ঠিক ধরেছ। হেসে বলল প্রণবেশ, আজকাল গাঁজায় দম দিয়ে খবর ছাপছ নাকি?
না, এখনও গাঁজার তেমন আমদানি হয়নি। তবে শীগগির হবে।
কিরকম?
সামনের সপ্তাহে বারাণসীতে কি এক মহাযোগে পুণ্যস্নান আছে। দলে দলে সাধু-সন্ন্যাসী আসতে শুরু করবে। আর তখনই তাদের গাঁজার ধোঁওয়ায় সারা কলকাতা অন্ধকার হয়ে যাবে।
পরিতোষের রসিকতায় গুরুত্ব না দিয়ে প্রণবেশ বলল, দুদিন ধরে হঠাৎ ঐসব ভুতুড়ে ব্যাপার ছাপতে আরম্ভ করলে কেন? বেশি কাগজ বিক্রির লোভে?
ভুতুড়ে ব্যাপার! ও জীবন্ত কংকালের কথা বলছ তো?
হ্যাঁ।
কি জানি যে খবর আমরা পেয়েছি তা শুধু অবিশ্বাস্য নয়, অকল্পনীয়। আমাদের স্টাফ রিপোর্টার নিজে চোখে দেখেছে। তাও একজন নয় দুজন। আর অবাক কাণ্ড–এতগুলো ছবি তুলল কিন্তু একটা ছবিও উঠল না।
প্রণবেশ হেসে বলল, কেন বলো তো?
পরিতোষ চাপা গলায় বলল, স্টাফ রিপোর্টারদের মতে চামড়া ঢাকা কংকলটার নাকি শরীর বলে কিছু ছিল না। নইলে একটি ছবিও উঠত না?
প্রণবেশ বলল, তা খবরটা দেখে পাবলিক কি বলছে?
উঃ! আর বোলো না। টেলিফোনের পর টেলিফোন আসছে ঘটনাটা কতখানি সত্যি তা জানতে।
উত্তর কী দিচ্ছ?
বলছি প্রত্যক্ষদর্শীরা যা দেখেছে তাই খবর করে দিয়েছি। ওরা জানতে চায় জীবন্ত কংকালটা কোন দিকে যাচ্ছে। সেটা আর আমি কি করে বলব বলো। আমার সঙ্গে তো কংকালটার কথাবার্তা হয়নি। চোখে দেখারও সুযোগ হয়নি।
কোথায় যাচ্ছে সে খবরটা হয়তো তোমাকে দিতে পারব।
অ্যাঁ! বল কী! ঠাট্টা করছ না তো?
না। ঠাট্টা করলে তোমায় ফোন করে প্রসঙ্গটা তুলতে যাব কেন? দিন দুই অপেক্ষা করো। চমকে ওঠার মতো খবরটা তোমাকেই আগে দেব।
বলে প্রণবেশ রিসিভারটা নামিয়ে রাখল।
কী ব্যাপার? হঠাৎ খবরের কাগজে ফোন?
জেনে নিলাম কলকাতার মানুষ খবরটা জেনেছে। এটাই চাইছিলাম।
প্রণবেশ আর আমি জিপ নিয়ে বেরিয়ে গেলাম। প্রথমে লালবাজার। সেখানে পুলিশের বডোকর্তারা আমাদের মুখে নেপাল থেকে হরদেবপুর পর্যন্ত সমস্ত ঘটনা শুনে অবাক। তারা কখনোই এ সব ঘটনা বিশ্বাস করতেন না। গাঁজাখুরি বলে উড়িয়ে দিতেন। কিন্তু যেহেতু আমরা দুজনেই পুলিশে গুরুত্বপূর্ণ পদে আছি, যেহেতু আমরা দুজনেই প্রত্যক্ষদর্শী আর দুদিন দুদুটো নামী কাগজে তিনজন প্রত্যক্ষদর্শীর খবর ছাপা হয়েছে সেজন্যে তারা ব্যাপারটা উড়িয়ে দিতে পারলেন না। এটা যে সত্যিসত্যিই ভৌতিক বা অলৌকিক ব্যাপার তা পুরোপুরি না মানলেও জীবন্ত কংকালটাকে খুঁজে বের করবেনই সে আশ্বাস দিলেন। এবং আমাদের সামনেই কলকাতার সমস্ত থানাকে বিশেষ করে বেলেঘাটা আর উল্টোডিঙ্গি থানাকে জানিয়ে দিলেন রাস্তায় সতর্ক দৃষ্টিতে যেন লক্ষ্য করা হয় ঐরকম কংকাল জাতীয় কিছু দেখতে পাওয়া যায় কিনা।
আমরা দুজনেই খুশি হলাম। অলৌকিক হোক বা না হোক দায়িত্বটা এখন শুধু আমাদের দুজনের রইল না। পুলিশ টেক-আপ করেছে। কাজেই আমরা অনেকটা নিশ্চিন্ত।
এছাড়া পাবলিকও কাগজ-মারফৎ জেনে গেছে ব্যাপারটা। কাজেই কোথাও যদি জীবন্ত কংকালটাকে কেউ দেখতে পায় তাহলে তার উপযুক্ত ব্যবস্থা জনসাধারণই নেবে কিংবা থানায় জানিয়ে দেবে। আমাদের আর ভাবতে হবে না।
পাবলিক যে এই ব্যাপার নিয়ে কতটা মেতে উঠেছে, বেলেঘাটা মেন রোডে ঢুকতেই তা বুঝতে পারলাম।
যদিও তখন বেলা প্রায় তিনটে রাস্তায় লোকজন কম তবু দুধারের ফুটপাথে লোকের জটলা। বোঝা গেল আজকের কাগজেই খবরটা পড়ে তারা চঞ্চল হয়ে উঠেছে। একজন বলছে, সব গাঁজা। খবরের কাগজগুলো পর্যন্ত আজগুবি খবর ছড়াচ্ছে।
আর একজন প্রতিবাদ করে বলছে, এর আগেও, অন্য কাগজে এইরকম খবর বেরিয়েছে। বাজে কথা হলে দুদুটো বড়ো কাগজে এরকম খবর ছাপা হয়?
আমরা জিপটা থামিয়ে নেমে পড়লাম।
পুলিশ দেখে ওদের কথাবার্তা থেমে গেল। প্রণবেশ এগিয়ে গিয়ে বলল, আপনারা যা নিয়ে আলোচনা করছেন, আমরাও সে বিষয়ে খোঁজ নিতে বেরিয়েছি। লালবাজার সমস্ত থানাকে জানিয়ে দিয়েছে রাতে তোক দিনে হোক এইরকম কাউকে দেখলে তখনই, যেন ধরবার চেষ্টা করে।
পুলিশের মুখ থেকে এই কথা শুনে ওরা খুব উৎসাহ পেল। বলল, আমরা স্যার, ঠিক করেছি রাতের বেলা রাস্তায় রাস্তায় পাহারা দেব।
ইতিমধ্যে পুলিশ দেখে আরও লোক জড়ো হয়ে গেছে।
প্রণবেশ বলল, একটা জিনিস মনে রাখবেন–ঐ যার কথা বলা হচ্ছে সে আপনাদের বেলেঘাটায় থাকতে আসেনি। আমরা জেনেছি তার লক্ষ্য সল্টলেক। বেলেঘাটা রোড ধরে ভি. আই. পি. রোডের দিকে এগোচ্ছে। কিন্তু গভীর রাত ছাড়া সে এগোতে পারে না। কাল রাতে এই রাস্তা দিয়ে পাস করেছে।
ভিড়ের মধ্যে থেকে একজন বলে উঠল, আমরা দুটো মোটরবাইক নিয়ে ভি. আই. পি. রোডটা দেখে আসতে পারি।
বললাম, সে তো আমরাও জিপে করে যেতে পারি। তা নয়। দিনের বেলায় সে এগোয় না। কাজেই এখন এখানেই কোথাও লুকিয়ে আছে।
এ কথা শুনে সবাই যেন চনমন করে উঠল।
তা হলে স্যার, আমরা খুঁজতে বেরিয়ে পড়ি?
এমন সময় ভিড়ের ভেতর থেকে একটা অল্পবয়সী ছেলে বলে উঠল, একটু আগে একজনকে একটা ভাঙা পুরনো বাড়ির কার্নিসের ওপর শুয়ে থাকতে দেখেছি।
প্রণবেশ চমকে উঠে বলল, কিরকম দেখতে?
ছেলেটা বলল, ভালো করে দেখতে পাইনি। শুধু দুটো সরু সরু কালো পা দেখতে পেয়েছি। ভাবলাম নিশ্চয় কোনো পাগল।
