তারপর?
যদিও আমার হাত ভয়ে কাঁপছিল তবু আমি বন্দুক তুলে ধরে তেড়ে গেলাম। আর সঙ্গে সঙ্গে ও দৌড় লাগাল। সে দৌড়নো মানুষের মতো দৌড়নো নয়, বাতাসে সাঁতার কাটা। দু মিনিটের মধ্যে সে কোথায় হাওয়া হয়ে গেল।
এই পর্যন্ত বলে জগদীশ তার বক্তব্য শেষ করল।
মিনিট পাঁচেক আমরা কেউ কোনো কথা বলতে পারলাম না।
একটু পরে প্রণবেশ বলল, আর কিছু লক্ষ্য করেছিলে?
জগদীশ একটু ভেবে বলল, ও যখন দৌড়ে দৌড়ে হাঁটছিল তখন আকাশের দিকে মুখ করে যেন স্যার বাতাস শুঁকতে শুঁকতে এগোচ্ছিল।
আর কিছু?
না স্যার।
আবার যদি ঐরকম কিছু দ্যাখো আমাদের জানাবে।
নিশ্চয় জানাব স্যার। তবে আর যেন ওকে দেখতে না হয়।
প্রণবেশ মুচকে একটু হেসে বলল, ঠিক আছে জগদীশ। তুমি এখন যেতে পার।
জগদীশ আবার আমাদের স্যালুট দিয়ে চলে গেল।
জগদীশ চলে গেলে আমরা দুজনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলাম।
তারপর প্রণবেশই প্রথম কথা বলল, কী বুঝলে?
রহস্যময়।
যতই রহস্যময় হোক উনি যে রাজু সুব্বাই সে বিষয়ে সন্দেহমাত্র নেই।
কিন্তু ও কী করে কলকাতায় আসবে?
প্রণবেশ হেসে বলল, যেমন করে সুদূর নেপাল থেকে তোমাদের দেশের বাড়ি হরিদেবপুরে এসেছিল।
এখানে আসার উদ্দেশ্য কি?
তাও বুঝতে পারছ না? যে কাজটা ও শেষ করবার আগেই কলকাতায় পালিয়ে এসেছিলে, সেই কাজটি শেষ করার জন্যে।
অর্থাৎ আমাকে মারবার জন্যে?
সে তো আমার চেয়ে তুমিই ভালো করে জানেনা।
কিন্তু রাস্তা খুঁজে খুঁজে এই সল্টলেকে এসে আমায় মারতে পারবে? একটা রোগা-পটকা কংকালের এতখানি ক্ষমতা? না প্রণবেশ, আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারব না জগদীশ যাকে দেখেছিল সে সুব্বাই। অনেক কিছু ও বাড়িয়ে বলেছে। আসলে ও একটা রাস্তার ভিখিরির ছেলে ছাড়া আর কিছু নয়।
তাই যদি হয় তাহলে মঙ্গল। ঠিক আছে, এখন আমাদের চোখ রাখতে হবে খবরের কাগজে। গভীর রাতে আর কেউ ওকে অন্য কোথাও দেখতে পায় কিনা।
.
০৪.
আবার জবর খবর
প্রায় প্রত্যেক দিন ভোরে বেড়ানো আমার অভ্যেস। বিশেষ করে এই। সল্টলেকের ফাঁকা এ. জে, এলাকায় বেড়িয়ে খুব আনন্দ পাই।
আমি পুলিশে কাজ করলেও মনটা কবিত্বপূর্ণ। খোলা মাঠ, নীল আকাশ, ঘন মেঘ, ফুলের বাগান আমার খুবই প্রিয়।
যদিও বাসাটা আমার নিজের নয় তবুও আমার স্ত্রী বাড়ির সামনে সামান্য একটু জায়গা ঘিরে ছোট্ট একটি বাগান করেছেন। আর আমি ছাদের কার্নিসে সার দিয়ে সাজিয়ে রেখেছি নানা জাতের বাহারি ফুলের টব। যেমন– জারবেরা, বোগেনভেলিয়া, ফার্ন, গ্রাউন্ড অর্কিড-যার ছোটো ছোটো ভায়োলেট রঙের ফুল।
প্রতিদিন মর্নিং ওয়াক সেরে বাড়ি ঢোকার মুখে একবার করে আলসের ওপর রাখা সার সার টবগুলোকে দেখি। ভারি ভালো লাগে।
ফেরার পথে এক প্রতিবেশী বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়ায় গল্প করতে করতে দেরি হয়ে গেল। তবু বাড়ির গেটে এসে অভ্যাসমতো আলসের দিকে তাকালাম। দেখি একটা টব লাইন ছেড়ে যেন সামনের দিকে সরে এসেছে। একটু অবাক হলাম। ভারী টবটা সরে এল কি করে? এর মধ্যে ঝড়বৃষ্টিও হয়নি যে ঝড়ের ধাক্কায় নড়েচড়ে যাবে।
যাই হোক ঐ সামান্য ব্যাপার নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে বাড়িতে ঢুকলাম ঢুকেই অবাক–এই সাত সকালে প্রণবেশ এসে হাজির হয়েছে।
প্রণবেশ আমার সত্যিকার বন্ধু। আগে দেখাসাক্ষাৎ কম হতো। আমরা যে যার কাজ নিয়ে হিমশিম খাই। অন্য চাকুরেবাবুদের চেয়ে পুলিশ চাকুরেদের অনেক হ্যাপা। কিন্তু জুলাই মাসে দুজনেই এক মাসের ছুটি নিয়ে নেপাল বেড়াতে যাবার পর–আর ঐ রাজু সুব্বার হাঙ্গামাকে কেন্দ্র করে এখন আমাদের সম্পর্ক আরও নিকট হয়েছে। অফ-ডে থাকলে ও প্রায়ই সকালে আমার এখানে চলে আসে। আমিও মাঝে মাঝে ওর বাসায় যাই। কিন্তু এত সকালে ও কখনও আসে না।
কী হে! ঘুম থেকে উঠেই চলে এসেছ দেখছি! হেসে বন্ধুকে স্বাগত জানাই।
কিন্তু প্রণবেশ হাসল না। বেশ আদেশের সুরেই বলল, চুপটি করে এখানে বোসো। কথা আছে। তারপর আমার স্ত্রীকে বলল, বৌদি, এবার আমাদের চা দিন।
আমি মজা করে বন্ধুর অনুমতি নিয়ে বাইরের প্যান্ট-জামা ছাড়তে কয়েক মিনিটের জন্যে ভেতরে চলে গেলাম। পাঞ্জাবি আর লুঙ্গি পরে, মুখ ধুয়ে যখন বাইরের ঘরে এসে বসলাম তখন দেখি গৃহিণী টোস্ট আর চা নিয়ে হাজির।
সবেমাত্র টোস্টে আরাম করে কামড় দিয়েছি অমনি প্রণবেশ ওর ব্রিফকেস থেকে সেদিনের কাগজখানা বের করে মাঝের পাতায় একটা খবরে দাগ দিয়ে গম্ভীর মুখে আমার দিকে বাড়িয়ে দিল।
কাগজটা নিয়ে ঝুঁকে পড়লাম খবরটার দিকে। খবরটা এইরকম–
জীবন্ত কংকালের পুনরাবির্ভাব
গতকাল রাত দুটোর সময়ে দুজন সাংবাদিক খবরের কাগজের অফিসের ডিউটি সেরে গাড়িতে বাড়ি ফিরছিলেন। নিঝুম রাত। জনশূন্য রাজপথ। শেয়ালদা ফ্লাইওভারের কাছে আসতেই তাদের চোখে পড়ে একটো তেরো চোদ্দ বছরের কংকালসার ছেলে আকাশের দিকে মুখ করে বেলেঘাটা মেন রোডের দিকে জোরে হেঁটে চলেছে। সে হাঁটা সাধারণ মানুষের হাঁটার মতো নয়–যেন শূন্যে পা ফেলে দৌড়নো। গায়ে ছিল কালো রঙের হাঁটু পর্যন্ত লম্বা একটা ফতুয়া। তার মাথাটা ছোটো। নারকেলের মতো। খাড়া খাড়া পাতলা চুল। কৌতূহলী সাংবাদিকরা তখনই সোজা না গিয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে বেলেঘাটা মেন রোডের দিকে চালান। গাড়ি যতই ছেলেটার কাছাকাছি হচ্ছিল, আশ্চর্যজনকভাবে ছেলেটা ততই দূরে সরে যাচ্ছিল। তারপরই ছেলেটা অন্ধকারে যেন মিলিয়ে গেল। ইতিমধ্যে তারা ফ্ল্যাশে ছেলেটার অনেকগুলো ছবি তুলেছিলেন। কিন্তু অবাক কাণ্ড–একটা ছবিও ওঠেনি।…
