আমার তাই মনে হয়েছিল।
বিস্মিত সুরঞ্জনবাবু বললেন, চারদিন ধরে এখানে থেকে বেঁচেও যদি থাকেন গান করতে যাবেন কিসের আনন্দে?
বললাম, তা বলতে পারব না। তবে মিলিত গলায় গাইতে শুনেছিলাম।
আদিবাসী বেয়ারা দুজন আমাদের কথা শুনে বলল, হ্যাঁ সাহেবরা…ই…সাত জনা মিলে সেই তখন থেকে নেচে আর গেয়েই যাচ্ছে।
কোথায়? কোন দিকে?
পাহাড়ের ঠিক পিছন দিকে।
ওরা কি মদ খেয়ে নাচছে? জিজ্ঞেস করলাম।
আদিবাসীরা বলল, না বাবু, বোধহয় পাগল হয়ে গেছে। শুনলাম চারদিন ধরে নেচেই যাচ্ছে। এ কি কোনো মানুষ পারে?
বলেই কাঁধে দোলা তুলে নিল।
বললাম, ওদের সঙ্গে একবার দেখা করলেন না?
দেখা করে সম্ভবত আর লাভ নেই। সদরে খবর দিয়ে এসেছি। পুলিশ এলে এখানে পাঠিয়ে দেব। ওরা যা করার করবে।
[শারদীয়া ১৪১১]
জীবন্ত কঙ্কাল (অলৌকিক জল্লাদ উপন্যাসের দ্বিতীয় পর্ব)
০১.
অম্বুজ লাহিড়ির আবির্ভাব
কলকাতায় এসে ঐসব ঘটনা আত্মীয়-বন্ধু কাউকেই বলিনি। কেননা বললে তারা বিশ্বাস করবে না। উল্টে ঠাট্টা-মশকরা করবে। তারা বলবে–এই বিজ্ঞানের যুগে এইসব গাঁজাখুরি ঘটনা ঘটে নাকি?
উত্তর দিতে পারব না। তবে কিনা আমিও বিজ্ঞানের যুগের মানুষ। আর আমি কলকাতার একটি থানার দায়িত্বশীল পুলিশ অফিসার। তা ছাড়া সেইসব ঘটনার একজন সাক্ষীও আছে। সে আমারই মতো কলকাতার আর একজন পুলিশ অফিসার এবং আমার বন্ধু প্রণবেশ। সে তো আমার সঙ্গেই ছিল।
কলকাতায় ফিরে আমরা প্রথমে ঠিক করেছিলাম ঘটনাটা কাগজে বার করব। পুলিশ অফিসারদের অভিজ্ঞতা শুনে নিশ্চয়ই ছাপবে। কিন্তু পরে ভেবে দেখেছিলাম তাতে অনেকের অনেক অবান্তর প্রশ্নর উত্তর দিতে হবে। তাই মুখে কুলুপ এঁটে থাকাই স্থির করেছিলাম।
শেষ পর্যন্ত প্রণবেশই ঘটনাটা ফাস করে দিল এমন একজনের কাছে যাকে আমি চিনি না, জানি না।
প্রণবেশ একদিন বিকেল বেলায় একজন বেশ ফিটফাট ভদ্রলোককে নিয়ে আমার বাসায় এসে হাজির হলো। বয়েস বছর পঞ্চাশ। নেড়া মাথা। লাল টকটকে মুখ। চোখে সোনালী ফ্রেমের হালকা চশমা। পরনে গেরুয়া আলখাল্লা। নাম অম্বুজবরণ লাহিড়ি। থাকেন সিকিমের রাজধানী গ্যাংটকের কাছে রংপোতে।
একজন রীতিমতো বাঙালি, কিন্তু বহুকাল ধরে রংপোর মতো পাহাড়ী জায়গায় থাকেন শুনে প্রথমে অবাক হয়েছিলাম। তারপর যখন শুনলাম তিনি ঐখানে থেকে প্রেততত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করছেন তখন রংপোর মতো জায়গায় থাকার একটা কারণ খুঁজে পেলাম। আমরা জানি আজকের এই বিজ্ঞানের যুগে থেকেও হিমালয়ের কাছেপিঠে বহু তিব্বতী লামা থাকেন যারা তাদের বিশ্বাস আর ধর্মবুদ্ধি দিয়ে প্রেতচর্চা করেন এবং অশুভ আত্মাকে খুবই ভয় করেন। আর এই অশুভ আত্মার হাত থেকে বাঁচার জন্যে নানা পুঁথিপত্র পড়েন, মন্ত্রতন্ত্র উচ্চারণ করেন। বুঝতে পারলাম অম্বুজবরণ লাহিড়ি সেই কারণেই রংপোর মতো জায়গায় থেকে লামাদের কাছে ঐসব বিষয়ে জ্ঞান আহরণ করেন।
প্রণবেশ ফট করে আমাকে জিজ্ঞেস না করেই অম্বুজবাবুকে আমাদের অভিজ্ঞতার কথা ফাঁস করে দিয়েছে এটা জেনে আমার মোটেই ভালো লাগেনি। কেননা আমি ভেবে রেখেছিলাম–ঐসব ঘটনা নিয়ে আমিই বই লিখব। এখন যদি অম্বুজবাবু সব জেনে নিয়ে নিজেই আগেভাগে লিখে ফেলেন তাহলে আমার লেখার কোনো দাম থাকবে না।
আশ্চর্য! অম্বুজবাবু আমার মনের কথাটা কেমন করে যেন টের পেয়ে গেলেন। বললেন–সুশান্তবাবু, ঘটনাগুলো আমাকে সবিস্তারে বললে আপনার কোনো ক্ষতি হবে না। কেননা আমার কাজ গোপনে গবেষণা করা। বই ছাপা আমার উদ্দেশ্য নয়। আমার খ্যাতিরও দরকার নেই, টাকারও দরকার নেই।
তার এই কথা শুনে আমি শুধু অবাকই হইনি, লজ্জিতও হয়েছিলাম।
তাকে বসতে বলে স্ত্রীকে চা করতে বললাম। ইতিমধ্যে আমি গত জুলাই মাসে কাঠমাণ্ডুতে আর আমার দেশের বাড়িতে যা যা ঘটেছিল তা বলে গেলাম। দেখলাম তার অনেকটাই তিনি প্রণবেশের কাছে শুনেছেন।
চা আর সুজি নিয়ে আমার স্ত্রী হাসিমুখে এসে দাঁড়ালেন। প্রণবেশ আলাপ করিয়ে দিল।
অম্বুজবাবু হঠাৎ আমার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, দেশের বাড়িতে আপনাদের যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল সেটা আপনার কিরকম মনে হয়?
স্ত্রী বললেন, সাংঘাতিক। বাড়িতে কাজের জন্যে নেপাল থেকে উনি একটি দুর্ভিক্ষপীড়িতর মতো ছেলেকে নিয়ে এলেন আর সেই ছেলেই ভেল্কি দেখাল। আমি অবশ্য কিছুদিনের জন্যে বাপের বাড়ি গিয়েছিলাম, সেই সময়ে খালি বাড়িতে নাকি নানারকম ভয়ের কাণ্ড ঘটেছিল।
ছেলেটার কি যেন নাম ছিল?
আমার স্ত্রী বললেন, রাজু সুব্বা।
আচ্ছা, তার গায়ে কখনো হাত দিয়েছিলেন?
গায়ে হাত দেওয়া মানে মারা বলছেন?
না-না, কখনো ছুঁয়েছিলেন?
ম্যাগো! যা ডিগডিগে চেহারা, ছুঁতে ঘেন্না করত। মনে হতো যেন একটা জ্যান্ত কংকাল।
জ্যান্ত কংকাল। অম্বুজবাবু কথাটা নিজের মনে উচ্চারণ করলেন।
ধন্যবাদ। আপনাকে আর কিছু জিজ্ঞেস করার নেই।
আমার স্ত্রী ভেতরে চলে গেলেন।
চায়ের পেয়ালায় শেষ চুমুক দিয়ে অম্বুজবাবু বললেন, সুশান্তবাবু, ব্যাপারটার ওপর আমার যথেষ্ট কৌতূহল আছে বলেই আপনাকে কয়েকটি প্রশ্ন করব।
হ্যাঁ, হা, করুন না। তবে ঐ অপ্রীতিকর প্রসঙ্গটা আর মনে আনতেও ইচ্ছে করে না।
অম্বুজবাবু জামার পকেট থেকে মোষের শিঙের তৈরি নস্যির ডিবে বার করে এক টিপ নস্যি নিয়ে বললেন, কাঠমাণ্ডুতে বিষ্ণুমতীর তীরে এক তান্ত্রিক একটি ছেলেকে বলি দিতে যাচ্ছিল, আপনি আর আপনার বন্ধু দুজনে মিলে ছেলেটিকে বাঁচান। বলি দিচ্ছিল ঘণ্টাকর্ণের সামনে। আপনারা কি জানতেন নেপালীদের কাছে ঘণ্টাকর্ণ কী ভয়ংকর দেবতা?
