বুঝতে আর অসুবিধে হলো না। শুধু বললাম, তাহলে সুব্বা সল্টলেকের মুখে ঢুকে পড়েছে।
হ্যাঁ। কুকুরটা বোধহয় অদ্ভুত কিছু দেখে তাকে বিরক্ত করছিল–তারই প্রতিফল।
কেমন একটা আচ্ছন্নের মতো বাড়ি এসে ঢুকলাম। তাহলে সত্যিই আর রেহাই নেই। এখন তাহলে দিন-রাত দরজা-জানলা বন্ধ করে বাড়িতে বসে থাকা। কিন্তু তাই বা সম্ভব কি করে? ডিউটি আছে। ভূতের ভয়ে ছুটি নিয়ে বাড়ি বসে থাকা তো যাবে না।
আশ্চর্য! সারা দিনটা যেন কেমন ঘোরের মধ্যে রইলাম। নোটন ইস্কুলে গেছে। আমার স্ত্রী গম্ভীর বিষণ্ণ মুখে রান্নাবান্না করে চুপচাপ বিছানায় গিয়ে শুলেন। সারা দুপুর একটা কাক বাড়ির ছাদে বসে কা-কা করে ডেকেই চলল। সামনের বাড়ির দেওয়াল থেকে একটা চাঙর আচমকা ভেঙে পড়ল। ইজিচেয়ারে শুয়ে শুয়ে এসবই আমি দেখে যাচ্ছি। কিন্তু যেন কুয়াশার মধ্যে দিয়ে দেখা।
হঠাৎ আমার মনে হলো আমি যেন নেপালের কাঠমাণ্ডু থেকে জিপে করে চলেছি সেই পাহাড়তলিতে যেখানে সেই নিষ্ঠুর তান্ত্রিককে দেখেছিলাম। সেই পাইনগাছে ঘেরা উঁচু উঁচু পাহাড়। জিপ কখনো উঠছে কখনো নামছে…তারপরই দেখলাম সেই ছেলেটাকে কয়েকজন পাহাড়ী বিষ্ণুমতী নদীতে স্নান করিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বলি দেবার জন্যে। পাহাড়ের গুহা থেকে খাঁড়া হাতে বেরিয়ে এল সেই নিষ্ঠুর তান্ত্রিক–পেছনে গুহার গায়ে বাঁশের খুঁটোয় ঝুলছে চোদ্দ পনেরো বছরের ছেলের সেই কংকালটা….তান্ত্রিক বলি দেবার জন্য খাঁড়া তুলল…আমি বলে উঠলাম, প্রণবেশ–ফায়ার
চমকে উঠলাম। কোথায় চলে গিয়েছিলাম আমি? এ তো শুধু ভাবা বা মনে করা নয়, সত্যিই যেন কেউ আমাকে কিছুক্ষণের জন্যে নিয়ে গিয়েছিল কাঠমাণ্ডুতে। না, ভুল। এই তো আমি আমার ঘরেই বসে রয়েছি ইজিচেয়ারে। তাহলে এমন হলো কেন?
হঠাৎ বাইরে তাকিয়ে দেখি এই বেলা চারটেতেই চারিদিকে যেন ধোঁয়ায় ঢেকে যাচ্ছে। আশেপাশের বাড়িগুলো যেন আর নেই। অদৃশ্য। তার জায়গায় শুধু ধোঁয়া আর ধোঁয়া। একটা কোনো মানুষ-জন নেই–ছেলেদের গলার স্বর শোনা যাচ্ছে না….কি হলো? কোথায় গেল সব? আমি কেমন ভয় পেয়ে ডেকে উঠলাম, নোটন!
নোটনের মা ব্যস্ত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।
ওরকম করে চেঁচিয়ে উঠলে কেন?
আমি অপ্রস্তুত হয়ে বললাম, না। ওকে দেখছি না যে?
ও তো এই মাত্র খেলতে গেল।
বললাম, চারিদিকে ধোঁয়া। এর মধ্যে ও বেরোল কেন?
নোটনের মা বললেন, ধোঁয়া! ধোঁয়া কোথায়? স্বপ্ন দেখছ নাকি?
স্বপ্ন! যাক নিশ্চিন্ত হলাম। কিন্তু এরকম দেখলাম কেন?
আমার স্ত্রী তখনও দাঁড়িয়েছিলেন। হঠাৎ টেবিলের ওপর নজর পড়ল। চমকে উঠে বললাম, আচ্ছা, টেবিলে ওটা কি?
কোনটি?
ঐ যে!
ওটা তো সিগারেটের প্যাকেট।
সিগারেটের প্যাকেট। ও আচ্ছা।
কি হয়েছে তোমার?
গা-ঝাড়া দিয়ে উঠলাম। বললাম, না, কিছু হয়নি। আমি একটু ঘুরে আসি।
দাঁড়াও। চা করে দিই।
আমি চা খাইনি?
এই তো সাড়ে চারটে। এখনই তো চা খাও।
তবে দাও। বলে ফের ইজিচেয়ারে বসে পড়লাম।
চা খেয়ে বেরোতে যাচ্ছি স্ত্রী বললেন, তাড়াতাড়ি ফিরো কিন্তু। সন্ধে হয়ে যায়। বললাম, এখুনি ফিরব।
বেরোতে ইচ্ছে করছিল না। কিন্তু সারা দুপুর যে ঘোরের মধ্যে ছিলাম সেই ঘোরটাকে কাটাবার জন্যেই জোর করে বেরোলাম। বুঝতে পারছিলাম না আজ আমার মনটা কেন ওরকম হচ্ছিল।
একে সল্টলেক জায়গাটাই ফাঁকা। তার ওপর আমাদের এ. জে. ব্লকটা আরও ফাঁকা। কে বলবে এটা কলকাতা শহর! এখন এই পড়ন্ত বেলায় রাস্তাগুলো যেন বড়োই নির্জন বলে মনে হচ্ছে। অথচ অন্যদিন তেমন মনে হতো না। তবে কি জীবন্ত কংকালের ভয়ে সবাই এরই মধ্যে বাড়ি ঢুকে গেছে? আশ্চর্য! এমন সাজানো-গোছানো সল্টলেক সিটি–এত সুন্দর সুন্দর বাড়ি কল্পনা করা যায় গভীর রাতে এই পথেই হবে ভয়ংকর জীবন্ত কংকালের আবির্ভাব?
অবশ্য–অবশ্য সল্টলেক না হয় আজই সুন্দরী সিটি হয়েছে কিন্তু আজ থেকে মাত্র ছত্রিশ বছর আগে এই জায়গাটা ছিল বিস্তীর্ণ জলাজমি। মাছ চাষের ভেড়ি। তখনকার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর চেষ্টায় ১৯৬২ সালে শুরু হলো গঙ্গার পলিমাটি দিয়ে সল্টলেক ভরাট করার কাজ। ১৯৬৪ সালে বালি দিয়ে ভরাট করে গড়ে ওঠে লবণহ্রদ। জোব চার্নকের পর এই প্রথম কলকাতা। তার পূর্ববর্তী জলাভূমির নাগপাশ ভেদ করে নতুন রূপ নিয়ে ফুলে ফেঁপে উঠল। তারপর আর চার বছরের মধ্যে সেই পরিত্যক্ত জলাভূমির জায়গায়। দেখা দিল এক আদিগন্ত সমতলভূমি। চাঁদের পিঠের মতো রুক্ষ–প্রাণীশূন্য। লবণহদের পাঁচ বর্গমাইল প্রান্তরে কোথাও এতটুকু ছায়া নেই–শুধু এদিক ওদিক ছড়ানো-ছেটানো কন্ট্রাকটারদের টিনের চালা। এক ফোঁটা পানীয় জল নেই কোথাও–না আছে পাখি, না প্রজাপতি-না একটা ফড়িং। সেদিন তখনও রাস্তাঘাট তৈরি হয়নি, যানবাহনের প্রশ্নই নেই। স্থানীয় থানার এক দারোগা খুন হয়েছিল এখানে। কাঁকুড়গাছি ছাড়িয়ে কেউ এদিকে আসতে সাহস পেত না। রাত্তিরে চাঁদের আলোয় ধু ধু সাদা বালি দেখে মনে হতো এক বিচিত্র মরুভূমি।
হঠাৎ-হঠাৎই যেন গোঁ গোঁ করে কোথা থেকে ছুটে এল ধুলোর ঝড়। না, ধুলো নয়–বালি–শুধু বালি–বালির ঝড়। চমকে উঠলাম–এত বালি এল কোথা থেকে? তারপরেই দেখি ধু ধু সাদা বালির সমুদ্রে দিশেহারা পথিকের মতো আমি একা দাঁড়িয়ে। ভয়ে চিৎকার করে উঠলাম–কে আছ বাঁচাও!…..
