তা হলে কোন ঘরটা দেবেন?
ভাবছি আপনার পাশের ঘরটা কিংবা তার পরেরটা।
কদিন থাকবেন?
এক সপ্তাহের জন্যে বুক করেছেন। শেষ পর্যন্ত কদিন থাকবেন বলতে পারি না।
কথার জের ধরে বললাম, উনি কি ব্যবসার ধান্দাতেই এখানে এসেছেন?
তাই প্রথম মনে হয়েছিল। কারণ বড়োলোকেরা খনিজ সম্পদের খোঁজেই এখানে আসেন। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এঁর অন্য কোনো ধান্দা আছে।
কী রকম?
সুরঞ্জনবাবু পকেট থেকে তাসের মতো একটা রঙিন নকশা সাবধানে বার করে দেখালেন।
আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। বললাম, এর অর্থ কী? কোথায় পেলেন এটা?
সকালে কাউন্টারের সামনে যেখানে দাঁড়িয়ে মিস্টার ভিরাবাগু কথা বলছিলেন, উনি চলে যাবার পর সেইখানেই এটা কুড়িয়ে পাই। বোধহয় পার্স খুলে টাকা দেবার সময় পড়ে গিয়েছিল।
কিন্তু জিনিসটা কী?
এটা একটা সাংকেতিক চিহ্ন।
হেসে বললাম, স্কুল লাইফে এই রকম গুপ্তধন সংক্রান্ত ম্যাপ বা সাংকেতিক চিহ্ন নিয়ে অনেক অ্যাডভেঞ্চারের বই পড়েছি।
সুরঞ্জনবাবু কিন্তু হাসলেন না। বললেন, বইগুলো হয়তো লেখা হয়েছিল কল্পনা করে। কিন্তু তখনকার দিনে অনেক রাজা-মহারাজা জমিদারেরা শত্রুর আক্রমণের ভয়ে ধনসম্পত্তি কোনো গোপন জায়গায় লুকিয়ে রাখতেন যাতে শত্রু প্রাসাদে ঢুকে সেসবের সন্ধান না পায়। আবার সেই গোপন জায়গাটা যাতে পরে উত্তরাধিকারীরা খুঁজে পায় তার জন্যে নকশা বা সাংকেতিক চিহ্নর ব্যবস্থা থাকত।
বললাম, সে তো জানি। কিন্তু এই ছত্রিশগড়ে রাজা-জমিদার কোথায়?
সুরঞ্জনবাবু বললেন, আজ নেই, কিন্তু একদিন ছিল।
ও আচ্ছা, আপনি ছেদী রাজবংশের কথা বলতে চাইছেন?
হ্যাঁ। আজকের ছত্রিশগড় নামটা শুধু ছেদিসগড় থেকেই হয়নি। ছেদী রাজাদের ছত্রিশটা বিশাল বিশাল গড় অর্থাৎ দুর্গ ছিল। সেসব দুর্গের মধ্যে রতনপুর, বিজয়পুর, মারো, ছুরি, কেন্দ্রা, পেন্ড্রা এইরকম কতকগুলো গড় এখনও দেখা যায়। বাকিগুলি ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। এইসব গড়ে শত্রু আক্রমণকালে গোটা রাজপরিবার তাদের সোনাদানা, হিরে, জহরৎ সব নিয়ে আত্মগোপন করে থাকতেন। কাজেই এইসব পরিত্যক্ত গড়গুলোতে
বললাম, বুঝতে পেরেছি। গোপন ঐশ্বর্য থাকা সম্ভব। তা আপনি কি মনে করে মিস্টার ভিরাবাগু সেই রকম কোনো গুপ্তধনের সন্ধান পেয়েছেন?
অসম্ভব নয়।
আমি একটু ভেবে বললাম, আচ্ছা, উনি এই ঘরটা নেবার জন্যে এত ঝুলোকুলি করছিলেন কেন?
সে তো শুনলেনই। ঘরটা নাকি পয়া। অদ্ভুত কথা। যিনি আগে কোনো দিন এখানে আসেনইনি, তিনি কী করে জানলেন এই ঘণ্টা পয়া? ভদ্রলোক ভেবেছেন আমি এতই বোকা! শেষ পর্যন্ত স্বীকার করলেন নিজে না এলেও আগে যারা এসেছিল তাদের কাছ থেকেই নাকি শোনা। গুল মারার আর জায়গা পায়নি। সত্যি বলছি সোমেশ্বরবাবু, ভদ্রলোকের এইরকম চালবাজি দেখে আমি খুব বিরক্ত হয়েছি।
একটু থেমে ফের বলতে লাগলেন, এই ঘরটার ওপর তার আগ্রহের কারণ সম্বন্ধে আমার এখন অন্য ধারণা হয়েছে।
সুরঞ্জনবাবু একটু থামলেন।
সাগ্রহে জিগ্যেস করলাম, কী?
প্রশ্ন করার সঙ্গে সঙ্গে আমার বুকের মধ্যে হৃৎপিণ্ডটা লাফালাফি শুরু করে দিল। সত্যি কথাই বলছি–আমি হঠাৎ ভয় পেলাম। মনে হল এই ঘর সম্বন্ধে কোনো কথা এই রাত্রিবেলা না তুললেই পারতাম। কারণ যে যাই বলুক আজই সন্ধেবেলা এই ঘরের শেকল খুলতে গিয়ে আমার হাতের ওপর যে অদৃশ্য হাতের চাপ অনুভব করেছিলাম তা তো ভুলতে পারিনি।
সুরঞ্জনবাবু বললেন, আপনার ঘরের বারান্দা থেকে সোজা উত্তর দিকে তাকালে অল্প দূরে একটা পাহাড়ের ওপর দুর্গ দেখতে পাবেন। এটা ঠিক দুর্গ কিনা আমার পিতৃদেব কিংবা রতনলালকাকুও বলতে পারেননি। উচ্চতায় ছোটো কিন্তু অনেকখানি জায়গা নিয়ে পাহাড়ের ওপর ওটা বোধহয় একটা গড়ই ছিল। যে কোনো কারণেই হোক ওটার একটা দিক ভেঙে পড়েছে। গড়টা আগাগোড়া কালো পাথরে তৈরি। পাথরে গড়া বাড়ি ভাঙল কী করে সে এক রহস্য। দ্বিতীয় রহস্য হচ্ছে এখান থেকে খুব দূরে না হলেও এটি দিনের বেলাতেও সব সময়ে খালি চোখে দেখা যায় না। পাথরটার রঙ এমনই যে, মাঝে মাঝেই এটা যেন হারিয়ে যায়। আবার হঠাৎই স্পষ্ট হয়ে ভেসে ওঠে। এই গড় নিয়ে এখানে নানারকমের কাহিনি প্রচলিত আছে।
সুরঞ্জনবাবু একটু থামলেন। বললেন, আমার কথাগুলো শুনতে ইনটারেস্টিং লাগছে?
বললাম, অবশ্যই। কিন্তু বললাম না আজই বিকেলে সেই দুর্গা দেখতে পেয়েছিলাম।
সুরঞ্জনবাবু ফের একটা সিগারেট ধরিয়ে বলতে লাগলেন, অনেক রকম কাহিনি, উপকথা, গালগল্প চলে আসলেও আসল সত্যটা হল ওখানে কোনো একসময়ে ছেদী বংশের এক যুবরাজ থাকতেন। তাঁকে একদিন ওখানেই অতর্কিতে আক্রমণ করে হত্যা করা হয়। তাঁরই অগাধ ধনরত্ন ওই গড়ের মধ্যে কোথাও লুকানো আছে যার সন্ধান সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, ইংরেজ গভর্নমেন্ট পর্যন্ত তন্নতন্ন করে খুঁজেও পায়নি। কেউ কেউ বলেন গড়ের একটা অংশ ইংরেজরাই কামান দেগে উড়িয়ে দিয়েছিল ধনরত্ন হাতাবার উদ্দেশ্যে। কিন্তু সফল হয়নি।
হোটেলের এই দশ নম্বর ঘরটির বৈশিষ্ট্য দুপুরবেলায় সূর্য যখন ঠিক মাথার ওপর থাকে তখন এখান থেকে ঐ ভাঙা দুৰ্গটার ভেতর পর্যন্ত পরিষ্কার দেখা যায় যা অন্য কোনো জায়গা থেকে দেখা যায় না।
সুরঞ্জনবাবু একটু থামলেন। তারপর বললেন, মনে হচ্ছে ভিরাবাগু সাহেব নিশ্চয় ওখানে যাবার মতলব করছেন। তবে ওখানে গেলে যে কী মারাত্মক বিপদ ঘটতে পারে তা উনি জানেন না।
