প্রণবেশ ব্যস্ত হয়ে বলল, কতক্ষণ আগে দেখেছ?
আধঘণ্টা আগে।
জায়গাটা কোথায়?
আর একটু আগে। শেতলা মন্দিরের কাছে।
তুমি আমাদের সঙ্গে জিপে উঠে এসো।
ছেলেটাকে জিপে তুলে নিয়ে আমরা শেতলা মন্দিরের দিকে চললাম। আর একদল ছেলে-ছোকরা লাঠি, টাঙ্গি হাতে নিয়ে হৈ হৈ করে আমাদের পিছনে ছুটে আসতে লাগল।
শেতলাতলা ওখান থেকে বেশি দূরে নয়। আলোছায়া সিনেমা হলের কাছেই। তার একটু দূরেই ভি. আই. পি. বোড় চলে গেছে উল্টোডিঙ্গি। আর বাইপাস পার হলেই সল্টলেক। ইস্টার্ন বাইপাসকে ডান দিকে ফেলে যে রাস্তাটা সেটাই হলো সল্টলেকে ঢোকার প্রধান পথ।
ছেলেটা বললে, এইখানে–সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি থামালাম। জায়গাটা আলোছায়া সিনেমা হল আর শেতলাতলার মাঝখানে। এখানে মেন রোড থেকে বাঁ দিকে একটা রাস্তা চলে গেছে। আর সেই রাস্তার সামনেই একটা বিরাট তিনতলা বাড়ির জীর্ণ কংকাল দাঁড়িয়ে। ছেলেটার পিছু পিছু আমরা এগিয়ে চললাম। ছেলেটা বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়াল। ভাঙা পাঁচিলঘেরা কম্পাউন্ডের মধ্যে বাড়িটা। একতলার জানলা-দরজা সব উধাও। দোতলার বিবর্ণ জানলা যে কটা সামনে থেকে দেখা গেল সবই বন্ধ। তিনতলার ওপর বিরাট লম্বা ছাদ। ছাদের আলসেতে ছোটো ছোটো গাছ, ঘাস গজিয়েছে। বাড়ির পিছনে মস্ত একটা বটগাছ। বোঝা যায় বাড়িটার সামনে-পিছনে যতই আধুনিকতার প্রলেপ দেওয়া হোক না কেন জায়গাটা আসলে খুবই পুরনো।
ছেলেটার সাহস আছে বলতে হবে। কিংবা জীবন্ত কংকাল সম্বন্ধে কোনো খবর রাখে না। সে জানে শুধু একটি পাগলই বোধ হয় ঐ পাঁচিলের ওপর শুয়ে আছে। পাগল না হলে কেউ সরু পাঁচিলের ওপর শুতে পারে?
ছেলেটা দিব্যি কম্পাউন্ডের মধ্যে ঢুকে পড়ে ছাদের দিকে তাকাল। তারপর হতাশ হয়ে বলল, নাঃ, নেই। চলে গেছে। একটু আগেও ছিল।
চলে গেছে? প্রণবেশ যেন চুপসে গেল।
ছেলেটা বলল, তাই তো মনে হচ্ছে। দেখতে পাচ্ছি না। তবে কাছেই কোথাও আছে–নিশ্চয় আছে। একটা চিমসে গন্ধ পাচ্ছেন না? গন্ধটা আমি তখনও পেয়েছিলাম।
সত্যিই একটা চিমসে গন্ধ গলিতে ঢোকার পর থেকেই পাওয়া যাচ্ছিল।
প্রণবেশ বলল, ছাদে ওঠা যাবে না?
ছেলেটা মাথা দুলিয়ে বলল, যাবে।
তবে চলো।
এই সময়ে পেছনে যারা লাঠিসোটা নিয়ে আসছিল তারা হল্লা করতে করতে এসে পড়ল। সত্যি কথা বলতে কি বাড়িটার ভেতরে ঢুকতে অন্তত আমার খুব ভয় করছিল। এখন এত লোক দেখে সাহস হলো।
পেছনের লোকগুলো চেঁচিয়ে উঠল, আমরাও ওপরে উঠব।
আমরা ওদের বাইরে অপেক্ষা করতে বলে সবে মাত্র ভেতরের দিকে পা বাড়িয়েছি এমনি সময় তেতলার ছাদ থেকে কি যেন লাফিয়ে পড়ল বটগাছের ওপর।
এক মুহূর্তের জন্যেই দেখতে পেয়েছিলাম বস্তুটাকে। কোনো কিশোরও নয়, জীবন্ত কংকাল নয়, শুধু লম্বা কালো মতো একটা কিছু–যা মানুষ নয়, বাঁদর বা অন্য কোনো জীবের সঙ্গেও কিছু মাত্র সাদৃশ্য নেই। সেই বস্তুটা গাছের ওপর লাফিয়ে পড়া মাত্র–সমস্ত গাছটা ঝকানি খেল। কতখানি ভারী বস্তুর ধাক্কা খেলে অত বড়ো গাছটা অমন নড়ে উঠতে পারে ভেবে অবাক হলাম। তবু কী বিশ্বাস করতেই হবে বস্তুটা আমাদের সেই চেনা তেরো-চোদ্দ বছরের রাজু সুব্বারই জীবন্ত কংকাল? অসম্ভব।
এদিকে বস্তুটাকে যারা গাছে লাফ দিতে দেখেছে তারা হৈ হৈ করে বটগাছের নিচে ছুটে গেল। কিন্তু ঝাড়া এক ঘণ্টা ধরে সবাই মিলে খুঁজেও তাকে পাওয়া গেল না–চোখের দেখাও নয়।
.
০৬.
দুর্ভেদ্য দুর্গ
বাড়িতে ভয়ের একটা কালো পর্দা নেমে এসেছে। নোটনের মা সব শুনেছেন। তিনি শুধুই বলেন, কি হবে গো? রাজু শেষ পর্যন্ত কলকাতাতেও ধাওয়া করে এল? তাহলে কি আমাদের বাড়িও খুঁজে পাবে?
এর উত্তর আমি আর কি দেব? যে ভি. আই. পি. রোড পর্যন্ত আসতে পেরেছে সে যে এখানেও আসবে না তা কি করে বলি? তাই চুপ করে থাকি।
মনে মনে এও বুঝেছি, যে আসছে সে এখন আর আমাদের আগের রাজু সুব্বা নয়, যেন অন্য কেউ—আরও হিংস্র আরও ভয়ানক।
সকালবেলাতেই প্রণবেশ চলে এসেছে আমাদের বাড়ি। লক্ষ্য করছি ক্রমশই দুর্ভাবনায় ওর মুখের ভাব বদলে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে আমার চেয়ে যেন ওরই ভয় বেশি। ওই যেন আমাকে বাঁচাবার সব দায়িত্ব নিয়েছে। আর আমি? আমি যে কি করব কিছুই বুঝতে পারছি না। বন্ধুর ওপরই সব ছেড়ে দিয়ে বসে আছি।
প্রণবেশ সকালে এসেই দার্জিলিঙে অম্বুজ লাহিড়িকে ফোন করেছিল। উনি এখন দার্জিলিঙে রয়েছেন। কিন্তু উনি কোথায় বেরিয়েছেন। ঘণ্টাখানেক পরে আবার ফোন করা হবে।
অম্বুজবাবুকে যে এই পরিস্থিতিটা এখনই জানানো উচিত এটাও আমার মাথায় আসেনি। আমি পুলিশ অফিসার। তাই বোধ হয় ভেবে নিয়েছি, লালবাজার যখন দায়িত্ব নিয়েছে তখন আর ভাবনা নেই। ওরাই আমাকে বাঁচাবে। একটা অতি সত্য ব্যাপার যেন বুঝেও বুঝছি না যে, এটা খুনে ডাকাতের ব্যাপার নয় যে পুলিশ ব্যবস্থা করবে। এ যে কী বিস্ময়কর ব্যাপার তা তো কালকেই স্বচক্ষে দেখলাম। ভাঙা বাড়ির তিনতলার পাঁচিলে শুয়ে থাকতে না দেখলেও ছাদ থেকে বটগাছে লাফিয়ে পড়তে যাকে দেখলাম সে কী আমাদের গ্রামের বাড়ির সেই রাজু সুব্বাই! রাজুও ছাদের পাঁচিলের ওপর দিয়ে হাঁটত। ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আমগাছের ডাল ধরে ঝুলত ঠিকই কিন্তু সে যেন আমার ছেলে নোটনেরই বন্ধু। কিন্তু কাল যাকে মুহূর্তের জন্যে দেখলাম? তার তো মানুষের আকৃতিও নয়। চার ফুট লম্বা কালো একটা বস্তু। অথচ তারই ভারে অত বড়ো বটগাছটা কেঁপে উঠেছিল।
