সেই মুহূর্তে আমি কি করব ভেবে পেলাম না। দেখলাম ক্ষীণ কংকালসার দেহটা জানলাটা খোলবার চেষ্টা করছে। কিন্তু কাচের শার্সি কিছুতেই ছুঁতে পারছে না।
আমি হঠাৎ লাফিয়ে হুংকার দিয়ে জানলার দিকে ছুটে গেলাম। সঙ্গে সঙ্গে মূর্তিটা অদৃশ্য হয়ে গেল।
এবার আমি আলো জ্বেলে পাশের ঘরে গেলাম। দেখি মশারির মধ্যে আমার স্ত্রী নোটনকে বুকে আঁকড়ে ধরে গোঙাচ্ছেন। আমাকে দেখে সাহসে ভর করে বিছানায় উঠে বসলেন। কোনোরকমে বললেন, সুব্বা ওঁদের জানলার কাছেও এসে দাঁড়িয়ে ছিল।
.
ভোরবেলায় ফোন পেয়েই প্রণবেশ জিপ নিয়ে চলে এল। সব কথা শুনে ওর মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। তখনই দার্জিলিঙে ফোন করল। কিন্তু অম্বুজ লাহিড়িকে পাওয়া গেল না। তিনি দার্জিলিঙের বাইরে কোথায় গেছেন কয়েক দিনের জন্যে।
প্রণবেশ বলল, ঘাবড়িও না। রাত্রে আমিও এখানে থাকব।
শুনে বাঁচলাম। বিপদের সময়ে সঙ্গে একজন সাহসী সঙ্গী থাকা দরকার। দরকার পরামর্শ করবার।
সন্ধের আগেই প্রণবেশ চলে এল। সঙ্গে কিছু ওষুধ-পত্তর এনেছে। বলা যায় না রাত্তিরে যদি কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ে তখন কাজে লাগবে। কোনোরকমেই দরজা খুলে বাইরে বেরোনো তো চলবে না।
রাত দশটার মধ্যে খেয়ে-দেয়ে শুয়ে পড়া গেল। যে প্রণবেশ এত ফুর্তিবাজ–এত গল্প করে সেইই আজ যেন বোবা হয়ে গেছে। সব সময়েই কি যেন চিন্তা করছে।
ও আর আমি এক বিছানায় শুয়েছি।
কোনো বাড়ির দেওয়ালঘড়িতে ঠং-ঠং করে দুটো বাজল। সেই শব্দটুকু থেমে যেতে-না-যেতেই নিস্তব্ধ রাস্তায় কোথায় যেন শব্দ হলো খট-খট-খট
প্রণবেশকে ঠেলা দিতেই ও গম্ভীর গলায় বলল, শুনছি।
ক্রমে শব্দটা আগের দিনের মতোই বাড়ির কাছে এসে থামল। কিন্তু আজ আরও একটা অস্পষ্ট শব্দ কানে আসছিল। মানুষের গলা। কোনো বয়স্ক লোক যেন পড়া মুখস্থ করছে। এত রাত্রে কে কোথায় কী পড়ছে ভেবে ওঠার আগেই পাশের ঘর থেকে নোটনের মা চিৎকার করে উঠলেন, সঙ্গে সঙ্গে আমরা দুজনে ছুটে গেলাম ওদের ঘরে। আমাদের দেখেই আমার স্ত্রী আঙুল তুলে জানলাটা দেখিয়ে উত্তেজিত গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন, ঐ-ঐ– ঐদিকে।
সেই নিষ্প্রাণ কালো মুখটাকে মুহূর্তের জন্যে দেখলাম সরে যেতে। তারপর আমার স্ত্রী যা বললেন তা এই
একটা কেমন ঘোঁৎ ঘোঁৎ আওয়াজে ঘুম ভাঙতেই দেখেন মূর্তিটা বাইরে দাঁড়িয়ে জানলাটা ধরবার চেষ্টা করছে। কিন্তু পারছে না। যতই পারছে না ততই রাগে ঘোঁৎ ঘোঁৎ করছে। কিন্তু এ যেন হরিদেবপুরের সে রাজু নয়। তার চেয়ে ঢের ভয়ংকর ঢের বেশি হিংস্র।
আমরা ঠিক করলাম বাকি রাতটুকু মশার কামড় সহ্য করেও এ ঘরে বসে কাটিয়ে দেব। সেইমতো দুটো চেয়ার নিয়ে এসে গায়ে চাদর জড়িয়ে আমরা বসলাম।
প্রণবেশ সবে একটা সিগারেট ধরিয়েছে হঠাৎ মনে হলো বাড়িটা যেন কাঁপছে। তারপরেই ছাদের ওপর কে যেন ভারী পায়ে চলে বেড়াচ্ছে। এইরকম চলল ঘণ্টাখানেক। অথচ আমাদের কারুর কিছু করার নেই। বেরোনো চলবে না। ভোরের দিকে শব্দটা থেমে গেল।
সকালে ছাদে উঠে দেখলাম টবগুলো কে ভেঙেচুরে সারা ছাদে ছড়িয়ে রেখে গেছে।
চা খাবার পর আমরা আলোচনায় বসলাম। যে ভুলটা আমাদের হয়েছিল সেটা বললাম। লালবাজারে একটা ফোন করে দিলেই হতো। আমাদের না হয় ঘর থেকে বেরোবার উপায় ছিল না। কিন্তু পুলিশ তো ছাদে উঠতে পারত।
এটা যে মস্ত ভুল প্রণবেশও তা স্বীকার করল। সেই সঙ্গে আরও একটা ব্যাপার–ঐ সময়ে কাছাকাছি কোথাও কে পড়া মুখস্থ করছিল? না, তারও উত্তর তখনই খুঁজে পাওয়া গেল না।
.
০৯.
ভয়ংকর রাত
পরের দিন প্রণবেশ সোজা লালবাজারে গিয়ে গত দুদিনের ঘটনা জানিয়ে সন্ধের পর থেকে সারা রাত্তিরের জন্যে বাড়িতে পুলিশ পাহারা চাইল। লালবাজারের বড়োকর্তারা কিন্তু এবার খুব গুরুত্ব দিলেন না। তাদের বক্তব্য গত কয়েক দিন সারারাত পুলিশ সল্টলেকের সমস্ত রাস্তা টহল দিয়েছে। জীবন্ত কংকালের দর্শন পায়নি। হয় সবটাই এতদিন চোখের ভুল ছিল কিংবা সেটি অদৃশ্য হয়েছে।
প্রণবেশ সে কথা মানতে চায়নি। যাই হোক শেষ পর্যন্ত ঠিক হয়েছে ফের যদি রাত্তিরে ঐরকম হাঙ্গামা হয়, ফোন পেলেই সশস্ত্র পুলিশ-ভ্যান যাবে।
আজও সন্ধের আগেই প্রণবেশ চলে এল আমাদের বাড়ি। ও যেন বুঝেই নিয়েছে আমার ঘরে যতদিন না সুব্বা ঢুকতে পারছে ততদিন ও হাঙ্গামা চালিয়ে যাবে।
আজও রাত দশটার মধ্যে খাওয়া-দাওয়ার পর আমরা শুয়ে পড়লাম। নামেই শোওয়া–কারো চোখে ঘুম নেই।
রাত দুটো।
নিস্তব্ধ এ. জে. ব্লকের রাস্তাগুলো, দিনের বেলার ব্যস্ত কোলাহলমুখর বাস টার্মিনাসটা এখন শ্মশানের মতো পরিত্যক্ত। জনশূন্য রাস্তার বুকে লাইটপোস্টের আলোগুলো যেন পাহারা দিচ্ছে।
হঠাৎ কানে এল কাছেই কোনো বাড়িতে কোনো বয়স্ক মানুষ যেন চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কিছু পড়ছে। আজ যেন গলার স্বরটা গতকালের চেয়ে স্পষ্ট। কিন্তু কি পড়ছে ভালো করে বোঝা গেল না। তার পরেই দেখলাম রাস্তার আললাগুলো কাঁপছে। তারপরেই ধীরে ধীরে ভোল্টেজ ডাউন হয়ে এল। সেই সঙ্গে সেই গম্ভীর গলার পড়াটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।
না, বই পড়া নয়। রীতিমতো মন্ত্র উচ্চারণ।–গচ্ছ–গচ্ছ–সংহারো– গচ্ছ–গচ্ছ–সংহারো–
মানেটা পরিষ্কার। কেউ যেন কাউকে আদেশ করছে–যাও–যাও বিনাশ করো–মেরে ফেলল।
