এর মধ্যে শুধু আছে একটা দুর্গম পাহাড়ের ওপর কালো রঙের বিরাট একটা দুর্গের কথা–যে দুর্গের মধ্যে প্রাণভয়ে গোপনে আশ্রয় নিয়েছিলেন ছেদী রাজবংশের যুবরাজ। যুবরাজ যাতে সিংহাসনে বসতে না পারেন তার জন্যেই ছেদী বংশের অন্য শরিকরা তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেন। যুবরাজ যে শেষ পর্যন্ত পাহাড়ের ওপর পাথরের ঐ পরিত্যক্ত ভাঙা দুর্গে ঢুকে লুকিয়ে থাকবেন এটা কেউ ভাবতে পারেনি। ভাবতে পেরেছিলেন শুধু মিস্টার স্মিথ। নিতান্ত অপ্রত্যাশিত ভাবে যুবরাজের সঙ্গে কোনো শুভ মুহূর্তে তাঁর বন্ধুত্ব হয়েছিল। সে বিবরণটাও তিনি ডায়েরিতে লিখে গেছেন। তবে তা খুব সংক্ষেপে, একটা কাহিনির খসড়া হিসেবে। কাহিনিটি এইরকম–
ইংরেজরা তখন ভারতবর্ষে একচেটিয়া ব্যবসা চালাবার জন্যে দেশ জুড়ে কুঠি স্থাপনের নেশায় মেতে উঠেছে। ১৬১১ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ গোলকুণ্ডা রাজ্যের অন্তর্গত মুসুলিপট বন্দরে কুঠি স্থাপন করেন। কয়েক বছর পরে তারা পুলিকটের উত্তরে আসাগাঁও এ কুঠি নির্মাণ করে। ১৬৩৯ খ্রিস্টাব্দে বিজয়নগরের অন্যতম উত্তরাধিকারী চন্দ্রগিরির রাজার কাছ থেকে জমি নিয়ে ইংরেজরা বর্তমান মাদ্রাজ শহরে Fort St. George নামে নতুন বাণিজ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে।
এইরকম সময়ে স্মিথ কয়েকজন ইংরেজ ব্যবসায়ীর সঙ্গে মধ্যপ্রদেশের নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ান। উদ্দেশ্য কোন জায়গার কোন কৃষিজাত দ্রব্য নিয়ে ব্যবসা করলে প্রচুর টাকা উপার্জন হতে পারে তার খোঁজখবর নেওয়া।
একদিন এক ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যাবার সময়ে একটা বিষধর সাপ স্মিথকে তাড়া করে। স্মিথ তাড়াতাড়ি গাছে উঠে পড়েন। স্মিথ যদি একবার চিৎকার করে উঠতেন তাহলে তার দুর্ভাগ্য এত দূর গড়াত না। কিন্তু সামান্য সাপের তাড়া খেয়ে একজন ইংরেজ যুবক ভয়ে চেঁচিয়ে উঠবে স্মিথ তা ভাবতেই পারে নি। ফলে অনেকক্ষণ পরে সাপটা চোখের আড়ালে চলে গেলে স্মিথ যখন গাছ থেকে নেমে এলেন তখন তার সঙ্গীরা অনেক দূর চলে গেছেন। স্মিথ যে সঙ্গে নেই তা সঙ্গীরা খেয়াল করেননি। গভীর অরণ্যমধ্যে পরস্পরের কাছ থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেন।
বিপদের ওপর বিপদ, পথ হারিয়ে স্মিথ যখন উদ্ভ্রান্তের মতো জঙ্গলের পথে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তখন হঠাৎ তিনি একদল দেশীয় শিকারীর খপ্পরে পড়েন। সেই অরণ্যচারী পাহাড়ী শিকারিরা এরকম কটা চুল, নীলচে চোখ, সাদা চামড়ার মানুষ এর আগে কখনও দেখেনি। ওরা ওঁকে বন্দি করে বেঁধে নিয়ে এল রাজবাড়িতে।
স্মিথের সুন্দর চেহারা দেখে রাজবাড়ির লোকেরা তার ওপর অত্যাচার না করে আলাদা একটা ঘরে রেখে দিল। তাদের কাছ থেকে বেশ আদরযত্ন পেলেন স্মিথ। তবে চিড়িয়াখানায় নতুন কোনো জন্তু এলে লোকে যেমন খাঁচার বাইরে থেকে অবাক হয়ে দেখে, রাজবাড়ির লোকরাও বিদেশি স্মিথকে তেমনিভাবে জাল ঘেরা ঘরের বাইরে থেকে দেখতে লাগল।
এই রাজবাড়ির যুবরাজ (স্মিথ তার ডায়েরিতে নাম দেননি) ছিলেন একটু অন্য ধরনের মানুষ। ভূগোল, ইতিহাস সম্ভবমতো পড়ে তিনি বিদেশের খবর কিছু কিছু রাখতেন। একমাত্র তিনিই ঘরের মধ্যে ঢুকে স্মিথের সঙ্গে আকারে-ইঙ্গিতে কথা বলতেন। এইভাবে দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়ে গেল।
[ এরপর অনেকগুলো পাতা নেই। ]….
এই যুবরাজ যখন বুঝলেন স্মিথ শত্রু নন, তখন তিনি-ই দরজার আগল খুলে দিলেন। ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিলেন স্মিথ এখন থেকে রাজবাড়ির বাইরেও ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়াতে পারেন। খোঁজ করতে পারেন তার অন্য সঙ্গীদের। যদি তাদের দেখা পান তা হলে তাদের সঙ্গে চলে যেতে পারেন। যদি দেখা না হয় রাজবাড়িতেই স্বচ্ছন্দে ফিরে আসতে পারেন।
সেই মতো স্মিথ সারা দিন দূরে দূরে জঙ্গলে ঘুরতেন। ঘুরতে ঘুরতে একদিন তিনি অদ্ভুত গড় বা দুর্গ দেখতে পেলেন। একটা পাহাড়ের ওপর কেল্লাটা। পাহাড়টা ছোটো হলেও জঙ্গলে ঢাকা।
একদিন তাড়াতাড়ি দুপুরের খাওয়া সেরে, একটা ঝকঝকে ফলা বসানো বর্শা হাতে স্মিথ সেই পাহাড়ের নীচে এসে দাঁড়ালেন। সেই যে সেদিন তাঁকে সাপে তাড়া করেছিল, সেই থেকে তার সাপে খুব ভয়। বর্শার ফলা দিয়ে ঝোপ-জঙ্গল পরিষ্কার করতে করতে তিনি কোনো রকমে পাহাড়ে উঠে গড়ের সিংহদ্বারের সামনে এসে দাঁড়ালেন।
নামেই সিংহদ্বার। সত্যিই একদিন পাথরে তৈরি বিরাট সিংহদ্বার ছিল। কিন্তু আজ তার ভগ্নদশা। শুধু সিংহদ্বারটাই নয়–সেই বিশাল প্রাসাদপুরীর একদিকটা একেবারে কে যেন ভেঙে ফেলে দিয়েছে।
কেন?
ডায়েরির এক জায়গায় যা লেখা বাংলায় অনুবাদ করে পাঠকদের উদ্দেশে তা লিপিবদ্ধ করি–
..আমি যখন সিংহদ্বার পেরিয়ে প্রাসাদের ভেতরে প্রবেশ করলাম তখন কেন যেন আমার সমস্ত শরীরের মধ্যে দিয়ে বিদ্যুত্তরঙ্গ খেলে গেল। অজানা ভয়ে আমার গা শিউরে উঠল। অথচ তখনও পর্যন্ত একমাত্র সাপের ভয় ছাড়া অন্য কোনো ভয়ের মুখোমুখি হইনি। প্রাসাদের ঘরগুলি অত্যন্ত ঠান্ডা ছিল। আমার মনে হচ্ছিল হিমশীতল পরিবেশ ছাড়া অস্বাভাবিক নিস্তব্ধতাই আমার বুকের ধুকপুকানি বাড়িয়ে দিচ্ছিল। আমার এও মনে হচ্ছিল এমন নিস্তব্ধতা বুঝি পৃথিবীর আর কোনো জায়গায় নেই। আর এইরকম অন্ধকার নিস্তব্ধ জায়গাতেই মানুষকে নিশ্চিন্তে গোপনে হত্যা করা সহজ হয়।…
