আমরা সেই গাঢ় কুয়াশার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চললাম। কোথায় কোন ঘরে বা বারান্দার দিকে চলেছি বুঝতে পারলাম না।
এক সময়ে সুরঞ্জনবাবুকে সতর্ক করার উদ্দেশ্যে তার হাতটা ধরতে গিয়ে যখন তার অস্তিত্বটাই টের পেলাম না তখনই বুঝলাম আমরা দুজনে দুদিকে ছিটকে পড়েছি। আর এই সময় গলা তুলে ডাকতে সাহস পেলাম না। নিঃশব্দেই এগিয়ে চললাম।
হাত দিয়ে দেওয়াল ছুঁতে গিয়ে বুঝলাম অন্য একটা ঘরে আমি ঢুকে পড়েছি। আর এই ঘরে ঢোকামাত্র কুয়াশা কোথায় চলে গেল। আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম।
একবার এদিক ওদিক তাকিয়ে সুরঞ্জনবাবুকে খোঁজবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু কোথাও তার কোনো চিহ্ন পেলাম না।
আমি গলার স্বর উঁচু করে ডাকলাম, সুরঞ্জনবাবু! পাথরের দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে আমার কণ্ঠস্বর বাতাসে মিলিয়ে গেল।
ভয় পেলাম। কোথায় গেল মানুষটা?
আমি ঘরের দক্ষিণ দিকের অলিন্দে এসে দাঁড়ালাম। নীচে নিস্তব্ধ বনভূমির মধ্যে থেকে অনেক মিলিত কণ্ঠের অস্পষ্ট গান শোনা গেল। কিন্তু কাউকে দেখা গেল না। অবাক হলাম। এখানে কারা গান করছে?
কালো পাথরের মোটা একটা থামের পাশ দিয়ে পাক খেয়ে সরু একটা বারান্দা আরও ভেতরে চলে গেছে। সুরঞ্জনবাবুকে খুঁজে বার করবার জন্য সেই পথ ধরে ভেতরের দিকে চললাম। এখানেও একটা ঘর। তবে খুবই ছোটো। ভেতরে ঢুকতেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। দেখলাম মেঝের ওপর স্তূপ করে রাখা হয়েছে একরাশ মোটা মোটা সাদা মোমবাতি।
এমনভাবে মোমবাতিগুলো পড়ে আছে যেন মনে হচ্ছে এই মাত্র কেউ মোমগুলো তৈরি করছিল, হঠাৎ লুকিয়ে পড়েছে। লুকিয়ে পড়েছে কাছেই কোথাও।
কয়েক মুহূর্তের জন্যে আমি বুদ্ধিভ্রষ্ট হয়ে পড়লাম।
এত মোম কে তৈরি করছিল? কেন করছিল?
তখনই মনে পড়ল সেদিন গভীর রাতে হোটেল থেকে এই প্রাসাদের অলিন্দে অলিন্দে আলো জ্বলতে দেখেছিলাম বটে। এখন দেখছি সে আলো মোমের আলো। আর এইখানেই তার সৃষ্টি। এত বড়ো গড়কে আলোকসজ্জায় সাজাতে কম বাতি লাগে না জানি, তা বলে এত বাতি!
কিন্তু..যাক সে কথা। প্রশ্ন এখন কে এই বাতি তৈরি করছিল? শহর জনপদ থেকে দূরে এই পরিত্যক্ত নির্জন প্রাসাদে নিশ্চয় কোনো সাধারণ মানুষ একদিনে এত মোম তৈরি করতে পারে না। এখানের স্থায়ী বাসিন্দা ছাড়া কোনো একজনের পক্ষে এত মোম তৈরি করা সম্ভব নয়। তিনি যিনিই হন এতক্ষণ একমনে সেই কাজটিই করছিলেন। হঠাৎ অবাঞ্ছিত বাধা এসে পড়ায় তিনি আত্মগোপন করেছেন। আত্মগোপন করার জন্য তিনি বেশি দূরে সরে যেতে পারেননি। কাছেই কোথাও অন্ধকারে ঘাপটি মেরে আছেন। যে কোনো মূহুর্তে ঘাড়ের ওপর লাফিয়ে পড়তে পারেন।
এ কথা মনে হতেই আমার সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। আমি তাড়াতাড়ি দরজার দিকে দুপা পিছিয়ে এলাম। আর তখনই খুব কাছে শব্দ হল-ফোঁস!
চমকে উঠলাম!
না, সাপের গর্জন নয়, কোনো জন্তুরও চাপা রোষ নয়–এ যেন কোনো অপার্থিব জীবের ক্রুদ্ধ শ্বাসক্রিয়া! কাছে, খুব কাছে।….
আমি প্রাণভয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। তারপর ছুটতে লাগলাম। ছুটছি …..ছুটছি…. ছুটছি–
ঠিক কোন দিকে যাচ্ছি জানি না। একমাত্র লক্ষ্য এই গড় থেকে বেরিয়ে যাবার পথ খোঁজা। সরু বারান্দা। প্রত্যেকটা বারান্দার শেষে একটা করে ঘর।
হঠাৎ একটা ঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়লাম। কে একজন বন্ধ দরজার গায়ে ঠেসান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
এগিয়ে যেতেই চমকে উঠলাম–সুরঞ্জনবাবু!
সুরঞ্জনবাবু সাড়া দিলেন না। কেমন একরকমভাবে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
এ আবার কী! আমি দু হাতে ধরে তাকে নাড়া দিলাম, সুরঞ্জনবাবু!
এতক্ষণে যেন চমক ভাল তার। দু চোখ লাল। কপালের একটা শির ফুলে উঠেছে। বোঝাই যায় প্রচণ্ড মানসিক চাপে শিরটা ফুলে উঠেছে। আমার দিকে তাকালেন।
জিগ্যেস করলাম, কী হয়েছে?
উনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত রুগির মতো বিকৃত স্বরে শুধু উচ্চারণ করলেন, যুবরাজ
কোথায়?
উনি হাত দিয়ে বন্ধ দরজাটা দেখিয়ে দিলেন। আমি বুঝলাম এ নিশ্চয় মানসিক বিকার। নইলে কতকাল আগের সেই ছেদী রাজপরিবারের হতভাগ্য যুবরাজ, তিনি কী করে থাকবেন ঐ ঘরে? জীবিত তো নয়ই মৃত অবস্থাতেও থাকা সম্ভব নয়। তা হলে কী দেখে সুরঞ্জনবাবুর মতো লোক বলতে পারছেন যুবরাজ পাশের ঘরেই আছেন!
এক ধাক্কায় খুলে ফেললাম শালগাছের কাঠ দিয়ে তৈরি দরজা। ছোট্ট ঘর–যেন কয়েদখানা। একটা পুরনো ভাঙা খাট। তারই সামনে থকথক করছে তাজা রক্ত। আর কিছু নেই।
কোথায় যুবরাজ? আমি সুরঞ্জনবাবুর গা ধরে ঝাঁকানি দিলাম।
উনি রক্ত দেখিয়ে বললেন, ঐ তো। ঐ তো উপুড় হয়ে পড়ে আছেন।
ভুল, ভুল। শুধু চোখেরই ভুল নয়, মনেরও ভুল।
সুরঞ্জনবাবু তখনও অপ্রকৃতিস্থ। সেই অবস্থায় তাকে ধরে ধরে কোনোরকমে বাইরে নিয়ে এলাম।
বাইরে বেরোতেই সুরঞ্জনবাবু যেন সুস্থ হয়ে উঠলেন।
খুব বেঁচে গেলাম, সোমেশ্বরবাবু।
আমিও।
এবার তাড়াতাড়ি ফেরার পালা।
আদিবাসী বেয়ারারা প্রস্তুত হয়েই ছিল। দোলায় ওঠবার আগে সুরঞ্জনবাবুকে বললাম, কিন্তু যে উদ্দেশ্যে আমাদের আসা, ভিরাবাগুদের দেখা পেলেন?
সুরঞ্জনবাবু মাথা নাড়লেন।
না।
বললাম, তবে প্রাসাদের মধ্যে থেকেও অনেক নীচে আমি মিলিত কণ্ঠে গান শুনেছি। অস্পষ্ট। মনে হচ্ছিল যেন ওঁদেরই গলা।
গান! ওরা গাইছিল?
