বাবাকে কিছু বলতে পারিনি। কিন্তু মাকে সব বলেছিলাম। ডোডো স্বচক্ষে চুরি করতে দেখেছিল। কিন্তু নাম বলবার আগেই ওকে থামতে হয়েছিল।
কিন্তু মাও সেদিন দশ বছরের ছেলের কথা বিশ্বাস করেনি। বলল, তাছাড়া, কেউ খুন করেছে বুঝতে পারলে সাহেব ছেড়ে দিত?
যুক্তি অবশ্য অকাট্য। তারপর আর ও নিয়ে ভাবিনি।
কিন্তু অনেক পরে কলকাতার কর্মজীবনের মাঝে মাঝে যখন ডোডোর কথা মনে হতো তখনই ভাবতাম–সত্যিই কি ওর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছিল? না কি খুন করা হয়েছিল?
হ্যাঁ, সাহেবের বাড়ির কেস। খুন সন্দেহ হলে সহজে ছেড়ে দিত না ঠিকই। কিন্তু মনে রাখতে হবে–ডোডো ওঁদের নিজেদের কেউ ছিল না। সেজন্যে হয়তো যতটা তলিয়ে দেখা উচিত ছিল ততটা দেখেননি।
.
প্রায় চল্লিশ বছর পর আবার একদিন দেশে আসার সুযোগ হলো। সাহেবরা এখন আর নেই। তবে জায়গাটার নাম মিশন এখনও আছে। এখানে একটা ইস্কুল হয়েছে। সেই ইস্কুলে রবীন্দ্র জন্মোৎসব। আমায় সভাপতি হতে হয়েছে।
আমি যেতেই যিনি আমায় সাদর অভ্যর্থনা জানাতে এগিয়ে এলেন তার বয়স প্রায় আশি। সাদা ধবধবে চুল, চোখে পুরু লেন্সের চশমা। ইনি সেই চৌধুরী সাহেব যিনি হাসপাতালের হেড কম্পাউন্ডার ছিলেন। বর্তমানে তিনি এই স্কুলের প্রেসিডেন্ট। পুরনোদের মধ্যে সেই ক্লার্কবাবুটিও বেঁচে আছেন। তবে দুঃখের কথা তার ছেলেটি তাকে অবশ্য চিনতাম না–একটা খুনের মামলায় জেল খাটছে।
খুনের কথা শুনেই মনটা আমার ছ্যাৎ করে উঠল। ডোডোর কথা মনে পড়ে গেল। সে যাকে চুরি করতে দেখেছিল তার নামটা প্রকাশ করে যেতে পারেনি। তার আগেই মরতে হয়েছিল। সে কি তবে ঐ ক্লার্কবাবুরই কাজ? নইলে তার ছেলে খুনী হয় কী করে?
সভা শেষ হতে রাত হয়ে গেল। খাওয়াদাওয়া করে যখন শুতে গেলাম রাত তখন দশটা বাজে।
আমার শোবার ব্যবস্থা হয়েছিল ম্যকলার্ন সাহেবের বাড়িতেই। বাড়িটা যদিও পুরনো তবু এই একটা ঘরই মোটামুটি ভালো ছিল। জানালা বা দরজায় কোনো খিল ছিল না, তবে দরজায় লোহার ছিটকিনিটা টিকে ছিল কোনোরকমে। যাক, তাই যথেষ্ট। বাড়িতে ইলেকট্রিকের কোনো ব্যাপার ছিল না। তবে উদ্যোক্তারা একটা লণ্ঠন দিয়ে গিয়েছিল। দরজায় ছিটকিনি এঁটে লণ্ঠনে তেল কতটা আছে দেখছি, কে যেন দরজায় শব্দ করল–ঠুকঠুক
বুকটা কেন কে জানে ধড়াস করে উঠল।
–কে?
–শুয়ে পড়লেন নাকি?
–না। যাই।
বলে উঠে দরজা খুলে দিলাম।
দেখি চৌধুরী সাহেব এক হাতে টর্চ অন্য হাতে লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে।
–আপনি আবার এত রাতে?
উনি হাসলেন। বাঁধানো দাঁতগুলো ঝকঝক করে উঠল।
–না, দেখতে এলাম কোনো অসুবিধে হচ্ছে কিনা। বুঝতেই পারছেন প্রেসিডেন্টের অনেক দায়িত্ব।
–না না কিছুমাত্র অসুবিধে নেই।
–বেশ। খুশি হলাম। বৃদ্ধ চৌধুরী সাহেব আবার একটু হাসলেন।
–ভয়টয় পাবেন না তো?
আমি হেসে বললাম, কিসের ভয়?
–এই আর কি–পুরনো বাড়ি তো!
-না চৌধুরী সাহেব, ভূতের ভয় আমি পাই না। তাছাড়া এ বাড়ি আমার চেনা। তবে যদি ডোডোর প্রেতাত্মা দেখা দেয়।
এতকাল পরে ডোডোর কথা শুনে বৃদ্ধর মুখটা কিরকম হয়ে গেল। ঢোক গিলে বললেন, ডোডোকে মনে আছে?
-নিশ্চয়। ওকে কি ভুলতে পারি? ঐ লম্বা ঘরটার একেবারে শেষ দিকের বেডে ও মারা গিয়েছিল না?
-হ্যাঁ। বলেই বৃদ্ধ পিছু ফিরলেন। তারপর টর্চের আলো ফেলতে ফেলতে রাস্তায় গিয়ে নামলেন। অনেকক্ষণ পর্যন্ত তাঁর লাঠির শব্দ শুনতে পেলাম–ঠকঠকঠক্।
ঘুম আসছিল না। কেবলই ডোডোর কথা মনে হচ্ছিল। তার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছিল, না তাকে খুন করা হয়েছিল? খুন করলে কে খুন করল? এ রহস্য তাহলে চিরদিনই অমীমাংসিত থেকে গেল। ভাবতে ভাবতে এক সময়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
তখন কত রাত জানি না। হঠাৎ মনে হলো ঘরের মধ্যে যেন একটা পাখি ক্রমাগত পাখা ঝাঁপটাচ্ছে। সেই শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো মাথাটা বেজায় ঘুরছে। শুধু মাথা ঘোরাই নয়, সেই সঙ্গে গলার মধ্যে অসহ্য যন্ত্রণা। আমি ঢোক পর্যন্ত গিলতে পারছি না। মনে হচ্ছিল কেউ যেন ছুরি দিয়ে গলাটার আধখানা কেটে দিয়েছে।
আমি ভয়ানক ভয় পেলাম। এ আমার কি হলো! শুধু তাই নয়, আমার মুখ দিয়ে অনর্গল লালা পড়ে জামা ভিজিয়ে দিচ্ছে। হাত দিয়ে মুছতে গেলাম। কিন্তু হাত তুলতে পারলাম না। দু হাত লোহার খাটের সঙ্গে বাঁধা। শুধু হাত নয় সমস্ত চাদর ঢাকা শরীরটাই বাঁধা।
আমি আবার চমকে উঠলাম। মনে করতে চেষ্টা করলাম–এ অবস্থা কখন আমার হলো? কে করল?
কোনোরকমে চোখ মেলে তাকালাম। অল্প অল্প আলো। লক্ষ্য পড়ল দেওয়ালের দিকে। একেবারে সামনের দেওয়ালে গির্জার মতো একটা ঘড়ি। এমন ঘড়ি আমি কখনও দেখিনি। ঘড়িতে তখন কঁটায় কাঁটায় রাত দুটো।
চোখ সরে গেল পাশের দেওয়ালে। সেখানে ঝুলছে পঞ্চম জর্জের ছবি। এ ছবি– এ ছবি যেন ছোটোবেলায় কোথায় দেখেছি।
কোনোরকমে ঘাড়টা একটু কাত করলাম। কিন্তু ওরা কারা? ঐ যে একটু দূরে সার সার লোহার খাটে নিঃসাড়ে শুয়ে? সব যেন মৃত।
তবে কি হাসপাতালে রয়েছি?
আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। নিরুপায় হয়ে এদিক-ওদিক দেখতে চেষ্টা করলাম। ভালো করে দেখতে পাচ্ছি না। সব যেন ঝাপসা। না, কেউ নেই। না কোনো ডাক্তার, না কোনো নার্স।
..একটু জল খাওয়ার দরকার…নিদেন এক টুকরো বরফ। জিব শুকিয়ে যাচ্ছে।
