আবার গত দুদিন ধরে গভীর রাতে রাস্তায় যাকে দেখা গিয়েছিল তার মানুষের আকৃতি ছিল। তার বর্ণনা শুনে মনে হয়েছিল সে রাজু সুব্বাই।
তাহলে কাল দুপুরে যাকে দেখা গেল সে কি অন্য কিছু? আর অন্য কিছুই যদি হয় তাহলে সেটা কী?
আশ্চর্য! এই সব প্রশ্ন যখন প্রণবেশকে করেছি ও কোনো উত্তরই দেয়নি। শুধু ওর কপালে দুশ্চিন্তার একটার পর একটা রেখা ফুটে উঠেছিল।
প্রণবেশ এতক্ষণ টেলিফোনের সামনে বসে একটার পর একটা সিগারেট খেয়ে যাচ্ছিল। এবার ঘড়িটা দেখল।বোধহয় এক ঘণ্টা হয়ে গেছে। ও টেলিফোনের দিকে হাত বাড়াল আর তখনই টেলিফোনটা বেজে উঠল। তাড়াতাড়ি রিসিভারটা তুলে নিয়ে সাড়া দিল, হ্যালো! হ্যাঁ, আমি প্রণবেশ। এক ঘণ্টা আগে আপনাকে ফোন করেছিলাম। তারপর ও সমস্ত ঘটনা বলে গেল।
টেলিফোনের শব্দ শুনে আমার স্ত্রীও এসে দাঁড়িয়েছেন, মুখে-চোখে এক রাশ উদ্বেগ নিয়ে।
দার্জিলিঙ থেকে অম্বুজবাবু সব শুনে কিছু বলে যাচ্ছেন আর প্রণবেশ আমার প্যাডে খসখস করে তা লিখে নিচ্ছে।
প্রায় দশ মিনিট পর প্রণবেশ টেলিফোন রেখে আমার দিকে তাকাল। বলল, নষ্ট করার মতো আর একটা মিনিটও সময় নেই। শীগগির একজন ছুতোর ডাকো।
ছুতোর!
হ্যাঁ। অম্বুজবাবু বলছেন ভয়ংকর বিপদ। জীবন্ত কংকালটা এখানে এসে পড়বেই। আর তা আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে। বাঁচার একমাত্র পথ–এর মধ্যে বাড়ির সমস্ত জানলা-দরজায় কাচ বসাতে হবে। অর্থাৎ কাচের দরজা-জানলা। আর জানলা-দরজার ফ্রেমও বদলাতে বলছে। নতুন করে যে কাঠ দিতে বলছে তা শুধু তিব্বতেই পাওয়া যায়। সে কাঠ এখানে পাওয়া সম্ভব নয়। তার বদলে নিমকাঠের ফ্রেম করা চলবে। কিন্তু সব জানলা-দরজার ফ্রেম এত তাড়াতাড়ি বদলানো যাবে না। তাই উনি বলছেন প্রত্যেক দরজা-জানলায় এক টুকরো নিমকাঠ লাগিয়ে দিতে। আর দরজা-জানলা রাত্তিরে কোনো কারণেই খোলা রাখা যাবে না।
আমি হাঁ করে ওর কথা শুনছিলাম। ও আমার হাত ধরে টান দিয়ে বলল, আর বসে থাকলে চলবে না। চলো ছুতোরের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ি।
বেলা দশটার মধ্যেই একসঙ্গে পাঁচজন ছুতোর এসে কাজে লেগে পড়ল। সারা দিন-রাত কাজ করবে। ডবলেরও বেশি মজুরি দিতে হবে। আমি তাতেই রাজী হয়েছি। সারা দুপুর কাঠ কাটা, হাতুড়ি ঠোকার খটাখট শব্দ। এদিকে পাড়ার লোকেও সন্ত্রস্ত। তারাও কাগজে জীবন্ত কংকালের খবর পড়েছে। তিনি সল্টলেকের দিকে আসছেন এটা জেনেই ভয়ে কাটা। তারপর যখন শুনল কংকালটার টার্গেট আমাদের এই বাড়িটা তখন তাদের মুখের কথাও বন্ধ। হয়ে গেল। কংকালটা তাহলে একেবারে তাদের বাড়ির পাশে এসে পড়বে! ভুল করে যদি অন্য কারও বাড়ি ঢুকে পড়ে? তারপর যখন তারা দেখল আমার বাড়ির দরজা-জানলা কাচের করা হচ্ছে তখন তাদের ভয় আরও বেড়ে গেল। আত্মরক্ষার জন্যে যদি একজন পুলিশ অফিসারের বাড়ির দরজা জানলা হঠাৎ কাচ দিয়ে মুড়তে হয় তাহলে কী ভয়াবহ ঘটনা আজ-কালের মধ্যে ঘটতে চলেছে!
বিকেল চারটে।
আজ ছুটি নিয়ে জানলা-দরজায় কাচ লাগানোর তদারকি করছি–পাড়ার প্রৌঢ় উমেশ সান্যাল এসে দাঁড়ালেন। ভাবলাম আর-সবাইয়ের মতো উনিও বুঝি কাচ লাগানো দেখতে এসেছেন। কিন্তু না–তিনি ভারী গলায় বললেন, বিপদের ওপর বিপদ ডেকে আনতে চান?
আমি অবাক হয়ে তাকালাম। জিজ্ঞেস করলাম, কেন?
শখ করে না হয় ছাদের আলসেতে ফুলগাছের টব বসিয়েছেন। কিন্তু একটা টব যে আলসে থেকে ঝুলছে সে খেয়াল রেখেছেন? কারো মাথায় পড়লে কি হবে?
টবের কথায় চমকে উঠলাম। টবের সারি থেকে একটা টব যে খানিকটা বেরিয়ে এসেছিল কদিন আগে তা দেখেছিলাম। তারপর আর খেয়াল করিনি। উমেশবাবুর কথায় তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসে যা দেখলাম তাতে চক্ষুস্থির! সেই টবটা লাইন ছেড়ে বেরিয়ে এসে একেবারে কার্নিসের ধারে পৌঁছেছে। আমি এতই ঘাবড়ে গেলাম যে উমেশবাবুর সামনেই চিৎকার করে উঠলাম কেমন করে এটা সম্ভব?
.
০৭.
ঘোরের মধ্যে সারাদিন
পরের দিন সকাল সাতটা।
একটা জিপ এসে দাঁড়াল। বুঝলাম প্রণবেশ এসেছে। ও এত সকালে এলে আমার কেমন ভয় করে। না জানি কী দুঃসংবাদ নিয়ে এসেছে।
খুব ব্যস্তভাবে ঢুকল প্রণবেশ। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আমি চমকে উঠলাম।
ও কোনো ভূমিকা না করে বল, শীগগির আমার জিপে ওঠো।
ভয়-উদ্বেগ মেশানো গলায় বললাম, কেন?
কথা বাড়িও না। উঠে পড়ো।
তাড়াতাড়ি পোশাক বদলে জিপে উঠে পড়লাম। পনেরো মিনিটের মধ্যে জিপ এসে থামল ইস্টার্ন বাইপাসের মুখে। নেমে পড়লাম জিপ থেকে। রাস্তার মাঝখানে বেশ ভিড় জমে আছে। সশস্ত্র পুলিশও রয়েছে। খবরের কাগজের লোকেরাও এরই মধ্যে ছুটে এসেছে।
ভিড় ঠেলে প্রণবেশ আমাকে নিয়ে গেল জায়গাটায়। ভেবেছিলাম না জানি কী বড়োরকম দুর্ঘটনা ঘটেছে।
কিন্তু সেরকম কিছু নয়। একটা কুকুর পড়ে আছে। মাথাটা তার থ্যাতলানো।
এ আর আশ্চর্য কী! রাত্তির বেলায় রাস্তার একটা কুকুর গাড়ি চাপা পড়েছে।
কিন্তু একটু পরেই ভুল ভাঙল যখন প্রণবেশ একটা লাঠি দিয়ে মরা কুকুরটাকে চিৎ করে দিল। দেখলাম তার পেটটা কেউ যেন ধারালো অস্ত্র দিয়ে চিরে ফেলেছে। নাড়িভুড়ি সব বেরিয়ে এসেছে।
বুঝতে পারলে কিছু? প্রণবেশ আমার দিকে তাকাল।
বললাম, এ তো গাড়ি চাপা পড়ে মরা নয়। কুকুরটার পেট চিরে কেউ মেরেছে। তারপর আক্রোশে মাথাটা ঘেঁৎলে দিয়েছে।
