আমার কথা শুনে গৃহিণী অনেকটা নিশ্চিন্ত হলেন।
গৃহিণী নিশ্চিন্ত হলেও প্রণবেশকে দেখে মনে হলো ও যেন তখনও কী ভাবছে।
বললাম, কী হে! কী এত ভাবছ?
ও তার উত্তর না দিয়ে টেলিফোনের রিসিভারটা তুলে নিল। তারপর ডায়াল করতে লাগল।
হ্যালো, জোড়াসাঁকো থানা? কমলেশবাবু নাকি? আমি প্রণবেশ কথা বলছি।
হ্যাঁ, ভালো আছি। না, খুন-খারাপির ব্যাপার কিছু নয়। অন্য একটি ব্যাপার। আজকের কাগজে একটা খবর দেখলাম—
হ্যাঁ। আমাদের জগদীশ ঘোষ এরকম কিছু একটা দেখেছিল। ও তো ভয়ে মরে যাচ্ছে। বলছে ভূত ছাড়া কিছু নয়।
ওর কথা বিশ্বাস করেই কাগজে খবর পাঠিয়ে দিলেন?
কী খবর ভাই? এখানে আর-সবাই ওর কথা শুনে খুব ভয় পেয়ে গেছে। ওদের ধারণা অলৌকিক কিছু। শেষে ওদেরই চাপে খবরটা বার করতে হলো।
আপনার কী ধারণা? নিজে চোখে তো দেখিনি। তবে ও যে ভাবে বর্ণনা দিচ্ছে তাতে কিছু যে একটা দেখেছে তাতে সন্দেহ নেই। এতদিন ও এত জায়গায় গভীর রাতে ডিউটি দিয়েছে, কখনও তো এরকম ভয় পায়নি। তা ছাড়া
তা ছাড়া কি বলুন।
তোমার মনে আছে কিনা জানি না বেশ কয়েক বছর আগে রেড রোডে এক পুলিশ অফিসার গভীর রাতে জিপ চালিয়ে যেতে যেতে রাস্তার মাঝখানে কিছু একটা দেখেছিলেন। সে খবর কাগজে ছাপা হয়েছিল। পুলিশের ব্যাপার বলেই ওটা আমি ফাইল করে রেখেছি। ইচ্ছে করলে একদিন দেখে যেও।
তা না হয় দেখব। আপনি একবার জগদীশকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিতে পারেন?
তা পারি। কিন্তু তুমি হঠাৎ এ নিয়ে এত ভাবছ কেন? তুমিও কি ঐরকম কিছু দেখেছ?
না। তা নয়। এ নিয়ে পরে কথা বলব।
প্রণবেশ ফোন ছেড়ে দিল।
বললাম, একেবারে জোড়াসাঁকোয় ফোন করে বসলে?
হ্যাঁ। যে দেখেছে সে ঠিক কী দেখেছে তা স্পষ্ট করে জানা দরকার।
মনে হচ্ছে তুমি ব্যাপারটায় খুব গুরুত্ব দিচ্ছ?
এতক্ষণে প্রণবেশ একটু হাসল।
বলল, দেখাই যাক না শ্রীমান জগদীশ কি বলে। কি জানি বাবা, আমার কিরকম ভয় করছে। বলে আমার স্ত্রী উঠে গেলেন।
.
০৩.
জগদীশের কথা
পরের দিন সকালেই জগদীশ ঘোষ এসে হাজির হলো।
আমাদের দুজনকে অ্যাটেনশান হয়ে লম্বা স্যালুট ঠুকে বেচারি বেচারি মুখে দাঁড়িয়ে রইল।
ভেবেছিলাম এইরকম নিরীহ কনস্টেবলদের চেহারা যেমন হয় অর্থাৎ কালোকোলো মোটাসোটা হেঁড়ে মাথা বয়স্ক-এরও সেরকম চেহারা হবে। কিন্তু দেখলাম তা নয়, বেশ স্বাস্থ্যবান, স্মার্ট চেহারা, বয়েসও অল্প।
প্রণবেশ বলল, তুমিই তো জগদীশ ঘোষ?
ইয়েস স্যার।
বোসো। কত দিন পুলিশের চাকরি করছ?
ন বছর পূর্ণ হয়ে পাঁচ মাস।
এখন জোড়াসাঁকোয় পোস্টেড?
ইয়েস স্যার।
এখানে কত দিন এসেছ?
দুবছর তিন মাস।
এর আগে রাতে টহল দিয়েছ কখনো?
অনেক বার।
পরশুদিন রাতে কোথায় তোমার ডিউটি ছিল?
গণেশ টকীজের কাছে নতুন বাজার এলাকায়।
সেদিন তুমি কিছু দেখেছিলে?
ইয়েস স্যার।
একটু গুছিয়ে বলল তো শুনি।
জগদীশ একটু ভেবে নিয়ে বলল, ঐ দিন রাত্রে আমি আর রাম সিং ডিউটি দিচ্ছিলাম। রাম সিং অন্য দিকে গিয়েছিল। আমি একাই বিবেকানন্দ রোডের মুখে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সব দোকানপাট বন্ধ। লোডশেডিং কিনা জানি না, রাস্তায় আলো জুলছিল না। কাছেপিঠে জনপ্রাণী ছিল না। আমার কিরকম ভয় ভয় করল। অথচ বিশ্বাস করুন স্যার, এরকম নির্জন রাতে কতবার তো ডিউটি দিয়েছি, কোনোদিন ভয় পাইনি। ভয় তো একমাত্র ডাকাতদের। তা সঙ্গে বন্দুক আছে, রাম সিং আছে। তবু কেন যেন ভয় পেলাম। মনে হলো খারাপ কিছু ঘটতে যাচ্ছে। আমি ঘাড় ফিরিয়ে এদিক-ওদিক দেখছি ঠিক তখনই দেখলাম। একটা তেরো-চোদ্দ বছরের ছেলে তরতর করে বিবেকানন্দ রোড ধরে যাচ্ছে। সে দৌড়চ্ছিল না, হাঁটছিল। কিন্তু এত জোর হাঁটা যেন মনে হচ্ছিল দৌড়চ্ছিল।
প্রণবেশ বাধা দিয়ে বলল, কোন দিক দিয়ে এল?
সেটা স্যার লক্ষ্য করিনি। টেরও পাইনি। তবে যখন বিবেকানন্দ রোড ধরে বিধান সরণী মানিকতলার দিকে এগোচ্ছিল তখন অনুমান করি সে স্ট্যান্ড রোডের দিক থেকেই আসছিল।
স্ট্র্যান্ড রোড শুনেই প্রণবেশ আমার দিকে তাকাল। ও বোঝাতে চাইল বোধ হয় স্ট্র্যান্ড রোড মানেই হাওড়ার দিক থেকে।
আমি কোনো মন্তব্য করলাম না।
তারপর?
আমি স্যার, প্রথমে ভেবেছিলাম ভিখিরিদের ছেলেটেলে হবে–যারা ফুটপাথে শোয়। কিন্তু সে যেভাবে জোরে জোরে হাঁটছিল তাতে মনে হলো সে কিছু চুরি করে পালাচ্ছে। তখনই আমি হাঁক দিয়ে দাঁড়াতে বললাম। কিন্তু সে শুনল না। ফের হাঁকড়ে উঠলাম। তবু সে ফিরেও তাকাল না। তখন
ফের বাধা দিয়ে প্রণবেশ বলল, কিরকম চেহারা ছেলেটার?
কী বলব স্যার, বললে বিশ্বাস করবেন না স্রেফ একটা নড়বড়ে কংকালের ওপর যেন চামড়া ঢাকা।
প্রণবেশ আবার আমার দিকে তাকাল।
পরনে কী ছিল?
অন্ধকারে ঠিক দেখতে পাইনি। তবে মস্ত লম্বা ঢিলে একটা ফতুয়া মতো। ড্রেসটাও স্যার অদ্ভুত।
বেশ তারপর?
দু’দুবার দাঁড়াতে বললাম। কিন্তু দাঁড়াল না দেখে রেগে ছুটে গেলাম ওর কাছে। বোধ হয় আমার জুতোর শব্দ পেয়ে ও একবারই শুধু ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকাল। স্যার, বলতে গিয়ে এখনও আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে– তার দুচোখ যেন টর্চের বাম্বের মতো জুলছিল। কোনো মানুষের দৃষ্টি ওরকম হতে পারে না। আর মুখ? স্রেফ একটা ছোট্ট মাথার খুলির ওপর চামড়া বসানো। গাল বলে কিছু নেই। যেন গালের মাংস কেউ চেঁচে তুলে নিয়েছে। কপালটা ঠেলে বেরিয়ে এসেছে।
