হ্যাঁ, শুনেছিলাম জুলাই-আগস্ট মাসে নেপালের পাহাড়ে পাহাড়ে অশুভ শক্তিরা ঘুরে বেড়ায় দানবের মূর্তি ধরে। তাদের সামনে পড়লে মানুষ, জীবজন্তু কারো রক্ষে থাকে না। তাই সেই দানব-দেবতাদের ভয়ংকর মূর্তি গড়ে তাদের পুজো দিয়ে সন্তুষ্ট করে সসম্মানে বিদেয় করা হয়।
ঠিকই জানেন দেখছি। তাহলে সেই দেবতার কাছ থেকে ছেলেটাকে বাঁচানো মানে দেবতার মুখ থেকে গ্রাস কেড়ে নেওয়া?
বিরক্ত হয়ে বললাম, ওসব আমি জানি না। দেবতার মুখের গ্রাস কেড়ে নেওয়াই হোক আর যাই হোক এ যুগে একটা ছেলেকে বলি দেবে তা আমরা দেখেও এড়িয়ে যাব তা হতে পারে না।
অম্বুজবাবু মৃদু হেসে বললেন, আমায় ভুল বুঝবেন না। আমি বলছি না ছেলেটাকে বাঁচিয়ে আপনারা অন্যায় করেছেন। আমি বলতে চাইছি ছেলেটাকে বাঁচাতে গিয়ে আপনারা তান্ত্রিকের কোপ-দৃষ্টিতে পড়েছিলেন। তাই কিনা?
হ্যাঁ। সে তো স্বাভাবিক। বলল প্রণবেশ।
সেই ক্রোধটা আপনাদের ওপর কিভাবে এল?
যে হোটেলে আমরা উঠেছিলাম সেই হোটেলে জং বাহাদুর নামে একটা বয় ছিল। সে বলেছিল অনেক নেপালী গরিব ছেলে ইন্ডিয়ায় চলে যায় সামান্য চাকরির লোভে। আমি তখন আমাদের বাড়ির কাজের জন্যে একটি ছেলে চেয়েছিলাম। জং বাহাদুর যে সত্যিই একটা ছেলে এনে দেবে ভাবতে পারিনি। কিন্তু তার কংকালসার চেহারা দেখে মনে হয়েছিল সে কোনো কাজই করতে পারবে না। একথা শুনে ছেলেটা তখনই এমন সব কাজ করতে লাগল যা দেখে আমরা তাজ্জব।
হ্যাঁ, সেসব আমি শুনেছি।
তখনও কি জানতাম মশাই, ওটা একটা শয়তানের বাচ্চা! আর জং বাহাদুরই সেই তান্ত্রিকের কাছ থেকে ওটাকে নিয়ে এসেছিল আমাদের সর্বনাশ করার জন্যে?
আচ্ছা, ছেলেটা কি কখনো হাসত? জোরে না হোক, মুচকে?
হাসি? আমার স্ত্রী বলে উঠলেন, ঐ মুখে হাসি ফুটবে? মুখ তো নয় একটুকরো লম্বা পোড়া কাঠ।
আচ্ছা, দৌড়-ঝাঁপ করার পর ওকে কখনও হাঁপাতে দেখেছেন?
না মশাই। ওকে যা মনে হয়েছে তা হচ্ছে ও যেন মান্ধাতার আমলের জংধরা একটা যন্ত্র।
মান্ধাতার আমলের জংধরা একটা যন্ত্র! অম্বুজবাবু নিজের মনেই কথাটা উচ্চারণ করলেন।
আচ্ছা, এর আগে আপনি বলেছিলেন ছেলেটা যেন একটা জীবন্ত কংকাল! তাই না?
আমার স্ত্রী হেসে বললেন, হ্যাঁ।
আচ্ছা, ছেলেটা নানাভাবে ভয় দেখাত না?
ভয় দেখাত কী! আমার স্ত্রী বলে উঠলেন–এক দিন সন্ধেবেলায় ও তো পেছন থেকে এসে ওঁর গলা টিপে ধরতে গিয়েছিল। তারপর–
অম্বুজবাবু বাধা দিয়ে বললেন-হা, সেসব প্রণবেশবাবুর কাছ থেকে শুনেছি। আচ্ছা, কাঠমাণ্ডুতে ঐ তান্ত্রিকের ওখানে একটা কংকাল ঝোলানো ছিল। তাই না?
হুঁ।
কিরকম বয়েসের কংকাল?
আন্দাজ চোদ্দ-পনেরো বছর বয়েসের।
এরপর একটু চুপ করে থেকে অম্বুজবাবু বললেন–শেষের দিনের ব্যাপারটা একটু গুছিয়ে বলুন তো।
আমি সব বললাম। আমার স্ত্রী আর প্রণবেশ আমার কথার ফাঁকগুলো ধরিয়ে দিচ্ছিল।
প্রণবেশ বলল, একটা জিনিস বুঝতে পারছি না মিস্টার লাহিড়ি, ঐ কংকালটার সঙ্গে সুব্বার কি কোনো সম্পর্ক ছিল?
অম্বুজ লাহিড়ি আর এক টিপ নস্যি নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, এক সময়ে আমাদের দেশের শক্তিমান কাঁপালিক, তান্ত্রিকরা একের মৃতদেহের মধ্যে অন্যের আত্মা চালনা করতে পারতেন একটা বিশেষ সময়ের জন্যে। আবার এমন তথ্যও পেয়েছি, কেউ কেউ কংকালে একটা বিশেষ সময়ের জন্যে মাংস-চামড়া সৃষ্টি করে তার মধ্যে প্রাণসঞ্চার করতে পারতেন। এই কৃত্রিম চামড়া, মাংস কংকালটাকে কোনোরকমে ঢেকে রাখতে পারত কিন্তু শরীরের যে স্বাভাবিক রূপ, লাবণ্য তা দান করতে পারত না।
এই রকম ব্যাপার আমাদের দেশের রূপকথার কোনো কোনো গল্পে আমরা পাই। এইরকম একটা গল্প ছিল, এক ডাকিনী একটা মরা বাঘের হাড়গোড় জড়ো করে মন্ত্র পড়ে প্রথমে বাঘের পূর্ণাঙ্গ কংকাল তৈরি করল। তারপর মন্ত্র পড়ে তার ওপর মাংস, তার ওপর চামড়া বসিয়ে দিল। তারপর করল প্রাণসঞ্চার। সঙ্গে সঙ্গে বাঘটা ভয়ংকর রূপ ধরে উঠে দাঁড়াল।
রূপকথার গল্প হলেও এর মধ্যে মন্ত্র-তন্ত্র সাধনার একটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়। আমার ধারণা এইরকমই কাণ্ড ঘটিয়েছিল কাঠমাণ্ডুর সেই মহাশক্তিধর তান্ত্রিক। সেই ঝুলনো কংকালটায় প্রাণসঞ্চার করে তাকে-ম্যাজিসিয়ান যেমন কাউকে হিপনোটাইজ করে যেখানে খুশি পাঠাতে পারে, তাকে দিয়ে যা খুশি তাই করাতে পারে, এই তান্ত্রিকও তেমনি ঐ কংকালটাকে জীবন্ত করে দূরে পাঠিয়ে তার অভীষ্ট কাজ সম্পন্ন করে। আপনাকে মারার জন্যে তাই সেই তান্ত্রিক কংকালটাকে–যার নাম দেওয়া হয়েছিল রাজু সুব্বা–পাঠিয়েছিল। কংকালের ওপর কৃত্রিম রক্ত, মাংস, চামড়া বসানো হয়েছিল বলে তার মুখটাকে আপনাদের পোড়া কাঠের মতো মনে হতো। কৃত্রিম সৃষ্টি বলেই তার মুখে হাসি ফুটত না। একই কারণে আপনার ওকে মনে হয়েছিল একটা মান্ধাতার আমলের জংধরা যন্ত্র বলে।
অম্বুজ লাহিড়ি একটু থামলেন। তারপর চশমাটা খুলে হাতে নিয়ে বললেন, তবে এইরকম জীবন্ত কংকালের শক্তিরও সীমা থাকে। একটা দূরত্ব পর্যন্ত যেতে পারে। তারপর আর পারে না। তাই সেই তান্ত্রিককে দেখা গেছে। আপনাকে মারার জন্যে সুদূর নেপাল থেকে আপনাদের বাড়ির বাগান পর্যন্ত ধাওয়া করে আসতো। সে এখানে না এলে অত দূর থেকে ছেলেটাকে চালনা করা সম্ভব হতো না।
