তারপরেই শুনতে পেলাম সেই শব্দ খট-খট-খট—
জল্লাদ এগিয়ে আসছে আমাকে মারার জন্যে।
শব্দটা আগের মতোই আমাদের বাড়ির কাছে এসে থেমে গেল। আর তখনই কোথাও কিছু নেই আকাশটা ঘন মেঘে ছেয়ে গেল। কয়েকবার চোখ ধাঁধানো বিদ্যুৎ চমকানি। তারপরেই উঠল প্রচণ্ড ঝড়। সঙ্গে সঙ্গে আমার স্ত্রী চেঁচিয়ে উঠলেন, আবার এসেছে
ছুটে গেলাম পাশের ঘরে। সেই একই দৃশ্য, তবে আরও ভয়ংকর। চোখ দুটো ধক ধক করে জ্বলছে–মুখে ঘোঁৎ ঘোঁৎ শব্দ। আজ যেন সে ঘরে ঢুকবেই।
আশ্চর্য এই ঝড়েও সে কাবু নয়।
এদিকে ঝড়ের দাপট ক্রমশই বাড়ছে। জানলা-দরজার শার্সিগুলো ঝনঝন করে উঠছে। প্রণবেশ চেঁচিয়ে উঠল, শীগগির টেবিল-চেয়ারগুলো দরজার কাছে নিয়ে এসো।
দরজাটা ঝড়ের ধাক্কায় তখন কঁপছে। আমরা টেবিল-চেয়ার-আলনা যা পেলাম সব নিয়ে এসে দরজার গায়ে ঠেসে দিলাম। ওদিকে জানলাগুলোরও একই অবস্থা। সেখানেও ডেস্ক, ট্রাঙ্ক যেখানে যা ছিল এনে চেপে ধরলাম। তার পরেই শুরু হলো ছাদের ওপর দাপাদাপি।
প্রণবেশ ছুটে গেল ফোন করতে। কিন্তু হায় কপাল! লাইন ডেড।
ক্রমে রাত পুইয়ে গেল। ঝড় থেমে গেল। যাক আজও বেঁচে গেলাম। প্রণবেশ আবার ফোন করার চেষ্টা করল। লাইন বেঁচে উঠেছে। লালবাজার জানাল এখুনি ফোর্স যাচ্ছে।
প্রণবেশকে বললাম, এখন আর এসে কী হবে?
.
ভোর পাঁচটা।
লালবাজারের দুজন বড়োকর্তাকে নিয়ে আমরা আলোচনায় বসেছি। এভাবে তো দিনের পর দিন পারা যায় না। কিন্তু উপায় কি?
হঠাৎ আমার একটা কথা মনে হলো। বললাম, আমরা গ্রামেও দেখেছি কংকালটাকে চালনা করে নেপালের সেই তান্ত্রিক। তার কাজ অনেকটা remote control-এর মতো। সুদূর হরিদেবপুরে নেপাল থেকে সে চলে এসেছিল। একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে সে কংকালটাকে জীবন্ত করে ছেড়ে দেয়। কাজেই সেই তান্ত্রিক কলকাতাতেও যে এসেছে তাতে সন্দেহ নেই। আর সে আছে। আমাদের খুব কাছেই।
প্রণবেশ চমকে উঠে বলল, তুমি তো দারুণ পয়েন্ট বলেছ।
মনে করে দ্যাখো প্রণবেশ, গত রাত্রে মোটা গলায় সেই সংস্কৃত মন্ত্র উচ্চারণ–গচ্ছ–গচ্ছ–সংহার।
এ সেই তান্ত্রিকেরই কাজ এ বিষয়ে আমি নিঃসন্দেহ।
প্রণবেশ বলল, কিন্তু তাকে খুঁজে পাব কোথায়?
বললাম, মাঠে পথে সে বসে থাকবে না। নিশ্চয় কারো বাড়িতে আস্তানা গেড়েছে। এই সেক্টরের প্রত্যেক বাড়ি খোঁজ করলে এখনও তাকে পাওয়া যাবে।
প্রণবেশ তখনই পুলিশ কর্তাদের নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। বেশি খুঁজতে হলো না। উমেশ সান্যালের বাড়ির কাছে আসতেই ঘিয়ের গন্ধ পাওয়া গেল। যেন কেউ হোম করেছে। পুলিশ ঢুকে পড়ল। উমেশবাবু ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, হ্যাঁ, একজন বড়ো সাধুকে তিনদিন হলো তাঁর বাড়িতে নিয়ে এসেছেন। ঠিক ছিল আজ তার সঙ্গে বেনারসে মহাযোগে যাবেন। কিন্তু
কিন্তু কি? কোথায় সেই সাধু?
ভোরবেলা উঠে তাকে আর দেখতে পাচ্ছি না।
প্রণবেশ বললে, তা হলে সে নিশ্চয় পালিয়েছে।
তখনই সব থানায় ফোন করে দেওয়া হলো–পথে, স্টেশনে, গঙ্গার ঘাটে কোনো সাধুকে একলা দেখলেই তাকে যেন ধরা হয়।
.
বেলা দশটা।
তান্ত্রিক ধরা পড়েনি। হয়তো সে ট্রেনে চড়ে নেপালের উদ্দেশে পাড়ি দিয়েছে। অথবা অন্য সাধুদের দলে মিশে কাশী চলে গিয়েছে।
গত রাতের ঝড়ে একটা লাইট-পোস্টের তার ছিঁড়ে গিয়েছিল। ইলেকট্রিক মিস্ত্রিদের একজন পোস্টে উঠে সারাচ্ছিল। হঠাৎ আমাদের বাড়ির ছাদের দিকে চোখ পড়তেই চমকে উঠল। আরে! ওটা কি?
ছাদে উঠে দেখা গেল–একটা ছোটোখাটো কংকাল পড়ে আছে। এটা যে নেপালে সেই তান্ত্রিকের গুহায় আমরা দেখেছিলাম সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
তান্ত্রিক অনেক দূরে চলে গেছে। রিমোট কন্ট্রোল আর চলবে না। এখন এটা শুধুই কংকাল। এটাকে নিয়ে কি হবে?
পুলিশ বলল, দায়িত্ব আমাদের। ওটাকে শ্মশানে নিয়ে গিয়ে পুড়িয়ে দেওয়াই ভালো।
তাই হলো। আমাদের উপস্থিতিতে কংকালটাকে পুড়িয়ে তার ভস্ম গঙ্গার জলে ভাসিয়ে দেওয়া হলো। আশা করা যায় এতকাল পর তার গতি হবে। তান্ত্রিকও আর রিমোট কন্ট্রোল থেকে কংকালকে চালনা করে কারো ক্ষতি করতে পারবে না।
ডোডো
জীবনে সেদিন যে অদ্ভুত রোমাঞ্চকর ঘটনাটা ঘটে গেল সেটা কিছুতেই আর ভুলতে পারছি না। কেবলই মনে হচ্ছে–এ কি কখনো সম্ভব? ডোডো কি এখনও আমাকে মনে রেখেছে?
আবার তখনই মনে হয়েছে–মনে না রাখবেই বা কেন? আমিই কি ভুলতে পেরেছি?
তখন আমি ইস্কুলে পড়ি। মফস্বল শহর। আমাদের বাড়ি থেকে মাইলখানেক দূরে মিশনারি সাহেবদের বেশ বড়ো একটা হাসপাতাল ছিল। খাস ইউরোপীয়ান সাহেব ডাক্তাররা সপরিবারে সেখানে থাকত। ঐ সাহেবপল্লীটাকে এখানকার লোকে বলত মিশন। কারো বড় রকমের অসুখ করলে লোকে বলত–মিশন হাসপাতালে নিয়ে যাও। সেরে উঠবেই।
আমার বাবা ছিলেন নামকরা ডাক্তার। সেই সূত্রে হাসপাতালের সাহেব ডাক্তারদের সঙ্গে বেশ খাতির ছিল। তারা প্রায়ই বড়দিনে, ইংরিজি নববর্ষে, ছেলেমেয়েদের জন্মদিনে আমাদের নেমন্তন্ন করতেন। বাবা-মার সঙ্গে আমিও ঘোড়ার গাড়ি চেপে সাহেবদের বাড়ি নেমন্তন্ন খেতে যেতাম। ওঁদের মধ্যে বাবার বেশি বন্ধুত্ব ছিল ম্যাকলার্ন সাহেবের সঙ্গে। মেমসাহেবও ছিলেন খুব মিশুকে। তিনি চাইতেন আমরা যেন প্রায়ই ওঁদের বাড়ি বেড়াতে যাই। সেইজন্যে বিশেষ বিশেষ দিন ছাড়াও আমরা ম্যাকলার্ন সাহেবের বাড়ি যেতাম।
