বলেই একটু থামতেন। বাকিটা শেষ করতেন অন্যরা।
ডান হাতের বুড়ো আঙুলটা পিছনের দিকে ঠেলে কোনো একজন অনুপস্থিত ব্যক্তিকে উদ্দেশ করে কেউ বলতেন–ওঁর কথা বলছেন তো? উনি তো একটা পাগল!
আর একজন বললেন–পাগল কেন হতে যাবে! আসলে সাধু-সন্নেসী মানুষ তো। তাই ওঁদের জীবনধারার সঙ্গে আমাদের মেলে না। সেইজন্যেই কারো সঙ্গে মেশেন না।
অমনি আর একজন ফোঁস করে ওঠেন–সাধু না আরও কিছু সাধুর বেশে নিশ্চয় কোনো চোর-ডাকাত। যে-কোনোদিন দেখবেন আমার-আপনার বাড়ি ডাকাতি হয়ে যেতে পারে।
ডাকাতির কথা শুনেই সবার মুখ চুন। কেননা ডাকাত পড়লে বাঁচাবার কেউ নেই। এখানে কাছেপিঠে কখনো পুলিশ দেখা যায় না। ওঁদের কথাবার্তা শুনে যেটুকু বুঝলাম তা এই মাস কয়েক হলো কাছেই একটা বাড়িতে একজন স্বামীজি গোছের লোক এসেছেন। যে বাড়িটি তিনি ভাড়া নিয়েছেন সেটা একটা পরিত্যক্ত বাড়ি। চারিদিকে ঝোপজঙ্গল। এত জায়গায় এত বাড়ি থাকতে ঐ বাড়িটাই কেন যে তার পছন্দ হলো এটাই রহস্য। বাড়িটা আবার নিজের পয়সায় সারিয়ে-সুরিয়ে বাসযোগ্য করে নিয়েছেন। কোনো ভাড়াটে নিজের গাটের পয়সা খরচা করে এমন করে সারায় নাকি?
রোজ ভোর আর সন্ধ্যেবেলায় কাঁসর-ঘন্টা বাজিয়ে তিনি পুজো করেন। কি পুজো করেন কে জানে!
তিনি বড়ো একটা বাড়ি থেকে বেরোন না। সারা দিন একা একা কি করেন কেউ জানে না। যদিও বা এক-আধবার বেরোতে দেখা যায়–তা তিনি কারও দিকে ফিরে তাকান না। এমনি দাম্ভিক!
এ হেন একজন লোককে নিয়ে যে নানা কথা উঠবে তা তো স্বাভাবিক।
কয়েক দিন পর আরও কিছু রটনা কানে এল। অনেকেই নাকি ঐ পথ দিয়ে যেতে যেতে শুনেছেন দিনে দুপুরে বা রাত্তিরে স্বামীজি কারো সঙ্গে ইংরিজিতে কথা বলছেন। কি কথা বলেন তার দু-একটা শ্রোতাদের কণ্ঠস্থ। যেমন–
–No no dont go out
.–Dont open the window.
—No fcar. I am here.
মজার ব্যাপার এই কথাগুলো তিনি এই বলেন। কারও উত্তর শোনা যায় না।
এই থেকে অনেকের ধারণা হয়েছে লোকটা সত্যিই পাগল। কিংবা অন্য কোনো ব্যাপার।
অন্য ব্যাপার আর কি হতে পারে যখন, যার সঙ্গে তিনি কথা বলছেন সে অদৃশ্য!
শুনতে শুনতে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।
–কি বলতে চাইছেন মহাপাত্রমশাই? আমি জিজ্ঞেস করি।
উনি উত্তেজিত হয়ে বলেন, কি বলতে চাই এখনো বুঝতে পারছেন না? উনি কোনো তান্ত্রিক কিংবা ওঝা। বাড়িতে ভূত পুষে রেখে দিয়েছেন। দরকার বুঝলেই আমার-আপনার পিছনে ভূত লেলিয়ে দেবেন।
সবাই শুনে স্তম্ভিত। এতটা কেউই ভাবেননি।
আমি অবশ্য কিছু না বলে হাসলাম। ভূত কুকুর-বেড়াল কিনা যে ঘরে পুষে রাখবে!
যাই হোক, খুব কৌতূহল হলো। ঠিক করলাম একদিন স্বামীজির সঙ্গে দেখা করবই।
.
ঝোপের মধ্যে প্রায়-লুকনো পুরনো একতলা ছোট্ট বাড়িটা দেখেই মনে হলো, এ বাড়িতে যিনি শখ করে থাকতে পারেন তিনি আর যাই হোন সাধারণ মানুষ নন।
তখন বিকেল চারটে। এরই মধ্যে জায়গাটা যেন রহস্যময় অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে গেছে।
দরজায় কড়া নাড়তেই স্বামীজি দরজা খুলে সামনে এসে দাঁড়ালেন।
লম্বা, ফর্সা চেহারা। শক্ত শরীর। বড়ো বড়ো সুন্দর চোখ। ন্যাড়া মাথা। গায়ে গেরুয়া ফতুয়া, পরনে গেরুয়া রঙে ছোবানো ধুতি লুঙ্গির মতো করে পরা। গলায় রুদ্রাক্ষের মালা। পায়ে কাঠের খড়ম।
এক নজর ঘরটা দেখে নিলাম। দেওয়ালের কোলঙ্গায় পর্দার মতো লাল সালুর আড়ালে তাঁর ছোট্ট ইষ্ট দেবতা। সে দেবতা কে দূর থেকে তা বোঝা গেল না। সামনেই ঘণ্টা, শাঁখ। ওদিকের দেওয়ালের কোণে মস্ত একটা ঝকঝকে ত্রিশূল। দেখে ভয় হয়। ঐ ত্রিশূল দিয়ে স্বচ্ছন্দে মানুষ মারা যায়।
স্বামীজিকে বিনম্র নমস্কার করলাম। তিনিও গম্ভীরভাবে প্রতি-নমস্কার করলেন। আমায় দেখে এতটুকু অবাক হলেন না।
গুরুগম্ভীর স্বরে আসুন বলে তিনি আমায় ঘরে নিয়ে এসে আসন পেতে বসতে দিলেন।
দেখলাম এ ঘরে তেমন কোনো আসবাবপত্র নেই শোবার চৌকিটি ছাড়া।
–তা হলে আপনিই শেষ পর্যন্ত আমার কাছে এলেন।
আমি অবাক হয়ে বললাম, আমাকে এর আগে দেখেছেন নাকি?
উনি একটু হাসলেন। বললেন, সবাইকেই দেখি, সবাইকেই চিনি। কে কি বলে তাও জানি। আপনার নাম তো অনিমেষ চৌধুরী?
–আজ্ঞে হ্যাঁ।
কলকাতা থেকে আসছেন? রিটায়ার্ড প্রফেসার?
আমি তো স্তম্ভিত।
উনি একটু হেসে বললেন, অবাক হবার কিছু নেই। আমি ঘর থেকে কম বেরোলেও মোটামুটি পাড়ার খবর রাখি।
একটু থেমে বললেন, আপনি জানতে এসেছেন সত্যিই এখানে ভূত আছে কিনা। তাই তো?
আমতা-আমতা করে বললাম, লোকে নানা কথা বলে। তাই
–ভালোই করেছেন। আড়ালে গুজগুজ-ফুসফুস না করে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করাই উচিত। আপনার ভদ্রতা, আপনার সৎসাহসের প্রশংসা করি। দাঁড়ান, আসছি।
বলে তিনি ভেতরে উঠে গেলেন।
একটু পরে একটা সাদা পাথরের গেলাসে বেলের সরবৎ নিয়ে এলেন।
–আমার এখানে চায়ের পাট নেই। সামান্য একটু
বলে গেলাসটা আমার সামনে রাখলেন।
সরবৎ খাওয়া হলে তিনি বললেন, তাহলে আপনি আমার কথা সত্যিই শুনতে চান?
যদি অনুগ্রহ করে বলেন, তাহলে কৌতূহল মেটে।
–অবশ্যই বলব। তবে একটা শর্ত
বলুন।
যে কথা বলব তা এখানে কারো কাছে গল্প করবেন না। কথা দিন।
দিলাম।
তারপর উনি শুরু করলেন ওঁর কথা। প্রথমেই বললেন, আমি বরাবরই যে সাধুজীবন যাপন করছি তা নয়। আমিও একদিন ঘোর সংসারী ছিলাম। তারপর শোকে-তাপে বিপর্যস্ত হয়ে সব ছেড়ে দেশে দেশে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম।
