আমি বললাম, তাতে আমাদের কী লাভ?
সুরঞ্জনবাবু বললেন, ভিরাবাগু এখনও জানেন না কেল্লার ঐ সাংকেতিক কার্ডটা তার কাছে নেই। ওটা হঠাৎ পড়ে থাকতে দেখলে নিশ্চয় ঘাবড়ে যাবেন। মনে করবেন এটা কোনো অলৌকিক ব্যাপার। বলেই তিনি সাবধানে চলে গেলেন। যাতে ভিরাবার সামনে পড়ে না যান।
সুরঞ্জনবাবু চলে যেতেই আমার মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। এখন সবে সন্ধে সাড়ে সাতটা। রাত দশটার আগে ঘুমনো যায় না। তা হলে এই দীর্ঘ সময় কী করব?
একবার ভাবলাম এখন দোতলায় কেউ নেই। এই সুযোগে যদি নকশাটা পর্টিশানের ফাঁক দিয়ে চুপি চুপি চালান করে দেওয়া যায় তাহলে একটা বড়ো কাজ হয়।
এই কথা ভেবে আমি ঘরের আলো নিভিয়ে একটা টর্চ নিয়ে পার্টিশানের গায়ে কোথায় চিড়টা আছে, খুঁজতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পরেই চিড়টা আবিষ্কার করলাম। এইবার বাকি কাজটুকু খুবই সহজ। তবু
তবু নকশাটা হাতে নিয়েও তখনই পার্টিশানের মধ্যে দিয়ে গলাতে গিয়ে হাত কেঁপে উঠল। ভাবলাম কার্ডটা নিরাপদে ন নম্বরে চালান করে দিলেও ঘরে ঢুকেই আকস্মিক ভাবে ওটা পড়ে থাকতে দেখলে সাহেব যে ক্ষেপে যাবে তাতে সন্দেহ নেই। আর সেই রাগটা এই রাত্তিরে কার ওপর যে অঘটন ঘটাবে ভেবে আমি রীতিমতো ভয় পেয়ে গেলাম।
কী করব ভাবছি এমনি সময়ে বাইরে গাড়ির শব্দ শুনলাম। বুঝলাম ওনারা এলেন।
এলেন তো বটেই কিন্তু একটা হোটেলে ঐভাবে যে কেউ আসতে পারে তো ভাবা যায় না।
শুধু বুটপরা মিলিত পায়ের শব্দই নয়, সেই সঙ্গে মিলিত গলায় অদ্ভুত সুরে ইংরিজি বাংলা মেশানো গান গাইতে গাইতে সিঁড়ি বেয়ে ক্রমশ উপরে উঠে আসতে লাগল। আমি তাড়াতাড়ি আলো জ্বেলে ঘরে খিল লাগিয়ে বসে রইলাম।
গানের কথা মাথামুণ্ডু কিছু বুঝতে পারছিলাম না। হেঁড়ে গলায় মিলিত সুর থেকে মাঝে মাঝে যে কয়েকটা কথা কানে আসছিল তা এইরকম….Let us enjoy……পরোয়া করি না কাউকে ভাই…….we dont sleep….ঘুমাতে দেব না কাউকে……হিপ হিপ হুর রে!….
উন্মত্তের মতো গান করতে করতে ওরা যখন আমার ঘরের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল তখন এক এক লাইন গাইবার সঙ্গে সঙ্গে আমার দরজায় প্রতি জনে বুট পরা পায়ে জোরে লাথি মেরে যাচ্ছিল। এ যে কীরকম ভদ্রতা তা বুঝে উঠতে পারলাম না। তা হলে এরা তো দরজা ভেঙে ঢুকে আমায় শেষ করে দিতেও পারে।
অতটা অবশ্য ওরা করল না। ঘরের মধ্যে ঢুকে ওরা বোধহয় হাত ধরাধরি করে নাচতে নাচতে গানটা পুরোপুরি গাইল। গানটা এইরকম–
Let us dear friends, let us enjoy.
পরোয়া করি না কাউকে ভাই,
করি নাকো ভয়।
We dont sleep-sleep at all.
ঘুমোতে দেব না কাউকে জেনো
গেলো শুধু ব্রান্ডি আর জল।
হিপ হিপ হুর রে!
হিপ হিপ হুর রে!
আনন্দে মেতেছি আমরা।
আনন্দের গাহি জয়।
আনন্দ করতে জানে যারা
আনন্দেতেই রয়।
Let us enjoy.
এমন স্বর্গীয় সংগীত কার রচনা জানি না, এ গান লেখার উদ্দেশ্য কী তাও জানি না। উদ্দেশ্য যেটা প্রধান তা হচ্ছে আমাকে সব রকমে বিরক্ত করা। আমার ঘুমের মাথা চিবিয়ে খাওয়া।
বেশ, তাই হোক। আমি ঘরের আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম।..
তারপর কখন ওদের নাচগান থেমেছিল জানি না, কিন্তু যখন আমার ঘুম ভাঙল তখন গোটা দোতলাটা শান্ত, নিস্তব্ধ।
এরকম মাঝরাতে আমার বড়ো একটা ঘুম ভাঙে না। কিন্তু হঠাৎ আজ কেন ভাঙল ভাবতে ভাবতে আমি অন্ধকার ঘরের চারিদিক দেখতে লাগলাম।
না, অন্য দিনের মতোই সব ঠিকঠাক। আমার ঘরের জানলাগুলো রাত্তিরেও খোলা থাকে। হঠাৎ উত্তর দিকের জানলাটার ওপর নজর পড়ল। চমকে উঠলাম। উঠে বসলাম। ভালো করে চোখ রগড়ে দেখলামনা, ভুল দেখছি না।
অনেক দূরে শাল, সেগুন আর অর্জুন গাছের অরণ্যের ঘন কালো অন্ধকারের মাথার ওপর অনেকগুলো আলো টিপ্ টি করে জ্বলছে। মনে হচ্ছে যেন ঘোর অমাবস্যায় দেওয়ালির রাতে অজস্র প্রদীপ জ্বলছে।
অবাক হয়ে তাড়াতাড়ি দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়ালাম। আবারও মনে হল, না চোখের ভুল নয়। সত্যিই পাহাড়ের ওপর সেই ভাঙা গড়ের অলিন্দে অলিন্দে কে আলো জ্বেলে রেখেছে।
কিন্তু ঐ জনশূন্য অন্ধকার পাহাড়-দুর্গে এই গভীর রাতে কারা প্রদীপ জ্বেলে রাখল? কেন জ্বালল?
আমি স্তম্ভিত হয়ে দেখতে লাগলাম। এই আলোর মালা কি আমার পথের দিশারী?
হঠাৎ আলোগুলি প্রায় একসঙ্গেই নিভে গেল। সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিক থেকে হু হু করে একটা দমকা বাতাস সবেগে বয়ে এসে হোটেল বাড়িটার ওপর আছড়ে পড়ল। আমি ছুটে গিয়ে ঘরের মধ্যে আশ্রয় নিলাম।
.
স্মিথের ডায়েরি
তুলোট কাগজের ওপর হাতে লেখা পাণ্ডুলিপিটি পড়তে আমার মাত্র এক ঘণ্টা পনেরো মিনিট লাগল। অবশ্য আমাকে খুব সাবধানে পড়তে হয়েছিল, যাতে পুরনো কাগজ মুড়মুড় করে ভেঙে না যায়। বেশ কয়েকটি পাতার লেখা অস্পষ্ট হয়ে গেছিল। অনেক জায়গায় আবার পোকায় কেটে দেওয়ায় লেখা পরিষ্কার পড়াও যাচ্ছিল না।
একটা জিনিস বুঝতে পারছিলাম, স্মিথ সাহেব শুয়ে বসে আরাম করে চা চুরুট খেতে খেতে বই লেখেননি। রুদ্ধশ্বাস বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে যা যা রোমাঞ্চকর ঘটনা স্বচক্ষে দেখেছিলেন শুধু সেগুলোই নোট করেছিলেন। এমনও হয়েছে কোনো কোনো লাইন শেষ করতেও পারেননি। ফলে বক্তব্য পরিষ্কার হয়নি।
আরও একটা ব্যাপার–কোন সময়ে ঘটনা ঘটছে সেই সাল-তারিখের কোনো উল্লেখ নেই। নেই কোনো রাজার নাম। এমনকি যে যুবরাজকে হত্যা করা হল তার নামেরও কোনো উল্লেখ নেই। কাজেই এরকম ডায়েরির কোনো ঐতিহাসিক মূল্যই নেই।
