কীরকম বিপদ একটু বলবেন?
জবাব দেবার আগে উনি একবার ঘড়ির দিকে তাকালেন। বললেন, রাত নটা বাজতে চলল এখনও সাহেবের দেখা নেই। তারপরই আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে যাচ্ছিলেন এমনি সময়ে গাড়ির শব্দ শোনা গেল। উনি সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ওই ওনারা এসে পড়েছেন। আজ আর কথা বলা যাবে না। বলেই উঠে পড়লেন।
.
মিস্টার ভিরাবাগুর রাগ
সুরঞ্জনবাবু চলে যেতেই আমি সিঁড়ির দরজায় খিল দিলাম। হোটেলের ছোকরাটি, কী যেন নাম? হ্যাঁ, মহেন্দ্র সেনাপতি, রাতের খাবার দিয়ে গিয়েছিল। রুটি, আলুর দম আর বাটিভর্তি মাংস। তাড়াতাড়ি খেয়ে নিলাম।
খাওয়া শেষ হলে সন্ধেবেলার কথা মনে পড়তেই আমার কীরকম ভয় করতে লাগল। একা ঘরে রাত কাটানো! আমি এমনিতে মোটেই ভীতু নই। কিন্তু আজ যে ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা হয়েছিল তা তো কোনোদিন ভুলতে পারব না।
আমি ঠিক করলাম যত তাড়াতাড়ি মশারি টাঙিয়ে ঘুমিয়ে পড়া যায় ততই ভালো।
ভাবা মাত্র ঘরের দরজায় খিল দিয়ে মশারি টাঙিয়ে শুয়ে পড়লাম।
সবে ঘুম এসেছে এমনি সময়ে পাশের ঘরে হৈ হট্টগোল শুনে ঘুম ছুটে গেল। প্রথমে কিছুক্ষণ লাগল ব্যাপারটা বুঝে নিতে। তারপর যখন টের পেলাম পাশের ঘরে লোক এসেছে, আর তারা ওই মিস্টার ভিরাবাগু ও তার দলবল তখন রাগে আমার মাথা পর্যন্ত গরম হয়ে উঠল। বড়োলোক বলে কি এটুকু বিবেচনা করবে না যে পাশের ঘরে একজন ঘুমোচ্ছে? ইচ্ছে করছিল চেঁচিয়ে ধমকে উঠি। কিন্তু আমার ভদ্রতায় বাধল। তা ছাড়া এই রাত্তিরে চেঁচামেচি করলে অশান্তিই বাড়বে। বিশেষ যখন ওরা দলে ভারী।
ভাবতে ভাবতে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম।
সকালে উঠে চা খেয়ে বারান্দায় বেরিয়ে এসে দেখলাম পাশের রুমগুলো বন্ধ। বুঝলাম অনেক রাত পর্যন্ত দাপাদাপি করে তারা এখনও ঘুমোচ্ছে।
আমি আরও কিছুক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে সেই কালো কেল্লাটা দেখবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু দেখতে পেলাম না।
সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ নীচ থেকে ব্রেকফাস্ট সেরে ওপরে এসে সবে বসেছি, এমনি সময়ে মিস্টার ভিরাবাগু এসে ঢুকলেন। ভদ্রতা করে অনুমতি নেবার প্রয়োজনটুকুও মনে করলেন না।
ঘরে ঢুকেই তিনি হাঁকড়ে উঠলেন, এই দশ নম্বর ঘরটা আমি চেয়েছিলাম। এটা দেওয়া হল না কেন?
তার ধমকানিটা হজম করতে আমার একটু সময় লাগল। তারপর শান্ত গলায় বললাম, কাকে কোন ঘর দেওয়া হবে সেটা ঠিক করেন হোটেলের মালিক। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। এই ঘরটার জন্যে আপনার মতো আমি জেদ ধরিনি।
মিস্টার ভিরাবাগু বললেন, ঠিক আছে। এখন ঘরটা আমায় ছেড়ে দিন।
এবার আমি কঠিন স্বরে বললাম, না, এখন আর তা সম্ভব নয়। আমি গুছিয়ে বসেছি।
মিস্টার ভিরাবাগুর মুখটা চাপা রাগে থমথম করতে লাগল। একটু পরে বললেন, এখানে। আপনি কতদিন থাকবেন?
বললাম, ঠিক নেই। আপাতত সাত দিন তো বটেই। দরকার হলে আরও বেশি দিন হতে পারে।
এবার উনি অভদ্রের মতো আমাকে কিছু না বলেই আমার বিছানার ওপর পা ক্রস করে বসে বললেন, ঠিকঠাক বলুন তো কী জন্যে এখানে এসেছেন?
ঠিকঠাক কারণটা জানিয়ে দিলেই কথা কাটাকাটি ব্যাপারটা ঘটত না। কিন্তু ঐ যে মেজাজ বলে একটা রোগ আছে না ঐতেই বিপদ বাড়ে।
বললাম, সেটা জেনে আপনার লাভ?
উনি দ্বিগুণ রেগে বললেন, লাভ আছে বৈকি।
কিন্তু আমার কোনো লাভ নেই।
তা হলে আপনি বলবেন না?
বললাম আপনাকে বলতে আমি বাধ্য নই। আপনি আমায় বলবেন কি কোন উদ্দেশ্যে আপনারা এখানে এসেছেন?
এর উত্তর না দিয়ে ভিরাবাগু সাহেব উঠে পড়লেন। দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে উত্তেজিত ভাবে বলে গেলেন, আপনি আমায় চেনেন না। আপনার এই অবাধ্যতার প্রতিফল শিগগির পাবেন।
আমি ভেবে রেখেছিলাম আজ সকালে সুরঞ্জনবাবুর সঙ্গে বসে আদিবাসীদের কোন কোন উৎসবে যাব ঠিক করে ফেলব। কিন্তু কাল রাত্তিরে সুরঞ্জনবাবুর কাছে পাহাড়ের ওপরে ঐ রহস্যময় কালো পাথরের দুর্গার কথা শুনে আর তার আগে সন্ধেবেলায় শেকল খুলতে গিয়ে সেই অদৃশ্য হাতের চাপ আমাকে এতই ভাবিয়ে তুলেছিল যে, আদিবাসীদের উৎসব দেখার ব্যাপারটা চাপা পড়ে গিয়েছিল। কেবলই মনে হচ্ছিল অদৃশ্য হাতের সঙ্গে ঐ রহস্যময় দুর্গের কোনো সম্পর্ক আছে কিনা।
একটা প্রাচীন দুর্গ বা প্রাসাদ হলেই যে তা রহস্যময় হয় তা নয়। কিন্তু কাল সন্ধ্যায় ঐ দুর্গ সমেত পাহাড়টা যখন কোন মন্ত্রবলে দূর থেকে একেবারে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল তখন কিছুক্ষণের জন্যে আমি বিহ্বল হয়ে গিয়েছিলাম। আর তখনই দুর্গটিকে মনে হয়েছিল রহস্যময় বলে। তাছাড়া ঐ দুর্গে গেলে কী বিপদ ঘটতে পারে তা সুরঞ্জনবাবুর কাছ থেকে এখনও শোনা হয়নি। আমি তাই মাঝে মাঝেই বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াই যদি দুৰ্গটা ভালো করে আরও একবার দেখতে পাই। কিন্তু হতচ্ছাড়া ভিরাবাগু সক্কালবেলাতেই আমার মেজাজটা খারাপ করে দিল।
বেলা যত বাড়তে লাগল ভিরাবাগুর সঙ্গীরা ততই হৈ-হট্টগোল করতে লাগল। এক সময়ে ওরা আমার দরজা লক্ষ করে ইট-পাটকেল এমনকি কাপডিশও ছুঁড়তে লাগল। জানলা লক্ষ করে একটা হাঁসের ডিম এমনভাবে ছুড়ল যে আমার বিছানাটা নষ্ট করে দিল। শেষ পর্যন্ত আমি বাধ্য হলাম নীচে গিয়ে সুরঞ্জনবাবুর কাছে নালিশ করতে। সব শুনে সুরঞ্জনবাবু বললেন, কিছু করার নেই, সোমেশ্বরবাবু। কাছেপিঠে পুলিশও নেই যে ডেকে আনব।
