বললাম, তা ঠিক।
তা হলে বুঝতে পারছেন জায়গাটা বিপজ্জনক কী কারণে?
বললাম, একটা জিনিস আমার কাছে এখনও স্পষ্ট নয়–
আমার কথা চাপা দিয়ে সুরঞ্জনবাবু বললেন, বুঝেছি। জানতে চাইছেন যে প্রেতকায়াকে স্মিথ দেখেছিলেন সেটা কার? রাজভাণ্ডারের কল্পিত অশরীরী রক্ষকের, না যুবরাজের?
বললাম, ওটার মীমাংসার জন্যে আমার আগ্রহ নেই। আমার কৌতূহল পাথরের ছাদ চুঁইয়ে রক্ত পড়া বা দেওয়ালে রক্তমাখা হাতের ছাপ কার?
সুরঞ্জনবাবু বললেন, ওটার উত্তর আমিও খুঁজে পাইনি। পরে আর কেউ সেরকম কিছু দেখেছিলেন কিনা জানা নেই। মনে রাখতে হবে ভৌতিক ব্যাপারটাই তো রহস্যময়। তাই না?
আমি কিছুক্ষণ পরে জিগ্যেস করলাম, বলতে পারেন স্মিথ কোথায় মারা গিয়েছিলেন?
সুরঞ্জনবাবু বললেন, সঠিক বলতে পারব না। তবে ডায়েরিটা নাকি পাওয়া গিয়েছিল পাহাড়ের ওপর ঐ গড়েই।
বললাম, তা হলে তো বোঝাই যাচ্ছে ঐ গড়ের তীব্র আকর্ষণে স্মিথ বারে বারে ছুটে গিয়েছিলেন। তারপর আলোর পোকার মতো ওখানেই একদিন শেষ হয়ে যান।
সুরঞ্জনবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, হয় তো তাই।
একটু থেমে বললেন, তাই আমি বলি দূর পাহাড়ের ওপর ঐ কেল্লার মায়াবী আকর্ষণে যে ছুটে যাবে তাকে মরতেই হবে।
একটু অবাক হয়ে বললাম, আচ্ছা, সুরঞ্জনবাবু, পাথরের তৈরি ভাঙাচোরা একটা কেল্লা সত্যিই হাতছানি দিয়ে মরণডাক ডাকে?
সুরঞ্জনবাবু একটু হাসলেন। ঠাট্টা করে বললেন, আপনিও তো দেখছি মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। ও সব চিন্তা ছাড়ন। কাল আদিবাসীদের একটা বড়ো পরব আছে। আমি ঘোড়ার ব্যবস্থা করব। কাল চলুন, দেখে আসি।
সুরঞ্জনবাবুর আন্তরিক প্রস্তাব আমার কানে গেল না। বললাম, আচ্ছা আমার পাশের ঘরের বন্ধুদের সাড়া পাচ্ছি না তো।
সুরঞ্জনবাবু বললেন, ওঁরা কখন যে কোথায় যান আমায় বলে যান না। অথচ আমায় একটু জানিয়ে যাওয়া উচিত। হাজার হোক অপরিচিত জায়গা তো।
ওরা কজন আছেন?
পাঁচজন।
সবাই বাঙালি?
হ্যাঁ। সেটাই ভাবনার।
জিগ্যেস করলাম, কেন?
বেশি গভীর জঙ্গলে গিয়ে পথ হারালে বাংলা ভাষায় জিগ্যেস করলে কোনো ফল পাওয়া যাবে না।
সুরঞ্জনবাবু নীচে চলে যাবার অল্পক্ষণ পর সিঁড়িতে ভারী জুতোর শব্দ শুনে বুঝতে পারলাম আমার প্রতিবেশী বন্ধুরা সদলবলেই ফিরল, তবে বেশ ভদ্রভাবে।
তালা খোলার শব্দ পেলাম পর পর তিনটে ঘরে। তারপর জানলা খোলার শব্দ। তারপর একটা ঘরে গেলাস ভাঙার শব্দ…তারপর সব শান্ত–সব স্তব্ধ।
আমিও ঘুমিয়ে পড়লাম।
অনেক রাতে হঠাৎ আমার ঘুমটা ভেঙে গেল। দূরে কোথায় যেন ঘোড়ার খুরের শব্দ আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ এখানে ঘোড়ার খুরের শব্দ এল কোথা থেকে ভাবতে গিয়ে মনে পড়ল আজই সন্ধেবেলা সুরঞ্জনবাবু আদিবাসীদের পরব দেখতে যাবার জন্যে ঘোড়ার ব্যবস্থা করে রাখবেন বলেছিলেন।
তিনি ভালো কথাই বলেছিলেন, কিন্তু একজন পুরোদস্তুর শহরবাসী যে কোনোদিন ঘোড়ায় চড়েনি সে এই জঙ্গল-পাহাড়ের রাস্তায় কীভাবে ঘোড়া চালাবে সেই অসম্ভব, অবাস্তব ব্যাপারটা বোধহয় ঘুমিয়ে পড়ার আগে পর্যন্ত মাথায় ঘুরছিল। তারই ফলে স্বপ্নের মধ্যে ঘোড়ার খুরের শব্দ শুনেছি।
ঘুম ভাঙতেই দেখলাম উত্তর দিকের জানলা দিয়ে একরাশ চাঁদের আলো এসে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েছে। এখানে এসে, এমন চাঁদের আলো দেখতে পাব আশা করিনি। ধীর মন্থর পায়ে উঠে বেরিয়ে এলাম। এই আমার সেই প্রিয় বারান্দা। শুধু আমারই প্রিয় তা নয়, এই হোটেলে যেই আসে আগেই সে দাবি করে বসে এই দশ নম্বর ঘরটা–ঐ বারান্দাটুকুর লোভে। আমি ভাগ্যবান তাই এই বারান্দা সংলগ্ন ঘরটা আমিই পেয়েছি।
কৃষ্ণপক্ষের নিস্তব্ধ রাতে চাঁদ যেন দু হাতে করে মুঠো মুঠো জ্যোৎস্না ছড়িয়ে দিয়েছে গাছগাছালির পাতায় পাতায় আর আমাদের এই হোটেলের বারান্দায় বারান্দায়। যে ভাগ্যবান সেই দেখতে পায়।
আমি এদিক-ওদিক দেখতে দেখতে হঠাৎ উত্তর দিকে ফিরতেই স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। একদিন আমেরিকার উদ্দেশে পাড়ি দিচ্ছিল বিশাল টাইটানিক জাহাজ। অতলান্ত আটলান্টিকের বুকে গভীর রাতে চলতে চলতে মায়াবী জ্যোৎস্নায় ঢাকা মহাসাগরের বুক ফুঁড়ে হঠাৎ বিপুলাকার হিমশৈলকে একেবারে জাহাজের সামনে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জাহাজের ওয়্যারলেসে অপারেটর জ্যাক ফিলিস যেমন হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন, আমিও তেমনি জ্যোৎস্নার আলোয় হোটেলের একেবারে সামনে সেই দুর্গ-প্রাসাদটাকে দেখে ভয়ে বিহ্বল হয়ে গেলাম।
এই নিয়ে দুবার ওটাকে এত কাছ থেকে দেখতে পেলাম। কিন্তু তা মুহূর্তের জন্যে। অল্প পরেই সেটা অদৃশ্য হয়ে গেল।
তারপরেও কতক্ষণ খোলা বারান্দায় আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম খেয়াল ছিল না। এক সময়ে হুঁশ হল। রাত বোধহয় তখন তিনটে। আমি ধীরে ধীরে ঘরে এসে ঢুকলাম আর সঙ্গে সঙ্গেই মনে হল কিছু একটা যেন ঘর থেকে বেরিয়ে আমার গা ঘেঁষে ছুটে বারান্দার পাঁচিলের দিকে গেল। তারপর পাঁচিলে উঠে শূন্যে ঝাঁপ দিল।…..
আমি কাঁপতে কাঁপতে বিছানায় বসে পড়লাম।
.
মৃত্যুর হাতছানি
এবার নিয়ে দুবার হল এই হোটেলে আমার দশ নম্বর ঘরে ভয়ের ব্যাপার ঘটল। প্রথমবার সেই প্রথম দিনের সন্ধ্যাবেলায় ঘরে ঢুকতে গিয়ে শেকলে হাত দিতেই আমার হাতের ওপর অদৃশ্য হাতের চাপ। আর এদিন ভোর রাত্রে আমারই ঘরের মধ্যে ছায়ামূর্তির আবির্ভাব। সন্দেহের অবকাশ নেই বিন্দুমাত্র–সেই ছায়ামূর্তিটি আমার গা ঘেঁষে বেরিয়ে গিয়েছিল। তার পর দোতলার পাঁচিল থেকে ঝাঁপ দিয়েছিল।
