কিন্তু সুব্বা যে এতদিন আমাদের বাড়ি ছিল, তখন তো তান্ত্রিক আসেনি।
নিশ্চয় এসেছিল। আপনারা জানতে পারেননি।
প্রণবেশ বলল, এই জীবন্ত কংকাল কি যেখানে খুশি, যখন খুশি যেতে পারে?
অম্বুজ লাহিড়ি মাথা নাড়লেন। বললেন, না। সবসময়ে সব জায়গায় যেতে পারে না। তা যদি পারত তা হলে তো ঐ তান্ত্রিক অমিত শক্তির অধিকারী হয়ে উঠত। কংকালটাকে দিয়ে যা খুশি তাই করতে পারত। ঈশ্বর এইখানেই নিরীহ মানুষকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন।
এই বলে একটু থামলেন। তারপর হেসে বললেন, আজ উঠি। কাল দার্জিলিঙ চলে যাব। একটু কাজ আছে। বলে উঠে পড়লেন।
আমরা ওকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলাম। আমার স্ত্রী হেসে বললেন, যাক ঐ আপদটার হাত থেকে যে আমরা ঠিক সময়ে রেহাই পেয়েছি এই আমাদের ভাগ্য। যদি ট্রেনে উঠে কলকাতা পর্যন্ত ধাওয়া করে আসত তাহলে কী হতে বলুন তো!
অম্বুজ লাহিড়ি দরজার বাইরে পা রেখেছিলেন, আমার স্ত্রীর এই শেষ কথা শুনে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তিনি আমার স্ত্রীকে বোধ হয় কিছু বলার জন্যে মুখটা ফেরালেন। কিন্তু বললেন না। তবে মুখটা অস্বাভাবিক গম্ভীর দেখাল। মনে হলো যেন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত।
.
০২.
চাঞ্চল্যকর খবর
দুদিন পরে।
সকাল বেলায় প্রণবেশ এসেছে। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়ছেই। আমার স্ত্রী দু স্লাইস করে এগটোস্ট আর চা দিয়ে নিজেও বসেছে। নোটন পড়ছে পাশের ঘরে।
প্রণবেশ অনেকক্ষণ ধরে অম্বুজ লাহিড়ির গুণকীর্তন করে গেল। উনিও নাকি যথেষ্ট ক্ষমতাসম্পন্ন একজন সাধক। আমি অবশ্য এই প্রথম দেখে ততটা মুগ্ধ হতে পারিনি। একটু যেন অহংকারী বলে মনে হয়েছিল। আর খুব সাদাসিধে নয়।
বললাম, চলে যাবার সময় হঠাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে কিছু একটা বলতে গিয়েও না বলে অমন গম্ভীর মুখ করে কেন গেলেন সেটাই বুঝতে পারছি না। তোমায় কিছু বলেছেন?
প্রণবেশ মাথা নাড়ল। বলল, না। অবশ্য আমারও খটকা রয়েছে। মনে হলো বৌদি ঐ যে বললেন, সুব্বা যদি ট্রেনে উঠে কলকাতা পর্যন্ত আমাদের ধাওয়া করত তাহলে কী হতে বলুন তো? যাক খুব বেঁচে গেছি।এই কথার উত্তর দিতে গিয়েও উনি কেন চেপে গেলেন!
একথা শুনে আমার স্ত্রীর মুখটা বিবর্ণ হয়ে গেল। ভয়ে ভয়ে বললেন, সুব্বা সত্যিই এখানে এসে পড়বে না তো?
আমি জোরে হেসে বললাম, অত সহজ নয়। এটা কলকাতা শহর। ট্রাম, বাস, ট্যাক্সি রাস্তা কাঁপিয়ে ছুটছে। লোকের ভিড়। এটা কাঠমাণ্ডুর সেই নির্বান্ধব পাহাড়তলি নয়, নির্জন দেশের গ্রাম হরিদেবপুরও নয়। কেউ ওটাকে কোলে করে নিয়ে এসে হাওড়া বা শেয়ালদা স্টেশনে তুলে দিলেও সল্টলেক পর্যন্ত রাস্তা খুঁজে খুঁজে আসা সুব্বা কেন ওর প্রভু সেই তান্ত্রিকটার পক্ষেও সম্ভব নয়। তার ওপর তোমার স্বামী একজন পুলিশ অফিসার মনে রেখো। হাতের কাছে দুটো টেলিফোন। হেড কোয়ার্টারে একটা ফোন করলেই কি বল প্রণবেশ?
প্রণবেশ আজকের কাগজটা পড়ছিল। একটু হাসল। তারপরই হঠাৎ কাগজের ওপর ঝুঁকে পড়ে অস্ফুট স্বরে বলে উঠল, আরে! এ আবার কী?
বললাম, কী? রহস্যজনক খুন?
লক্ষ্য করলাম প্রণবেশের দুচোখ যেন বিস্ময়ে বড়ো হয়ে উঠছে।
খবরটা কি ছাই বলল না।
প্রণবেশ তার উত্তর না দিয়ে শুধু একটা খবরের দিকে আঙুল দেখিয়ে কাগজটা আমার হাতে দিল।
ছোট্ট খবরটা এইরম, গতকাল গভীর রাত্রে চিৎপুর রোড (রবীন্দ্র সরণী) আর বিবেকানন্দ রোডের ক্রসিং-এর মুখে প্রহরারত পুলিশ এক অদ্ভুতদর্শন ছেলেকে একা একা বিভ্রান্ত হয়ে ঘুরতে দেখে তার কাছে এগিয়ে যায়। তাকে বার বার ডাকলেও সে সাড়া দেয় না। কাছে যেতেই সে অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।
পড়তে পড়তে আমার শরীর হিম হয়ে এল। আর আমার স্ত্রী ফ্যাকাশে মুখে শুধু আমাদের দিকে তাকিয়ে রইল।
মিনিট পাঁচেক আমাদের মুখে কোনো কথা সরল না। প্রণবেশ আর আমি নিঃশব্দে সিগারেট খেতে লাগলাম।
কিছুক্ষণ পরে প্রণবেশ আমাকে বলল, কি মনে হয়?
বললাম, কনস্টেবলটি যদি বাড়িয়ে কিছু বলে না থাকে তা হলে নিঃসন্দেহে অদ্ভুত ঘটনা। অবশ্য আমার মনে হয় গুরুত্ব দেবার কিছু নেই যতক্ষণ না ঐ অদ্ভুতদর্শন কথাটা পরিষ্কারভাবে বোঝা যাচ্ছে। অদ্ভুতদর্শন বলতে পুলিশটি কী বলতে চাইছে? যদি ওটা নিছক কথার কথা হয় তাহলে nothing serious–মাথা ঘামাবার কিছু নেই। কেননা হয়তো বাইরে থেকে আসা কোনো নতুন ছেলে পথ হারিয়ে দিশেহারা হয়ে ঘুরছিল।
কিন্তু ঐ যে বারে বারে ডাকলেও সাড়া দেয়নি। কাছে যেতেই অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে অন্ধকারে মিলিয়ে যায়–কথাগুলোর মানে কি?
বললাম, ওর মানে সোজা। সম্ভবত গ্রামের ছেলে। গভীর রাত। পথ হারিয়ে দিশেহারা হয়ে ঘুরছিল। হঠাৎ পুলিশের হাঁকড়ানি শুনে এক দৌড়ে কোনো অন্ধকার গলির মধ্যে ঢুকে পড়েছিল। আর সাড়া দেয়নি? হয়তো ছেলেটা কালা। এছাড়া আর কি হতে পারে?
আমার স্ত্রী ভয়ার্ত গলায় বললেন, হ্যাঁ গো, সুব্বা নয় তো?
আমি জোরে হেসে বললাম, মাথা খারাপ নাকি? সুব্বা আসবে আমাদের গ্রাম থেকে এত দূরে কলকাতায় ট্রেনে চেপে?
সেই সন্ন্যাসীটা ওকে নিয়ে ট্রেনে করে আসতে পারে তো!
তা আসতে পারে কিন্তু আশা করি সল্টলেকে এসে পৌঁছতে পারবে না। কেননা সন্ন্যাসী ঠাকুরকে আমি ঠিকানা দিয়ে নেমন্তন্ন করে আসিনি।
