যখন জ্ঞান ফিরল দেখি একজনদের বাড়ির সিঁড়ির ওপর বসে আছি।
দুচারজন ভদ্রলোক আমায় ঘিরে রয়েছেন। একজন বললেন, কেমন। আছেন এখন?
অস্ফুট স্বরে বললাম, আমার কি হয়েছিল?
বোধহয় মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলেন। আপনি কোথায় থাকেন?
আমি ঠিকানা বললাম। ওঁরা চমকে উঠলেন। বললেন, হেঁটে হেঁটে এত দূর এসেছিলেন!
তারা যখন আমায় সাইকেল রিকশা করে বাড়ি পৌঁছে দিলেন তখন সন্ধে হয়ে গিয়েছে। তাড়াতাড়ি বাড়ি ঢুকে দরজা-জানলা বন্ধ করে দিলাম।
সাবধানের মার নেই-তাই ভালো করে ঘরের কোণ, খাটের তলা দেখে নিলাম। কেউ ঘরে ঢুকে লুকিয়ে নেই তো?
সমস্ত বাড়িটা যেন থমথম করছে। নোটন পর্যন্ত যেন কেমন যোবা হয়ে গেছে। সে পরিষ্কারভাবে কিছু বুঝতে না পারলেও বোঝা যাচ্ছে ভয় পেয়েছে।
স্ত্রীর মুখে হাসি তো নেইই, কথাও নেই। রাত নটার সময়ে শুধু বললেন, আমার মনে হয় তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়া উচিত। অর্থাৎ শুয়ে পড়লেই যেন নিশ্চিন্ত।
তাই হলো। খাওয়া-দাওয়া সেরে যখন শুলাম তখন ঘড়িতে দশটা বেজেছে।
পাশের ঘরে নোটন আর নোটনের মা শোয়। পাশের ঘরে আমি একা। অন্য দিন আমরা আলো নিভিয়ে দিই। নোটনের মা আজ নাইট-ল্যাম্প জ্বেলে রাখলেন। আমি নিজেকেই নিজে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা আজ এত ভয় পাচ্ছি। কেন? নোটনের মাও তো দেখছি ভয় পেয়েছে। কিন্তু কিসের ভয়? ও ও কি মনে করছে আজ রাত্তিরেই সুব্বা হানা দেবে?
ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ মনে হলো খুব গরম লাগছে। পাখা কি বন্ধ হয়ে গেছে? টর্চ জ্বালোম। না, পাখা তো দিব্যি চলছে। তখন মনে হলো জানলাগুলো সব বন্ধ। তাই
জানলা খুলতে যাচ্ছিলাম, তখনই মনে হলোজানলা খোলা তো নিষেধ। কাজেই মশারির মধ্যে নিজেকে আবার গুটিয়ে নিয়ে শুয়ে পড়লাম।
সবে চোখ বুজিয়েছি অমনি দুম করে একটা শব্দ–আমাদের বাড়ির মধ্যে। আমি চমকে উঠে বসলাম। পাশের ঘর থেকে আমার স্ত্রী চিৎকার করে উঠলেন, ওগো, শুনছ!
আমি তাড়াতাড়ি উঠে ও ঘরে গেলাম। তারপরে দুজনে মিলে ঘর-বারান্দা খুঁজলাম। কোথাও কিছু নেই।
একবার বাইরেটা দেখে আসব?
স্ত্রী কঠিন স্বরে বললেন, না। দরজা খুলবে না।
অগত্যা আবার বিছানায় গিয়ে ঢুকলাম। এবার রিভলভারটা নিয়ে রাখলাম বালিশের নিচে। ঘড়িতে তখন রাত আড়াইটে বেজেছে।
ভোরে উঠেই দরজা খুলে বেরিয়ে এলাম। দেখলাম সেই ফুলগাছের টবটা ছাদ থেকে পড়ে চুরমার হয়ে গেছে।
.
০৮.
গভীর রাতে পড়া মুখস্থ?
সকালবেলায় পাড়ার উমেশ সান্যাল এলেন। বললেন, খুব বেঁচে গেলেন। মশাই। টবটা যদি কারো মাথায় পড়ত তাহলে আর রক্ষে থাকত না। বড়োলোকদের যে কী ফ্যাশান হয়েছে ছাদের আলসেতে, বারান্দায় ফুলের টব ঝুলিয়ে রাখা। কারো মাথায় পড়তে পারে এ কাণ্ডজ্ঞান নেই!
একটু থেমে বললেন, আজকের কাগজ দেখেছেন?
বললাম, দেখেছি। তবে ভালো করে পড়া হয়নি। বললাম না যে ভয়ে এখন কাগজ পড়ি না।
সুখবর আছে। বলে ঝুলি থেকে সেদিনের কাগজটা বের করে দেখালেন।
‘জীবন্ত কংকাল অদৃশ্য’ হেডিং দিয়ে–যে খবরটা ছাপা হয়েছে তা এইরকম ইস্টার্ন বাইপাসের মুখ থেকে সল্টলেকের প্রায় প্রতিটি পথে পুলিশ সারা রাত্রি টহল দিয়েও জীবন্ত কংকালটিকে দেখতে পায়নি। বোধ হয় ওটি অদৃশ্য হয়েছে।
বাঁচলাম মশাই। বাড়িতে সবাইকে রেখে কাশীতে যে মহাযোগ হতে যাচ্ছে সেখানে এবার নিশ্চিন্তে যেতে পারব। দেশ-বিদেশ থেকে কত সাধু-সন্ন্যাসী কলকাতা হয়ে যাবেন। সে এক দেখার জিনিস মশাই। একবার যদি তেমন কোনো সাধুর দর্শন পাই তাহলে তার পা দুটো আঁকড়ে ধরব। বুঝলেন না ওখানে যেসব সাধু-সন্ন্যসীরা যান তারা হেঁজিপেজি ভণ্ড সাধু নন। কি বলেন?
আমি কোনো উত্তর দিলাম না। আমার মনে তখন শুধু একটা কথাই ঘুরছিল, সত্যিই কি রাজু ফিরে গেছে?
সেদিন বিকেল পর্যন্ত প্রণবেশ দুবার ফোন করেছিল। বিশেষ কাজে আটকে গেছে বলে আসতে পারছে না। জানতে চেয়েছিল ভয় পাচ্ছি না তো?
বলেছিলাম, না। তবে টবটা পড়ে গেছে। ও যেন সে কথায় কোনো গুরুত্বই। দিল না।
ক্রমে গোটা সল্টলেকের ওপর সন্ধের অন্ধকার পায়ে পায়ে নেমে এল। আজ আর বিকেলে বেরোতে ইচ্ছে করেনি। তাড়াতাড়ি সব জানলা-দরজা বন্ধ করে দিলাম। ব্যস্! রাতের মতো ঘরে বন্দী হয়ে রইলাম।
আজও রাত নটার মধ্যে খেয়ে দশটার মধ্যে শুয়ে পড়লাম। এত সকাল সকাল শোওয়া আমাদের অভ্যেস নয়। কিন্তু এখন পরিস্থিতি অন্যরকম।
ভাবতে ভাবতে কখন এক সময়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুমটা ভেঙে গেল আচমকাই। ঘরের মধ্যে অসহ্য গুমোট। চারিদিকের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠেছে। আর তখনই শুনতে পেলাম জনমানবশূন্য নিস্তব্ধ পথের ওপর একটা অস্পষ্ট শব্দ খটখট খট্।
কেউ যেন রক্তমাংসশূন্য হাড়ের পা ফেলে হাঁটছে। শব্দটা ক্রমে এগিয়ে এল আমাদের বাড়ির কাছে। আজই তা হলে সেই রাত। ও এসে পড়েছে। আমি বালিশের তলা থেকে রিভলভারটা বের করে উঠে বসলাম।
শব্দটা থেমে গেল।
কোনো সন্দেহ নেই কেউ একজন এসে দাঁড়িয়েছে বাড়ির কাছে। আমি বিছানায় বসেই কাচের শার্সির মধ্যে দিয়ে দেখবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু অন্ধকারে কিছুই দেখতে পেলাম না।
তার একটু পরেই আমি আঁৎকে উঠলাম। দেখলাম আমার মাথার কাছে জানলার ওপাশে একটা ভয়ংকর মূর্তি–যেন কাঠের তৈরি খসখসে একটা মুখ-নারকেলের মতো ছোট্ট মাথা–খাড়াখাড়া চুল–দুটো চোখ-হ্যাঁ, চোখই। তবে টর্চের বাম্বের মতো নয়, চোখ দুটো ওল্টানো। শুধু চোখের সাদাটা দেখা যাচ্ছে। এইভাবেই এক-এক সময়ে সুব্বা হরিদেবপুরের বাড়িতে তাকাতো।
