তা হলে আমি কী করব?
সুরঞ্জনবাবু বললেন, একমাত্র উপায় আপনি যদি ঘরটা ছেড়ে দেন। মনে হয় তা হলেই উৎপাত থামবে। কিন্তু আমি বলব আরও একটু ধৈর্য ধরে থাকুন। ওরা থেমে যাবেই। ঘরটা ছেড়ে দিলে ওদেরই জিৎ হবে।
বললাম, ঘর আমি ছাড়ব না।
খুব ভালো। তা ছাড়া আমি যা ভেবেছিলাম তাই ঘটতে চলেছে। খুব সম্ভবত ওরা দু-একদিনের মধ্যে ঐ দুর্গের দিকে যাবে। আমি অবশ্য ওদের নিষেধ করব। শোনা না শোনা তাদের মর্জি।
কিন্তু কেন নিষেধ করবেন কাল আপনার কাছ থেকে শোনা হয়নি।
সুরঞ্জনবাবু বললেন, যদি আজ সময় পাই তা হলে বলব।
বিকেলের দিকে ওরা হৈচৈ করে কোথায় বেরিয়ে গেল। নিশ্চয়ই এই অবেলায় গড়ের দিকে যাবে না।
তা হলে?
জাহান্নমে যাক আর যেখানেই যাক ওরা যতক্ষণ না থাকে ততক্ষণ আমার মঙ্গল।
রোদ একটু পড়ে এলে আমি খোলা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। তারপর উৎসুক নেত্রে তাকিয়ে রইলাম উত্তর দিকে–যদি সেই ভয়ংকর গড়টা দেখা যায়। কিন্তু অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও দেখা গেল না। তারপর সন্ধ্যার মুখে যখন ঘরে ঢোকবার জন্যে পা বাড়িয়েছি তখন হঠাৎই উত্তর দিকে আকাশের গায়ে পাহাড়ের ওপর কষ্টিপাথরের মতো কালো গড়টা ভেসে উঠল। কিন্তু মাত্র কয়েক মুহূর্তের জন্য। তারপরেই অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
ঐটুকু দেখেই আমি খুশি হলাম বটে কিন্তু গতকালের মতো ওটা এগিয়ে এল না তো।
আমি ধীরে ধীরে ঘরে এসে ঢুকলাম বটে কিন্তু সেই অলৌকিক গড়টা বারে বারে দেখার জন্য, মনটা ছটফট করতে লাগল।
.
অন্ধকার পাহাড়ে দেওয়ালি?
সন্ধের পর ঘরে একলা মুখ বুজে কী করব ভেবে যখন কুল পাচ্ছি না তখন মনে পড়ল সুরঞ্জনবাবু বলেছিলেন আজ সন্ধ্যায় উনি আসবার চেষ্টা করবেন। উনি এলে সময় কাটাবার কোনো অসুবিধে হবে না। কিন্তু উনি আজ আসবেন কী?
ভাবতে ভাবতেই দরজায় মুদু শব্দে কড়া নড়ে উঠল। আমি দরজা খুলে দিলাম।
ওর ঠোঁটে ভদ্রতাসূচক এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।
ভাবছিলেন তো বুঝি এলাম না?
হাসলাম। বললাম, আসলে আপনার সঙ্গটুকু পাবার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।
ধন্যবাদ। বলে একটু হাসলেন। তারপর বললেন, দুদিন তো কেটে গেলে। আদিবাসীদের উৎসব কবে কোনটে দেখবেন ঠিক করলেন কিছু?
অন্যমনস্কভাবে আমি মাথা নাড়লাম।
সুরঞ্জনবাবু একটু যেন অবাক হয়ে বললেন, এখানকার উৎসবগুলো দেখবার টানেই তো আপনি এখানে এসেছেন।
বললাম, ঠিকই বলেছেন। কিন্তু কষ্টিপাথরের মতো কালো দুর্গটি আর ছেদী রাজবংশের সেই হতভাগ্য যুবরাজ এখন আমার মনকে আচ্ছন্ন করে আছে। আপনি ভাবতে পারবেন না সুরঞ্জনবাবু, ওই কালো দুৰ্গটা কীভাবে আমাকে টানছে।
সুরঞ্জনবাবু বললেন, তাই বলে ভুলেও যেন ঐ দিকে যাবেন না। তা হলে আর বেঁচে ফিরতে হবে না।
হ্যাঁ, এইরকম একটা বিপদের কথা আপনি সেদিন বলেছিলেন বটে।
না, সেদিন বলার সুযোগ পাইনি। আজও সুযোগ নেই। এখনই হয়তো মিস্টার ভিরাবা সদলবলে এসে পড়বেন। আপনার সঙ্গে গল্প করছি দেখলে মোটেই খুশি হবেন না। আর উনি বিরক্ত হলে আমাদেরও শান্তিতে থাকতে দেবেন না।
উনি বিরক্ত হবেন? কেন?
সুরঞ্জনবাবু হাসলেন একটু। বললেন, এই ঘরটা নিয়ে আপনি আমি দুজনেই ওঁদের শত্রুপক্ষ হয়ে গেছি। আর এই সব শিক্ষিত ভদ্রলোকেরা তাদের শত্রুপক্ষকে টাইট দেবার জন্যে অনেক কিছুই করতে পারেন। অথচ আমরা দুজনে ঠেকাতে পারব না।
একটু থেমে বললেন, শুনুন, আমার মুখ থেকে শোনার চেয়ে এই পাতলা বইটা চুপচাপ পড়ে ফেলবেন। অনেক সত্য ঘটনা জানতে পারবেন। তবে দেখবেন বইটা যেন অন্য কারও চোখে না পড়ে। বলে খবরের কাগজে মলাট দেওয়া একটা চটি বই আমার হাতে দিলেন।
পাতা উল্টে আমি তো অবাক। ইংরিজিতে লেখা বই। বহু পুরনো। তাও ছাপা নয়। হাতে লেখা। পুঁথির মতো। তুলোট কাগজের মতো পুরু কাগজে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা। বহু জায়গা পোকায় কাটা।
এই বই আপনি কোথায় পেলেন?
বাবার দেওয়াল-আলমারিতে ছিল। সম্ভবত রতনলালকাকু বাবার কাছে রাখতে দিয়েছিলেন। ঐ দুর্গে যে রাতে যুবরাজকে হত্যা করা হয় সে সময়ে একজন ইংরেজ ওখানে গোপনে ঢুকে পড়েছিলেন। আড়ালে, লুকিয়ে লুকিয়ে স্মিথ সাহেব যা কিছু দেখেছিলেন তা নোট করে নিয়েছিলেন। স্মিথ সাহেবের সেই সব নোট নিয়েই এই ডায়েরি। নিন রাখুন। যদি সম্ভব হয় আজ রাত্তিরেই পড়ে ফেলে কাল সকালে আমায় ফেরত দেবেন।
তা না হয় দিলাম, কিন্তু সেই যে সেদিন সন্ধেবেলা শেকল খুলতে গিয়ে আমার হাতের ওপর অন্য এক অদৃশ্য হাতের চাপ পড়েছিল সে কথা তো ভুলতে পারছি না। তাই সুরঞ্জনবাবুকে বলে ফেললাম, আচ্ছা, আমায় একটা কথা বলুন তো, ঐ কেল্লা আর এই হোটেলবাড়ি এ দু-এর মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে কি?
আছে বৈকি। তবে এখন বলতে পারব না। এইটেও আপনি রাখুন। বলে তাসের মতো পুরু রঙিন ছক কাটা একটা কার্ড আমার হাতে দিলেন।
বুঝতেই পারছেন এটা একটা নকশা যেটা ভিরাবার পকেট থেকে পড়ে গিয়েছিল।
এটা ওঁকে দেননি?
না, হাতে হাতে ফেরত দিলে সাহেব বুঝে নেবে আমি ব্যাপারটা জেনে গেছি। তাই দিইনি। এখন অনুগ্রহ করে আপনি এটা সাহেবকে গোপনে দেবার ব্যবস্থা করুন।
ওঁর কথা শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। বললাম, আমি কেমন করে দেব?
সে ব্যবস্থা আছে। ন নম্বর আর দশ নম্বর ঘরের মধ্যে দেখুন কাঠের পার্টিশান। ঐ ঘরে ভিরাবাগু থাকেন। কাঠের পার্টিশানের মধ্যে খুব সূক্ষ্ম ফাঁক আছে। খুঁজলেই দেখতে পাবেন। যখন ঘরে কেউ থাকবে না তখন ঐ ফাঁক দিয়ে কার্ডটা জোরে ঠেলে দেবেন। কার্ডটা হয় ওদের বিছানায় নয় মাটিতে পড়ে থাকবে। ভিরাবাগু ভাবতেই পারবেন না আপনি ওটা ফেলেছেন।
