বললাম, ওখানে রাত্তিরে থাকার ব্যবস্থা আছে?
আমার বোকার মতো কথা শুনে উনি একটু হাসলেন। বললেন, আমি কখনও ওখানে যাইনি। যাবার দরকারও হয়নি। তবে স্মিথের ডায়েরি তো আপনি পড়েছেন। সেখানে কোথায় কীভাবে যুবরাজ বা স্মিথ নিজে রাত্রিবাস করেছিলেন সেইটুকু থেকে যা জানা যায়।
বললাম, ওখানে পৌঁছে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে ফিরতে কত সময়ে লাগতে পারে?
সুরঞ্জনবাবু বললেন, ঘোড়ার চেপে গেলেও ফিরতে ফিরতে সন্ধে হয়ে যাবে। তারপর অন্ধকারে এগোনো যায় না। তবে ভোরবেলায় বেরিয়ে গেলে সন্ধের মুখে ফেরা সম্ভব।
জিগ্যেস করলাম, আপনার কি ধারণা ওনারা ঐখানেই গেছেন?
ধারণা নয়। জানতে পেরেছি মিস্টার ভিরাবাগু শুধু নিজের সঙ্গীদের নিয়েই নয়, কয়েকজন আদিবাসীদেরও মোটা টাকার লোভ দেখিয়ে সঙ্গে নিয়ে গেছেন।
এ খবর আপনি কার থেকে পেলেন?
আদিবাসী পাড়া থেকে। বলে চিন্তায় যেন ভেঙে পড়লেন।
কিছুক্ষণ পর সুরঞ্জনবাবু বললেন, এই যে আমার হোটেল থেকে চারজন মানুষ তার সঙ্গে কয়েকজন আদিবাসী উধাও হয়ে গেল, এর জন্যে পরে হয়তো আমাকেই জবাবদিহি করতে হবে।
তা হলে?
এখন কী কর্তব্য তাই ভাবছি।
বললাম, আমার মনে হয় দু-এক দিনের মধ্যেই ওঁরা ফিরে আসবেন।
সুরঞ্জনবাবু ঈষৎ বিরক্ত হয়ে বললেন, ঐ জায়গা সম্বন্ধে বাস্তবে আপনার কোনো ধারণা নেই বলেই এতটা নিশ্চিন্ত হয়ে এ কথা বলতে পারছেন। কিন্তু আমি বলছি জেনে রাখুন, ওদের একজনও ফিরবে না। ফেরবার হলে প্রথমদিনেই কিংবা তার পরের দিন ফিরে আসত।
এতক্ষণে বিপদের গুরুত্ব বুঝতে পারলাম। বললাম, তা হলে?
সুরঞ্জনবাবু বললেন, সব জেনে সব বুঝে আমি হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারি না। ভাবছি কাল ভোরেই আমি ওখানে চলে যাব। তারপর যা থাকে কপালে।
আপনি একলা যাবেন!
তা ছাড়া নিশ্চিত বিপদের মুখে কাকে টানব?
বললাম, ঠিক আছে সুরঞ্জনবাবু, আমি আপনার সঙ্গে যাব।
সুরঞ্জনবাবু কিছুক্ষণ অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, সোমেশ্বরবাবু, আপনি কি ভালো করে ভেবে বলছেন?
হ্যাঁ। একেবারে মনস্থির করে বলছি। তবে আমার মনে হয় সব ব্যাপারটা সদরে জানিয়ে রাখা আপনার কর্তব্য।
সুরঞ্জনবাবু বললেন, আমি কালই খবর পাঠাচ্ছি।
.
অভিশপ্ত গড়
এই অঞ্চলে আদিবাসীরা পাল্কির মতো দোলায় এক-একজন লোক চাপিয়ে দৌড়তে দৌড়তে দূর পথ পার হয়ে যায়। এরা এতই গরিব আর এতই অল্পে তুষ্ট যে, এই দোলায় নিয়ে যাবার জন্যে যে পারিশ্রমিক চায় তা নিতান্তই সামান্য।
আমরা দুজনে দুটো দোলায় চেপে ভোরবেলায় রওনা হয়ে সেই পাহাড়ের নীচে যখন পৌঁছলাম বেলা তখন বারোটা বেজে কুড়ি মিনিট।
চারিদিক নিস্তব্ধ। মাঝে মাঝে জোর বাতাস বইছে। সেই বাতাসের ঝাঁপটায় গাছের পাতা খসে পড়ছে টুপটাপ। আশ্চর্য, পাতা খসার শব্দটুকু ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। এত গভীর জঙ্গলেও পাখির ডাক শুনতে পেলাম না। বেঁজি যদিও বা দু-চারটে চোখে পড়ছে তাও তারা যেন সদাত্রস্ত। এত ভয় কিসের ভয় কে জানে!
দোলার বাহকদের প্রচুর জলযোগের ব্যবস্থা করে আমরা পাহাড়ে উঠতে লাগলাম। যতই উঠতে লাগলাম ততই স্মিথ সাহেবের ডায়েরির কথা মনে পড়তে লাগল। তাতে জঙ্গলে ঢাকা পাহাড়ের যে বর্ণনা পড়েছিলাম হুবহু মিলে যাচ্ছে। অথচ সে আজ কত বচ্ছর আগের লেখা।
আমার আগে আগে কখনও হেট হয়ে, কখনও দু জানুর ওপর ভর দিয়ে, কখনও বা হামাগুড়ি দিয়ে উঠছেন সুরঞ্জনবাবু। আমি ঠিক তার পিছনে।
পাহাড়ে ওঠা সুরঞ্জনবাবুর অভিজ্ঞতা আছে কিনা জানি না। আমার যা আছে তা দেওঘরের নন্দন পাহাড়, বড়োজোর গিরিডির খ্রিস্টানহিল পর্যন্ত। কিন্তু এ পাহাড় একেবারে অন্য জাতের। একেবারে বুনো পাহাড়। সময়ে সময়ে গাছের শেকড় পর্যন্ত ধরে উঠতে হচ্ছে।
উঠছি আর একবার করে মাথা তুলে দেখছি আরও কতটা উঠতে হবে। কিন্তু সুরঞ্জনবাবু। একমনে উঠেই যাচ্ছেন। মাঝে মাঝে সতর্কভাবে এপাশ ওপাশ দেখছেন পাছে কোনো বুনো জন্তুর সামনে পড়ে যান। এতক্ষণ যে তেমন কোনো জন্তু-জানোয়ারের মুখোমুখি হইনি এটাই আশ্চর্য।
প্রায় ঘণ্টাখানেক পর আমরা পাহাড়ের ওপর উঠলাম। না, নিতান্ত ছোটো পাহাড় নয়।
একবার চারিদিক তাকিয়ে দেখলাম কেমন যেন খাঁ খাঁ করছে। সামনেই কালো পাথরের গড়টা তর্জনী তুলে যেন আমাদের সাবধান করে দিচ্ছে।
গড়টা প্রায় গোটা পাহাড় জুড়ে। সামনের দিকটা অক্ষত। কিন্তু স্মিথ সাহেব বর্ণিত সিংহদ্বার দিয়ে দুপা ভেতরে যেতেই দেখা গেল পিছনের দিকটা ভেঙে ঝুলছে।
অনুমান করলাম গুপ্তধন যদি সত্যিই কোথাও থাকে তা হলে ঐ ভাঙা অংশের দিকটাতেই আছে। আর মিস্টার ভিরাবাগুর দলবলকে যদি খুঁজতে হয় তাহলে ঐ দিকেই।
সিংহদ্বারের মধ্যে দিয়ে আমরা দুজনে এগিয়ে চললাম। কয়েক পা যেতেই হঠাৎ টেম্পারেচারটা যেন হু হু করে নেমে গেল। অবাক হয়ে গেলাম। এত ঠান্ডা! মনে পড়ল। স্মিথও তার ডায়েরিতে এইরকম শীতের কথা লিখেছিলেন। প্রকৃতির কোন খেয়ালিপনায় হঠাৎ জলবায়ুর এই পরিবর্তন তা আমরা বুঝে উঠতে পারলাম না। এই মুহূর্তে এমন একটি প্রাচীন গড়ে এসে ঢুকেছি যে গড়ের পাথরে পাথরে তাপমাত্রার বৈশিষ্ট্য আমাদের জ্ঞানের বাইরে। শুধু তাপমাত্রার বৈশিষ্ট্যই নয়, সামনের হলঘরটার মধ্যে ঢুকতেই যে কী করে রাশি রাশি কুয়াশা চারিদিকের অলিন্দ ঘুলঘুলির মধ্যে দিয়ে আমাদের ঢেকে ফেলল তাও আমাদের জ্ঞানের বাইরে।
