খবরটা পড়ে আমার সমস্ত শরীর হিম হয়ে গেল। বুঝতে বাকি রইল না ঐ জীবন্ত কংকালটি আর কেউ নয়নেপালের সেই রাজু সুব্বাই, যে আমার দেশের বাড়িতে বার বার আমাকে মারবার চেষ্টা করেছিল। এখন সে আমাকে মারবার জন্যেই কলকাতায় এসে পড়েছে।
এখন বুঝতে পারছ কী সাংঘাতিক বিপদ এগিয়ে আসছে? প্রণবেশ আমার ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে বলল।
আমার বেশি কথা বলার শক্তি ছিল না। শুধু মাথা দুলিয়ে সায় দিলাম।
কিন্তু
প্রায় ধমক দিয়ে প্রণবেশ বলল, এখনও কিন্তু? এখনও সন্দেহ আছে নাকি?
আমি কোনোরকমে জুড়নো চায়ে চুমুক দিয়ে বললাম, সে কথা বলছি না। বলতে চাইছি–যে হাওড়ার দিক থেকে স্ট্রান্ড রোড, পোস্তা হয়ে চিৎপুর ক্রস করে বিবেকানন্দ রোড ধরে এগোচ্ছিল, সে হঠাৎ শেয়ালদা ফ্লাইওভারের কাছে এল কেন?
প্রণবেশ বলল, আমার ধারণা ও সল্টলেকে পৌঁছুবার ঠিক পথটা ধরতে পারছে না। একটা জিনিস লক্ষ্য কোরো, জগদীশ ঘোষও বলেছিল আকাশের দিকে মুখ করে ছুটছিল। তার মানে কি? নিশ্চয় আকাশের শোভা দেখতে দেখতে যাচ্ছিল না।
আমি বললাম, তা অবশ্যই নয়।
তাহলে?
আমি মাথা নাড়লাম। বললাম, বুঝতে পারছি না।
প্রণবেশ বলল, আমার ধারণা ও বাতাসে তোমার গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে যাচ্ছিল।
কিন্তু দেশের বাড়িতে তো ও বেশ কিছুদিন ছিল। কই তখন তো ওরকম করে চলেনি?
প্রণবেশ বলল, ভুলে যাচ্ছ বন্ধু, তখন তোমায় খোঁজার দরকার হয়নি। তুমি ছিলে ওর নাগালের মধ্যে।
আমি চুপ করে রইলাম। ভাবছিলাম প্রণবেশের কথা যদি ঠিক হয় তাহলে আমরা কি সত্যিই কলকাতা শহরে আছি, না কোনো অলৌকিক জগতের বাসিন্দা হয়ে গেছি?
প্রণবেশ স্থির বিশ্বাসের সঙ্গে বলল, হাওড়ার দিক থেকে সল্টলেকে আসার অনেকগুলো পথ আছে। তার মধ্যে বিবেকানন্দ রোড, মানিকতলা হয়ে ভি. আই. পি. রোড ধরেও যেমন আসা যায় তেমনি শেয়ালদা উড়ালপোলের ক্রসিং থেকে শেয়ালদার পাশ দিয়ে বেলেঘাটা রোড দিয়ে ভি. আই. পি. রোড ধরেও আসা যায়। মনে করে দ্যাখো এই কদিনের মধ্যে তুমি নিশ্চয় ঐ দুটো পথ দিয়েই যাতায়াত করেছ।
বললাম, তা করেছি। অনেক বারই করেছি।
ব্যস্। তা হলে তো অংক মিলেই গেল।
আমি খানিকটা হতাশার সুরে বললাম, এ কথাটাই তাহলে তুমি আমায় বোঝাতে চাচ্ছ–সেই তান্ত্রিক আমাকে এখনও ছাড়েনি। রাজু সুব্বাকে লেলিয়ে দিয়েছে কলকাতাতেও। সে পথ না চিনলেও শিকারী কুকুরের মতো বাতাসে আমার যেটুকু গন্ধ এখনও মিশে আছে তাই শুঁকতে শুঁকতে এগিয়ে আসছে।
প্রণবেশ গম্ভীরভাবে বলল, হ্যাঁ।
আমি অন্যমনস্কভাবে একটা সিগারেট ধরালাম।
কিন্তু—একটা কথা
বলো।
হরদেবপুর থেকে ও কলকাতায় এল কি করে? ট্রেনে?
প্রণবেশ হেসে বলল, ট্রেনে যদি আসতে পারতো তাহলে সেদিনই ছুটে এসে ট্রেনে উঠে পড়তো। তোমার মনে আছে কি অম্বুজ লাহিড়ি একটা কথা বলেছিলেন, আমরা যাদের অলৌকিক জীব বা ভূতজাতীয় কিছু বলি তারা অনেক কিছু করতে পারলেও সব কাজ তারা করতে পারে না বা সব জায়গায় তারা যেতে পারে না। কিছু বাধা থাকেই। এটাই রক্ষে। তাই অন্তত ট্রেনে, বাসে, ট্যাক্সিতে সাধারণ মানুষের মতো এরা উঠতে পারে না। এরা পথ ধরেই আসে। অবশ্যই সে পথ নির্জন হওয়া চাই। আর চাই অন্ধকার রাত।
এইখানে আমার একটা পয়েন্ট জানার আছে।
প্রণবেশ বলল, কি তোমার পয়েন্ট বলো।
শুধু রাত্রেই যদি ও হেঁটে আসে তা হলে দিনে কোথায় থাকে?
প্রণবেশ চমকে উঠে বলল, দারুণ পয়েন্টটা তো তুমি তুলেছ! এটা তো আমার মাথায় আসেনি!
বললাম, বুঝতেই পারছি একটা অদ্ভুত ধরনের বিপদ এসে পড়েছে। এখন দেখতে হবে সুব্বা দিনের বেলায় কোথায় থাকে। নিশ্চয় ভি. আই. পি. রোড দিয়ে বেলেঘাটা মেন রোডে ভালো করে খুঁজলে তার সন্ধান পেয়ে যাব।
কাজেই চলো এখুনি আমরা জিপটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ি।
প্রণবেশ বলল, খুব ভালো কথা বলেছ। কিন্তু তার আগে আমাদের একটা কাজ করতে হবে। লোকে গাঁজাখুরি ব্যাপার বলে উড়িয়ে দেবে এই ভয়ে এখন আর মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকলে চলবে না। দুদিন কাগজে তো খবর বেরিয়েই গেছে। এবার সব থানায় পুলিশদের হুঁশিয়ার করে দিতে হবে। সব আগে লালবাজারকে জানাতে হবে। আর যে কাগজে এই খবরগুলো ছাপা হয়েছে তাদের কাছ থেকে জানতে হবে লোকে খবরটা পড়ে কিছু বলছে কিনা। অর্থাৎ সারা কলকাতা শহরে একটা হৈচৈ তুলতে হবে। আর সেটা করতে হবে আজ দুপুরের মধ্যেই। কেননা আর সময় নেই। এই বলে প্রণবেশ উঠে পড়ল।
বললাম, কখন আসছ তাহলে?
প্রণবেশ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে নিয়ে বলল, বেলা একটায়।
ঠিক আছে। আমি রেডি হয়ে থাকব।
প্রণবেশকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে ফিরে আসছি, ছাদের কর্নিসের দিকে লক্ষ্য পড়ল। চমকে উঠলাম–সেই টবটা লাইন থেকে আরও খানিকটা বেরিয়ে এসেছে।
.
০৫.
জীবন্ত কংকালের সন্ধান
কাঁটায় কাঁটায় বেলা একটার সময়ে প্রণবেশ জিপ নিয়ে হাজির হলো। আমিও রেডি হয়ে ছিলাম। বেরোতে যাচ্ছি, প্রণবেশ বলল, দাঁড়াও একটা ফোন করে নিই।
বলে যে দুটো কাগজে দুদিন খবরটা বেরিয়েছিল তার একটাতে ফোন করল। রিং হতেই প্রণবেশ নিউজ এডিটার পরিতোষ শীলকে চাইল।
পরিতোষ প্রণবেশের অনেক দিনের চেনা। প্রণবেশের গলা পেয়ে পরিতোষ উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল।
কি খবর ও. সি. সাহেব? হঠাৎ খবরের কাগজে হামলা? বেয়াড়া কোনো খবর ছেপেছি নাকি?
