এমনি সময়ে কে যেন সন্তর্পণে ঢুকল।
আঃ বাঁচলাম। তবু একজন জীবন্ত মানুষ।
কিন্তু ওকে ডাকব কী করে? আমি তো কথা বলতে পারছি না।
না, লোকটা আমার দিকেই এগিয়ে আসছে। খুব যেন চেনা মনে হচ্ছে।…একটু একটু করে চিনতে পারলাম। এঁকে অনেক বার ম্যাকলার্ন সাহেবের বাড়িতে দেখেছি। চৌধুরী সাহেব। হাসপাতালের হেড কম্পাউন্ডার।
তিনি কাছে এসে দাঁড়ালেন। কিন্তু হাতে ওটা কী? ইনজেকশানের সিরিঞ্জ? কেন? ইজেকশান দেবেন?
চৌধুরী সাহেব কাছে এসে দাঁড়ালেন। বাঁধন খুলে আমার বাঁ হাতটা তুলে নিলেন। আমি যথাসম্ভব করুণ চোখে তার দিকে তাকালাম। যেন বলতে চাইলাম–Please push slowly. দয়া করে আস্তে আস্তে দেবেন।
কিন্তু উনি যখন আমার হাতে উঁচটা ফোঁটাচ্ছেন তখন তার চোখের দিকে তাকিয়ে ভয় পেয়ে গেলাম। কী ভয়ঙ্কর সে দৃষ্টি!
বুঝতে পারলাম না উনি অমন করে আমাকে দেখছেন কেন?
সঙ্গে সঙ্গেই উঁচটা বিঁধিয়ে দিলেন। আর পা থেকে ঘাড় পর্যন্ত সমস্ত শিরাগুলো ঝনঝন করে উঠল।
তা-র-পর
তারপরের কথা আমি জানি না। পরে লোকমুখে যা শুনেছি তাই লিখছি।
তখন সবে সূর্য উঠবে উঠবে করছে–ইস্কুলের দারোয়ান দেখল প্রেসিডেন্টবাবু লাঠি হাতে ম্যাসাহেবের বাড়ির দিকে যাচ্ছেন। এত ভোরে প্রেসিডেন্টবাবু বেরোন না। নিশ্চয় কোনো জরুরি দরকারে যাচ্ছেন বলে দারোয়ানও এগিয়ে গেল।
দারোয়ান দেখল যে ঘরে কলকাতার বাবুটি শুয়েছিল চৌধুরী সাহেব সেই ঘরের দরজায় কড়া নাড়ছেন আর বলছেন–আর কত ঘুমোবেন মশাই? উঠুন। চা নিয়ে আসছে।
দারোয়ান দূরে দাঁড়িয়ে দরজা খোলার শব্দ শুনল। তারপরেই কী হলো হঠাৎ চৌধুরী সাহেব ভয়ে চিৎকার করে উঠলেন–ডোডো–ডোডো–
বলেই তিনি যেন প্রাণভয়ে ছুটতে লাগলেন।
দারোয়ান তো অবাক। চৌধুরী সাহেব ঘরের মধ্যে এমন কী দেখলেন যাতে এত ভয় পেয়ে গেলেন? ডোডোই বা কী জিনিস? আর বুড়ো মানুষটি যেভাবে ছুটছেন–
ভাবতে ভাবতে দারোয়ান দেখল চৌধুরী সাহেবের হাত থেকে লাঠিটা ছিটকে পড়ে গেল। কিন্তু তবু চৌধুরী সাহেব বাড়ির দিকে ছুটছেন। তার সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে– চোখ-মুখ লাল।
–বাবু, দাঁড়ান বাবু, দাঁড়ান… বলতে বলতে দারোয়ান ছুটে গেল ওঁর কাছে। সেই সময়ে চৌধুরী সাহেবের একপাটি চটি খুলে গেল। আর তিনি হুমড়ি খেয়ে পড়লেন রাস্তার ওপর।
সেই যে পড়লেন আর উঠলেন না।
ততক্ষণে ভিড় জমে গেছে। চৌধুরী সাহেবের বডিটা তার বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে ওরা এসে দাঁড়াল ম্যাসাহেবের বাড়িতে। এমন কী দেখে চৌধুরী সাহেবের মতো সাহসী পুরুষ ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন?
না, ঘরের মধ্যে ভয় পাবার মতো কিছুই ছিল না। আমি যেমন ঘুমোচ্ছিলাম তেমনই ঘুমোচ্ছি।
ওরা খুব আশ্চর্য হলো। প্রথমত, দরজা খুলে দিল কে? দ্বিতীয়ত, আমাকে দেখে ভয় পাবার কী ছিল? তৃতীয়ত, কি ডোডো বলে যদি কারো প্রেতাত্মাকে তিনি দেখেই থাকেন তাহলে হঠাৎ আজ কেন? এ বাড়িতে তিনি তো এর আগে অনেকবারই একা একা এসেছেন।
এসব রহস্যের কোনো মীমাংসা আমিও করতে পারিনি। তবে চলে আসবার সময় ঐ ঘরের কোলঙ্গায় একটা জিনিস দেখে অবাক হয়েছিলাম। যখন ঘরে ঢুকেছিলাম যত দূর মনে আছে–কোলঙ্গায় ওটা ছিল না।
জিনিসটা আর কিছুই নয় একটা পুরনো ভাঙা ইনজেকশানের সিরিঞ্জ।
[শারদীয়া ১৩৯৪]
নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে
সেবার পুজোর সময়ে পুরী যাব বলে অনেক আগেই ট্রেনের রিজার্ভেশান করে রেখেছিলাম। কিন্তু পরে হোটেল বুক করতে গিয়ে কোথাও জায়গা পেলাম না। মহা মুশকিল!
তবু যেহেতু টিকিট কাটা হয়ে গেছে তাই জয় জগন্নাথ বলে হাওড়া থেকে জগন্নাথ এক্সপ্রেসে চেপে বসলাম। আশা–পুরীতে নেমে পাণ্ডাদের ধরে কোথাও-না-কোথাও একটা জায়গার ব্যবস্থা করে নিতে পারব।
পাণ্ডারা ব্যবস্থা করেছিল। কিন্তু সেসব জায়গা পছন্দ হলো না। আমি এখানে অন্তত এক মাস থাকব। জায়গাটা সমুদ্রের কাছে না হলেও চলবে। কিন্তু যাঁকা হওয়া চাই। এর আগে অনেক বারই পুরী এসেছি। সমুদ্রের ধারে অনেক হোটেলেই থেকেছি। কাজেই সব সময়ে সমুদ্র না দেখলেও চলবে। চাই একটু নতুনত্ব।
তা পুরীর এক পাণ্ডা আমার জন্যে একটা বাসা ঠিক করে দিল। বাসাটা পুরী টাউন থেকে কোনার্কের দিকে দু কিলোমিটার মতো দূরে।
জায়গাটা আমার বেশ পছন্দ হলো। যেরকমটি চেয়েছিলাম সেইরকম নিরিবিলি। সামনে দিয়ে কোনার্কে যাবার কংক্রিটের রাস্তা। মাঝে মাঝে কাজুবাদামের গাছ। বেশ কিছু বাংলো প্যাটার্নের বাড়িও আছে।
আমার বাসাটিও একতলা। দুখানি ঘর। ছিমছাম। সঙ্গে একটি কাজের লোক। সকালে-বিকেলে দু মাইল রাস্তা হেঁটে সমুদ্রের ধারে বেড়িয়ে আসি। হাতে থাকে ছড়ি আর টর্চ।
দিন সাতেকের মধ্যেই পাড়ার কয়েক জনের সঙ্গে আলাপ হয়ে গেল। সকলেই বাঙালী। একজন শুধু ওড়িয়া। তিনিও ভালো বাংলা বলতে আর বুঝতে পারেন। ভদ্রলোকের নাম মহেশ্বর মহাপাত্র। আমি কলকাতা থেকে আসছি আর একজন রিটায়ার্ড অধ্যাপক জেনে তিনি খুব খাতির করলেন। তাঁর বাড়িতেই রোজ সন্ধ্যেবেলা আড্ডা বসত। সকলেই বাঙালী প্রতিবেশী। সেখানে আমারও একটা চেয়ারের ব্যবস্থা হলো।
প্রতিদিনই নানারকমের আলোচনা হতো। মহাপাত্রমশাই-ই এখানকার পুরনো বাসিন্দা। বাঙালী প্রতিবেশী পেয়ে খুব খুশি। কিন্তু এমন এক-এক জন উটকো লোক পাড়ায় এসে পড়ে, তাদের তিনি মোটেই সুনজরে দেখেন না। যেমন–
