প্রাসাদের ভগ্ন অংশটা বারবার দেখে আমি স্থিরনিশ্চয় হলাম যে, এই অংশটি কোনো এক সময়ে তোপ দেগে ভাঙা হয়েছে। আর এর কারণ–বহু দিন থেকে চলে আসা জনশ্রুতি এই প্রাসাদের কোনো অংশে রাজ-ঐশ্বর্য লুকানো আছে। আর এই রকম রাজ-ঐশ্বর্য যেখানেই গোপনে সঞ্চিত থাকে সেখানেই তার এক মহাশক্তিধর রক্ষকও নিযুক্ত থাকে। এ বিশ্বাস ভারতেও প্রচলিত আছে।
এই ডায়েরি যখন থেকে আমি লিখছি, তখন থেকে কোনো একদিনের জন্যেও সেই রক্ষককে আমি চাক্ষুষ দেখতে পাইনি। সেটা বড়ো আশ্চর্য লাগে। আরও কথা এই যে…
এরপর ডায়েরির কিছু অংশ নষ্ট হয়ে গিয়েছে। তারপর যে অংশ শুরু হয়েছে তাতে স্মিথ সাহেব দেখাচ্ছেন রাজপ্রাসাদে যুবরাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র দানা বেঁধে উঠেছে। আর স্মিথ যথাসম্ভব নিজেকে গোপন রেখে যুবরাজকে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন।
কদিন পর রাজপ্রাসাদের মধ্যেই বিপক্ষ দলের সঙ্গে যুবরাজের দলের যুদ্ধ বেধে গেল। যুদ্ধে পরাজিত যুবরাজ কোনোরকেম প্রাণ হাতে করে রাজপ্রাসাদ ছাড়লেন। সঙ্গে বিশ্বস্ত বন্ধুর মতো রইলেন একটি মাত্র মানুষ–স্মিথ।
স্মিথ রাতের অন্ধকারে যুবরাজের হাত ধরে ভয়াবহ অরণ্য অতিক্রম করে তাকে এনে তুললেন পাহাড়ের ওপরের সেই পাথরের ভাঙা দুর্গে। যুবরাজকে বোঝালেন–এই পরিত্যক্ত জায়গায় জনমানব ঢোকে না। তোমার পক্ষে এইটেই একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়। আমি রোজ একবার করে এখানে লুকিয়ে আসব। তোমার খাবার দিয়ে যাব। একা হলেও ভয় পেও না। এখানে অন্তত একজন প্রচণ্ড শক্তিধর রক্ষক আছে বলে আমি বিশ্বাস করি যে গুপ্ত রাজ-ঐশ্বর্য পাহারা দেয়। তাকে চোখে দেখা যায় না। কিন্তু সে আছে। বিপদে তার কাছে আত্মসমর্পণ কোরো।
যুবরাজ একটি কথাও বলেননি। তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিলেন।
মাটিতেই একটা চাদর পেতে যুবরাজ শুয়ে থাকেন।
তৃতীয় দিন স্মিথ যুবরাজের সঙ্গে দেখা করতে এসে থমকে গেলেন। দেখলেন যুবরাজের মুখে কে যেন কালি ঢেলে দিয়েছে। তিনি জানতে চাইলেন যুবরাজ কি অসুস্থ?
তার উত্তরে যুবরাজ সভয়ে জানালেন যে গত রাতে তিনি যখন ঘুমোচ্ছিলেন তখন তার গায়ে কয়েক ফোঁটা রক্ত ওপর থেকে পড়ে। তাজা রক্ত।…রক্ত কোথা থেকে এল সকালে উঠেও তার তল্লাশ করতে পারেননি। তবে পাথরের দেওয়ালে স্মিথ নিজের চোখে অনেকগুলো রক্তমাখা হাতের ছাপ দেখেছেন যা আগে কোনোদিন দেখেননি। স্মিথ স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। রক্তর ফোঁটা কেমন করে পড়ল পাথরের ছাদ থেকে? পাথরের দেওয়ালে রক্তমাখা অতবড়ো হাতের ছাপই বা কার?
এবার স্মিথকে যুবরাজ ছাড়লেন না। তার কাছে কাছেই থাকতে অনুরোধ করলেন। স্মিথ থেকে গেলেন। সারা দিন প্রাসাদের ছাদ, প্রত্যেকটি ঘর, অলিগলি ভালো করে পরীক্ষা করে দেখলেন। কিন্তু কোনো মানুষের অস্তিত্ব খুঁজে পেলেন না। তার ধারণা ছিল এই প্রাসাদে নিশ্চয় গুপ্তধন আছে। আর তা পাহারা দেবার জন্যে মহাশক্তিসম্পন্ন কোনো অশরীরী আত্মা নিযুক্ত আছে। আজ এই রক্ত দেখে সেই ধারণা বদ্ধমূল হল। এমনকি যুবরাজের ঘরে রক্তমাখা হাতের ছাপ দেখে তার এমনও মনে হল কোনো অশুভ ঘটনা খুব তাড়াতাড়ি ঘটতে চলেছে।
ঘটনাটা ঘটল সেই রাত্তিরেই। হঠাৎ অন্ধকার অরণ্যের বুক বিদীর্ণ করে জ্বলে উঠল কয়েকশো মশাল। শত্রুপক্ষ হন্যে হয়ে কদিন ধরে খুঁজে বেড়াচ্ছিল যুবরাজকে। তারপরে কী করে যেন ওরা খোঁজ পেল যুবরাজের। তারপরেই
ঘটনাটা ঘটে গেল স্মিথের সামনেই। এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে আত্মরক্ষার জন্যে অন্ধকারে গা ঢাকা দিলেন স্মিথ।
–ডায়েরি প্রায় এখানেই শেষ। তার পরে যেটুকু আছে তার বেশির ভাগ জায়গাই পোকায় কাটা। তবু তা থেকে যেটুকু উদ্ধার করা সম্ভব হল তা এইরকম–
স্মিথ লিখছেন, যদিও আমি রাজবাড়ির লোকেদের দৃষ্টি এড়িয়ে সেই রাতে অনেক দূরে পালিয়ে এসেছিলাম, এবং পরে একটি নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছিলাম, তবুও মাঝে মাঝে গভীর রাতে পাহাড়ের ওপর সেই গড়ে যেতাম। কী যে এক অসাধারণ শক্তি আমাকে তীব্রভাবে আকর্ষণ করত তা লিখে বোঝানো যাবে না।
গভীর রাতে সেই কালো পাথরে তৈরি প্রাসাদের সিংহদ্বার অতিক্রম করে ভেতরে ঢুকতেই দেখতে পেতাম একটা অস্পষ্ট ছায়ামূর্তি সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে আছে।
কে সে আমি আজও জানি না। সে কি যুবরাজের প্রেতাত্মা, না গুপ্ত রাজভাণ্ডারের একমাত্র বিশ্বস্ত প্রহরী?
ভয়ে আমার হাত-পা হিম হয়ে যায়। তাড়াতাড়ি পালিয়ে আসি। কিন্তু –।
কিন্তু দুদিন পর আবার যাই। আবার তার দেখা পাই….
আর লিখতে পারি না। মনে হয় ঐখানেই একদিন আমার মৃত্যু হবে। কারণ ঐ তীব্র আকর্ষণ মৃত্যুর হাতছানি ছাড়া আর কিছু নয়…..।
.
জ্যোৎস্না রাতের অলৌকিক মায়া
দুটি কাজ আমি নির্বিঘ্নে শেষ করেছি। একটি ডায়েরিটা পড়ে ফেলা। আর একটি দুর্গম দুর্গের ভিতরে ঢোকার সাংকেতিক চিহ্ন আঁকা কার্ডটি পার্টিশানের ফাঁক দিয়ে পাশের ঘরে নিঃশব্দে ফেলে দেওয়া। ছকটা নিশ্চয় ভিরাবার চোখে পড়েছে। কিন্তু সেটা পেয়ে তার মনে যে কী প্রতিক্রিয়া হয়েছে তা আমি এখনও টের পাইনি।
সুরঞ্জনবাবুকে ডায়েরিটি ফেরত দেবার সময়ে উনি আমাকে জিগ্যেস করলেন, সব কথাই আপনি তো জানতে পারলেন। বোধহয় এর চেয়ে ভালো করে আমি আপনাকে কিছু বলতে পারতাম না।
