এ সব ব্যাপারে সাক্ষ্য প্রমাণ থাকে না। কে কী কারণে এই রকম অদ্ভুত আচরণ করল তারও সঠিক উত্তর পাওয়া যায় না। হয় চোখ-কান বুজে বিশ্বাস করতে হয়, নতুবা উড়িয়ে দিতে হয়।
আমি বিশ্বাস করতে চাই না। কিন্তু উড়িয়ে দিতেও পারি না।
আমি প্রথম দিনের ঘটনা সুরঞ্জনবাবুকে বলিনি। কিন্তু দ্বিতীয়বার যে ঘটনা ঘটল তা সুরঞ্জনবাবুকে জানাতেই হবে। কারণ এখন বুঝতে পারছি আমার এই দশ নম্বর ঘরটি আর নিরাপদ নয়।
কোন অশরীরী আত্মা সেদিন কেন আমার হাত চেপে ধরেছিল এ যেমন জানা শক্ত তেমনি জানা শক্ত এই ঘরের মধ্যেই কার ছায়ামূর্তি সারারাত আস্তানা গেড়ে ছিল। এ বাড়ি বা এই ঘরের সঙ্গে এই দুটি ঘটনার কী যোগসূত্র–কে তা বলতে পারে? তবে এটা স্থির বুঝেছি এই ঘরে আমার থাকা আর মোটেই নিরাপদ নয়।
পরের দিনই আমি সুরঞ্জনবাবুকে সব কথা বললাম। শুনে সুরঞ্জনবাবু কিছুক্ষণ গুম হয়ে রইলেন। তারপর বললেন, প্রথম দিনের ব্যাপারটা আমায় আগেই বলা উচিত ছিল।
তার গলার স্বরে আমার ওপর বিরক্তি ঝরে পড়ছিল। কথার ধরনটা যেন কেমন!
আমি ক্ষুব্ধ হলাম। পাল্টা বিরক্তি প্রকাশ করে বললাম, আপনাকে বলেই বা কী হত? আপনি কি বলতে পারতেন আমার হাতটা যে চেপে ধরেছিল সে কে ছিল? কিংবা এখনই বলুন না যে ছায়ামূর্তিটি ভোরবেলায় আর ঘরে বসে ছিল সে কে?
সুরঞ্জনবাবু কোনোরকম উত্তেজনা প্রকাশ না করে শুধু মাথা নাড়লেন। বললেন, না, এ দুটো ঘটনার কোনো একটির সম্বন্ধেও আমি কিছুই বলতে পারব না। তবু এটা ঠিক, আমি এখানে বহু দিন থাকার সুবাদে এই অঞ্চলের অনেক কিছুই জানা আছে। এই বাড়িতে এর আগেও এইরকম আরো ঘটনা ঘটেছে যা প্রচার হলে হোটেলে কেউ থাকতে সাহস করবে না। যেমন আপনি আর ও ঘরে থাকতে চাইছেন না–এ কথাটা জানাবার জন্যেই সাত-সকালে নেমে এসেছেন আমার সঙ্গে দেখা করতে। ঠিক কিনা?
সলজ্জভাবে স্বীকার করলাম। বললাম, ও ঘরে থাকাটা আমার পক্ষে এখন আর নিরাপদ নয়।
তা হলে?
আমাকে অন্য একটা ঘর দিন।
সুরঞ্জনবাবু ঠোঁটের ফাঁকে হাসলেন। বললেন দিতে পারি। কিন্তু ভেবে দেখেছেন কি যে ঘরটার জন্যে মিস্টার ভিরাবার সঙ্গে এত অশান্তি হয়ে গেল, আজ আপনি স্বেচ্ছায় সে ঘর ছেড়ে দিচ্ছেন দেখে সব ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে যাবে না? শেষ পর্যন্ত ভূতের ভয়ে আপনি ঘর ছাড়লেন, এটা প্রচার হলে আপনার সম্মান থাকবে?
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম, কিন্তু ঐ ঘরে থাকা কি আর সম্ভব?
সুরঞ্জনবাবু বললেন, খুব সম্ভব। বেশ কদিন তো ঐ ঘরেই রইলেন। তেমন কোনো অসুবিধে হয়েছে কি? তবে বাকি যে কটা দিন এখানে থাকবেন ভাবছেন সে কটা দিন চোখ বুজে ভগবানের নাম করে কাটিয়ে দিন। দেখবেন বিপদ আপনার ধারে কাছে ঘেঁষতে পারবে না।
সুরঞ্জনবাবুর পরামর্শ ভালোই লাগল। সত্যিই আজই যদি দশ নম্বর ঘরটা ছেড়ে দিয়ে অন্য ঘরে চলে যাই তা হলে ভিরাবাগু আর তার দলবল যে হাসবে। ভূতের ভয়ে জীবনে কখনও করিনি। আর সবচেয়ে মজার কথা হচ্ছে আজ বাদে কাল যখন কলকাতায় ফিরে যাবো তখন সেই চিরপরিচিত আলো, পাখা, টিভি আর ক্রমাগত ট্রামবাসের যান্ত্রিক শব্দের মধ্যে বসে সুদূর ছত্রিশগড়ের কোনো এক অখ্যাত জায়গায় কয়েকদিনের এই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার কথা মনেই পড়বে না।
কাজেই ঘর বদলাবার কথা চিন্তা না করে মনে সাহস নিয়ে ঐ দশ নম্বরেই থেকে গেলাম।
.
এর পর কয়েকটা দিন উত্তর দিকে তাকাইনি। ভুলতে চেষ্টা করেছিলাম সেই রহস্যময় দুর্গের কথা। এদিকে গত দুদিন মিস্টার ভিরাবাগুদের গলা শুনতে পাচ্ছি না। তারা এখানে আছেন কি না তাও সঠিক জানি না–জানতে ইচ্ছেও করে না।
এরই মধ্যে অন্যমনস্ক থাকার জন্যে একদিন বস্তার জেলার যুবক-যুবতীদের করমা নৃত্য দেখে এলাম। করমা দেবীকে খুশি করার জন্যেই আদিবাসীরা এই নাচ-গানের অনুষ্ঠান করে। সঙ্গে থাকে মাদল, বঁঝ আর ঢোল। বেশ কয়েকঘণ্টা আনন্দে কেটে যায়।
ও অঞ্চলে একদিন রাউৎ নাচ উৎসবও দেখলাম। আমাদের পশ্চিম বাংলায় যাদের গোয়ালা বলে রাউৎ হচ্ছে সেই জাত। এরা গোসেবা করে। দুধ দই বিক্রি করে। এই রাউত্রা নিজেদের শ্রীকৃষ্ণের বংশধর বলে মনে করে। আর গোবর্ধনের পুজো করে।
এমনি ভাবে তিন-চারদিন কেটে গেল। বেশ ভুলেই গিয়েছিলাম অলৌকিক ব্যাপারগুলোর কথা।
কিন্তু হঠাৎ সেদিন ঘটল একটা কাণ্ড। সক্কালবেলাতেই সুরঞ্জনবাবু হন্তদন্ত হয়ে আমার ঘরে এসে হাজির।
জিগ্যেস করলাম কী ব্যাপার? হঠাৎ এইভাবে?
সুরঞ্জনবাবু বললেন, খুব মুশকিলে পড়েছি সোমেশ্বরবাবু। আজ চারদিন হল মিস্টার ভিরাবাগু বা তার সঙ্গীদের কোনো খবর নেই।
অবাক হয়ে বললাম, সে কী। চারদিন কোনো খবর নেই। আমিও ওদের কদিন না দেখে অবাক হচ্ছিলাম। কোথায় গেছেন কিছু বলে যাননি?
সুরঞ্জনবাবু বললেন, অনেকেই বলে যান না। আমি নিজে থেকে জিগ্যেস করি না। তবে এইসব অজানা অচেনা জায়গায় আমাকে একটু বলে গেলে ভালো হয়। এ সাধারণ জ্ঞানটুকুও অনেকের থাকে না।
বললাম, চারদিন আগে মিস্টার ভিরাবাগু কখন বেরিয়েছিলেন?
সুরঞ্জনবাবু বললেন, কদিন থেকেই ভিরাবাগু বলছিলেন পাহাড়ের ওপর ঐ পুরনো গড়টা দেখতে যাবেন। তা আমি নিষেধ করেছিলাম। উনি কিন্তু গুরুত্ব দেননি। তারপর ঐদিন সকাল সকাল খেয়ে ওঁরা বেরিয়ে গেলেন। ইচ্ছে করেই জিগ্যেস করিনি কোথায় যাচ্ছেন। তবে আমি নিশ্চিত যে উনি সদলবলে ঐ পাহাড়টাতেই গেছেন। তার পর থেকে এখনও ফেরেননি।
