এই বাড়িতেই ডোডোর সঙ্গে আমার ভাব হয়। আমারই বয়সী ডোডো। সাহেব-বাচ্চা। সাদা ধবধবে রঙ। কেঁকড়ানো কটা চুল। চোখের মণি নীলচে। ভারি সুন্দর দেখতে। কিন্তু তাকে সবসময়ই কেমন যেন বিষণ্ণ মনে হতো।
পরে জেনেছিলাম–ডোডো ম্যাকলার্নদের নিজের কেউ নয়। ওঁদের কোনো আত্মীয়ের ছেলে। মা-বাপ মরে গিয়েছিল বলে ওকে এঁরা পালন করতেন।
ডোডোর সঙ্গে আমার এমন ভাব হয়ে গিয়েছিল যে প্রায়ই ওর কাছে যেতে ইচ্ছে করত। কিন্তু তখন আমি ছেলেমানুষ। একা যেতে পারতাম না। মা-বাবা যখন যেত শুধু তখনই ওর সঙ্গে দেখা হতো।
একদিন ওঁদের বাড়ি গিয়েছি। তখন সন্ধ্যে হয় হয়।
–গুড ইভনিং ডক্টর ম্যাকলার্ন! বলে বাবা হাসতে হাসতে আমাদের নিয়ে ড্রয়িংরুমে ঢুকলেন। ম্যাকলার্ন সাহেবও তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে গুড ইভনিং বলে আমাদের অভ্যর্থনা করলেন।
কিন্তু সেদিন ম্যাকলার্ন সাহেব কী একটা ব্যাপার নিয়ে হাসপাতালের হেড কম্পাউন্ডার চৌধুরী সাহেব আর অন্য কম্পাউন্ডারের সঙ্গে খুব বিরক্ত হয়ে কথা বলছিলেন।
আমরা গিয়ে পড়তে ম্যাকলার্ন সাহেব ওঁদের সরিয়ে দিয়ে বাবার সঙ্গে গল্প করতে লাগলেন।
ওঁরা বহুদিন বাংলাদেশে থাকতে থাকতে বাংলা কথা বুঝতে পারতেন। ভাঙা ভাঙা বাংলাতে কথাও বলতে পারতেন।
যাই হোক আমি ডোডোকে খুঁজছিলাম। বিরাট কম্পাউন্ডওলা বাড়ি। অনেক ঘর। তার সঙ্গে টানা হাসপাতাল। ও যে কোথায় আছেখুঁজতে খুঁজতে বাগানের ধারে ছোটো ঘরটায় ওকে পেলাম। দেখি এই গরমেও ডোডো গলায় মাফলার জড়িয়ে চুপচাপ বসে আছে।
আমায় দেখে ও তো খুব খুশি। কিন্তু আমি খুশি হতে পারলাম না। জিজ্ঞেস করলাম– তোমার কি অসুখ করেছে?
ও বলল, হ্যাঁ। টনসিল সেপটিক হয়ে গেছে। অপারেশান হবে।
যদিও তখন শুনতাম টনসিল কাটানো খুব বিপজ্জনক ব্যাপার, তবু বন্ধুকে সাহস দিয়ে বললাম, ভয় কী? বাড়িতে বড় বড় ডাক্তার
ডোডো ম্লান হেসে বলল, না, অপারেশনের জন্যে চিন্তা করছি না।
–তবে? এমন চুপচাপ বসে?
ও হঠাৎ আমায় থামিয়ে দিয়ে কিছু একটা শোনার জন্যে কান পাতল।
ড্রয়িংরুমে তখন বাবার সঙ্গে ম্যাকলার্ন সাহেবের কথা হচ্ছিল। সাহেব বেশ উত্তেজিত হয়ে বলছিলেন–হাসপাতাল থেকে প্রায়ই যদি এত দামী দামী ওষুধ চুরি যায় তাহলে আমার স্টেপ নেওয়া উচিত বলুন।
বাবা বললেন, আপনি কাউকে সন্দেহ করেন?।
–সন্দেহ! না, এরা সবাই পুরনো লোক। শুধু শুধু কী করে সন্দেহ করি বলুন।
ডোডো আমার দিকে ফিরে হাতটা ধরে বলল, অপারেশনের জন্যে নয়, মনটা আমার খুব খারাপ হয়ে আছে বন্ধু।
–কেন?
ডোডো তখনই কিছু বলল না। কী যেন ভাবতে লাগল। একটু পরে বলল, কারো নামে লাগাতে নেই। ক্রাইস্ট তাতে দুঃখ পান। তবু আমার মনে হয়–যে দুষ্ট লোক– যে পরের ক্ষতি করে–যে চোর তাকে ধরিয়ে দিলে অন্যায় হবে না। ক্রাইস্ট নিশ্চয় আমায় ক্ষমা করবেন। তুমি কী বল?
বললাম–নিশ্চয়। কিন্তু….কিন্তু তুমি কার কথা বলছ?
ও তখন খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়ে আমার হাতটা ধরে বলল–ঐ যে শুনলে আংকেল ওষুধ চুরির কথা বলছিলেন। রোজ রোজ চুরি। চুরি করে সেই ওষুধ বাজারে বিক্রি করে দেয়।
–কে? বোকার মতো জিজ্ঞেস করলাম।
ডোডো বললে, চোর যে কে আংকল তো ধরতে পারছেন না। সন্দেহ করছে কম্পাউন্ডারকেই। কিন্তু কম্পাউন্ডার তো অনেক জনই–মিস্টার চৌধুরী, মিস্টার মণ্ডল, মিস্টার বিশ্বাস, মিস্টার ই
ডোডো একটু থামল। তারপর বলল, তাছাড়া এখানকার যে হেড ক্লার্ক তাকেও আংকেলের সন্দেহ। কিন্তু, বন্ধু আমি জানি কে চোর। বলে উত্তেজনায় আমার হাতটা চেপে ধরল।
–তুমি জান?
–হ্যাঁ।
–তো আংকেলকে বলছ না কেন?
–কী করে বলব তাই ভাবছি, আর মনে মনে দুঃখ পাচ্ছি। সে মানুষটা খুবই পুরনো, আমাদের সকলেরই নিজের লোকের মতো। আমি তাকে খুবই শ্রদ্ধা করতাম।
–তুমি ঠিক জান, সেই চুরি করেছে?
–Yes! খুব জোর দিয়ে কথাটা বলতে গিয়ে ও কেশে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে গলার ব্যথায় কাতর হয়ে পড়ল।
একটু সামলে নিয়ে বলল, আজই দুপুর বেলা–একা একা হাসপাতালে ঘুরছি। ঘুরতে ঘুরতে ওষুধের ঘরের কাছে যেই এসেছি অমনি জানালার ফাঁক দিয়ে দেখি–
কথা শেষ হলো না। হঠাৎ ডোডো চমকে উঠল–Who is there? কে ওখানে?
সঙ্গে সঙ্গে বাগানের দিকের জানলার পাশ থেকে কেউ চট করে সরে গেল।
আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। ভয়ে ভয়ে বললাম–চোর?
ডোডো বলল, বোধহয়। আমাদের কথা শোনার চেষ্টা করছিল।
একটু ভেবে বলল, চলো, ভেতরে গিয়েই বসি।
.
এর দুদিন পরে ডোডোর টনসিল অপারেশান হলো। অপারেশান সফল হয়েছে। আমি তো মা-বাবাকে নিয়ে সেইদিনই বিকেলে ডোডোকে দেখতে গেলাম।
ডোডোর জ্ঞান ফিরেছে। ওর সর্বাঙ্গ চাদর দিয়ে ঢাকা। ডোডো শুধু একবার তাকাল। সে চাউনি দেখে বুঝলাম ও চিনতে পেরেছে। কিন্তু কষ্ট লাগল যখন দেখলাম ওর হাত পা লোহার খাটের সঙ্গে বাঁধা। নার্স বলল, ও ভালোই আছে।
পরের দিন বেলা তখন দশটা। ইস্কুল যাবার জন্যে রেডি হচ্ছি, বাবা শুকনো মুখে এসে দাঁড়ালেন। আমাকে আর মাকে একসঙ্গেই দুঃসংবাদটা দিলেন–ডোডো কাল গভীর রাত্তিরে মারা গেছে।
আজ এতকাল পরেও মনে আছে, আমি চিৎকার করে বলেছিলাম–মারা যায়নি। ওকে মেরে ফেলা হয়েছে।
বাবা আমাকে ধমকে উঠেছিলেন। বলেছিলেন–পাগল নাকি? অত বড়ো হাসপাতাল। ম্যাকলার্ন সাহেবের বাড়ির লোক। মেরে ফেললেই হলো! আর কেনই বা মারবে?
