চোদ্দ। মুখে করুণ হাসি।
কে এই মেয়ে? মেরিয়া লুইসা নয়তো? এতকাল পরেও তার আত্মা কি নতুন দেহ ধারণ করেনি?
এ কী রহস্য!
স্বামীজি একটু থামলেন। আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। আমি নড়ে চড়ে বসলাম।
–তারপর থেকে যখনই আমি পার্ক স্ট্রীটের ঐ কবরখানায় আসি, ওখানেই আমি ব্যাকুল হয়ে বসে থাকি, যদি আর একটিবার তার দেখা পাই।
স্বামীজি আবার একটু থামলেন। দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন, অনিমেষবাবু, আপনার শুনতে ইচ্ছে করছে তো?
বললাম–নিশ্চয়।
–একদিন অমনি বসে আছি, হঠাৎ পিছনে শুকনো পাতার ওপর খসখস শব্দ। কেউ যেন এদিকে আসছে।
চমকে ফিরে দেখলাম সেই ভিনদেশী ভয়ংকর লোকটা আমার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। আমায় কর্কশ গলায় হিন্দিতে জিজ্ঞেস করল–তুমি এখানে রোজ কি করতে আস?
তার বলার ভঙ্গিতে আমারও রাগ হলো। বললাম–আমি কেন আসি তা তোমায় বলতে যাব কেন?
ও বলল, তোমার মতলব আমি বুঝি। তবে তুমি যা ভাবছ তা হতে দেব না। সাবধান!
বলে সে চলে গেল।
আমি তো অবাক। আমার আবার মতলব কি? আমি শুধু মেয়েটিকে দেখতে চাই।
ওখান থেকে বেরিয়ে আসার সময়ে দারোয়ানকে সব কথা বলে জিজ্ঞেস করলাম–লোকটা কে হে?
দারোয়ান বলল, কিছুদিন ধরে আসছে। আমার সঙ্গে গল্প করে। ভেতরে ঘুরে বেড়ায়। ওঝার মতো ভূত-প্রেত নামায়, বশ করে।–এইসব তো বলে। আমার বিশ্বাস হয় না। তবে লোকটাকে আমারও ভালো লাগে না।
–তা হলে লোকটাকে ঢুকতে দাও কেন?
দারোয়ান খৈনী টিপতে টিপতে বলল, কি করব? যে কেউই তো ঢুকতে পারে। তবে পাঁচটা পর্যন্ত।
