বলতে বলতে উনি বিছানার ওপর বসে পড়লেন। বিকেলে চা দিয়েছিল?
মাথা দুলিয়ে সায় দিলাম। তবে ছেলেটা খুব মিশুকে বলে মনে হল না। একটু যেন এড়িয়ে চলতে চায়।
আসলে কী জানেন? এ অঞ্চলের লোকেরা যেমন নিরীহ তেমনি ভীতু। ওদের কেবলই ভয় এই বুঝি চাকরি গেল। বড়ো গরিব। অল্পে তুষ্ট। সামান্য বাসি ভাত আর একটু নুন হলেই এরা খুশি। সে তুলনায় হোটেলে তো ওরা রাজভোগ খায়। তাই সব সময় তটস্থ।
এখানকার খাওয়ার স্ট্যান্ডার্ড বোধহয় ভালোই?
সুরঞ্জনবাবু হেসে বললেন, এ বেলা খেলেই বুঝবেন। মাংসে অরুচি নেই তো?
হেসে বললাম, না, মোটেই না।
উনি আমার অনুমতি নিয়ে একটা সিগারেট ধরালেন।
বললাম, তখন বলেছিলেন এই হোটেলের মালিক দিল্লিতে থাকেন, তা হলে তো আপনার দায়িত্ব অনেকটাই।
সুরঞ্জনবাবু বললেন, তা বলতে পারেন। এক সময়ে রায়পুরে যখন উনি থাকতেন তখন আমার বাবার সঙ্গে খুব বন্ধুত্ব ছিল। নিতান্তই শখ করে রায়পুর-বিলাসপুর থেকে ঢের দূরে এই রকম নির্জন জায়গায় তিনি হোটেল খুললেন। উদ্দেশ্য বাইরে থেকে ভ্রমণবিলাসীরা এসে এখানকার আদিবাসীদের নানা উৎসব, যা একেবারে খাঁটি লোকসংস্কৃতি বলতে পারেন, দেখবার সুযোগ পায়। আর সে উৎসব বছরে দুটো চারটে নয়, প্রায় প্রতিমাসেই দুটো-তিনটে। আপনিও তো বললেন সেই উদ্দেশ্যেই এখানে এসেছেন।
বললাম, হ্যাঁ। আমি আদিবাসীদের নিয়ে গবেষণা করি।
তা ছাড়া এখানে নানা খনিজ সম্পদ আছে। যেমন ধরুন কয়লা, ডলোমাইট, বক্সাইট, আয়রন ওর, লাইম স্টোন, টিন, ম্যাঙ্গানিজ–এত খনিজ সম্পদ ভারতবর্ষে আর কোথাও আছে বলে জানি না। আর এই সব খনিজ সম্পদের টানেও ধনী লোকেরা ব্যবসার খাতিরে এখানে আসতে চান। কিন্তু থাকার জায়গা ছিল না। আমার বাবার বন্ধু সেই অসুবিধাটা দূর করলেন। এতটুকু লাভের মুখ চেয়ে নয়, নিতান্তই পরোপকারের জন্য। আর আমাকে দায়িত্ব দিয়ে গেলেন হোটেলটা চালাতে। যাবার সময় একটা অদ্ভুত কথা বলেন, লাভ হলে তোমার, লোকসান হলে আমার। বলে সুরঞ্জনবাবু হাসলেন।
বললাম, এ রকম মানুষ বড়ো একটা দেখা যায় না। তা আপনি তো এখানেই থাকেন?
হ্যাঁ।
একাই?
হ্যাঁ। একাই বেশ আছি। হোটেলেই খাই। হোটেলেরই ওদিকের একটা ঘরে থাকি।
একটু চুপ করে থেকে বললাম, কত বছর হোটেলটা হয়েছে?
তা দশ বছর হল।
রেডি বাড়ি পেয়েছিলেন বলে হোটেল খোলা সম্ভব হলো।
সুরঞ্জনবাবু একটু ভেবে বললেন, তা ঠিক। তাও একরকম বেওয়ারিশ বাড়ি।
আমি চমকে উঠে বললাম, বেওয়ারিশ বাড়ি। মানে?
সুরঞ্জনবাবু বললেন, রতনলালকাকু, অর্থাৎ বাবার সেই বন্ধু অত বড়ো খালি বাড়িটা কিনতে গিয়ে বাড়ির মালিকের সন্ধান পেলেন না। কাগজে কাগজে বিজ্ঞাপন দিলেন। তবু কেউ দাবি করল না। স্থানীয় আদিবাসীদের কাছে খোঁজ নিতে যেতেই তারা ভয়ে শিউরে উঠল। ওরা জানাল বাড়িটা ভূতের। দিনের বেলাতেও কেউ ঐ বাড়ির ত্রিসীমানা দিয়ে হাঁটে না।
রতনলালকাকু তবু দমবার পাত্র নন। তিনি আদিবাসীদের সর্দারকে ডেকে জানতে চাইলেন কেন বাড়িটাকে ভূতের বাড়ি বলা হয়। সর্দারের বক্তব্য ইংরেজ সাহেবরা নাকি এখানেই প্রথম লাশকাটা ঘর করেছিল। কত বেওয়ারিশ লাশ এই বাড়ির মাটিতে পোঁতা আছে তার হিসেব নেই। এমনকি এক যুবরাজের লাশও নাকি এখানে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। এই রকম নানা কথা। গল্পগুলো রতনলালকাকুর মনে ধরল। তিনি ঠিক করলেন স্থানীয় লোকের ভয় দূর করার জন্যে এই বাড়িটাকেই হোটেল বানাবেন। বাইরের পাঁচ-দশ জন লোক যাতায়াত করলেই এখানকার লোকের অহেতুক ভয় দূর হয়ে যাবে।
বুঝলাম।
একটু পরে জিগ্যেস করলাম, আপনি তো অনেক দিন এখানে আছেন। তেমন কিছু
সুরঞ্জনবাবু বললেন, তেমন কিছু বলতে কী জানতে চাইছেন? ভূত-টুত? না মশাই, তেমন কিছু ঘটেনি আজ পর্যন্ত। আশা করি ঘটবেও না। তবে
তবে কী?
তবে মাঝে মাঝে উত্তর দিক থেকে, ঐ পাহাড়ের দিক থেকে একটা দমকা বাতাস বয়ে যায়। এখানকার লোকেরা ঐ বাতাসকে বড্ড ভয় পায়। বলে প্রেতের দীর্ঘনিশ্বাস।
বললাম, আপনিও কি তা বিশ্বাস করেন?
পাগল!
একটু থেমেই আবার বললেন, যাক ওসব বাজে কথা। যেজন্যে আপনি এসেছেন অর্থাৎ আদিবাসীদের পালপার্বণ দেখতে, তার কোনো প্রোগ্রাম করেছেন? কবে কোনটি দেখবেন? তা হলে আপনার সঙ্গে একজন অভিজ্ঞ লোক দিতে পারি।
বললাম, সবে তো আজ এলাম। কাল ঠিক করব। আর এ বিষয়ে আপনার সাহায্য নিতেই হবে।
হ্যাঁ, অবশ্যই বলে দেব কোন সময়ে কোন উৎসব। পোলা আর তিজা উৎসব শেষ হয়ে গেছে। এর পরই গণেশ পুজো। তারপর নবরাত্রি, তারপর দশেরাসুরঞ্জনবাবু থামতেই চান না। অথচ আমার মাথায় তখন অন্য রহস্যের জাল জড়িয়ে আছে।
বললাম, আচ্ছা, মিস্টার ভিরাবাগুর খবর কী? এসেছেন?
সুরঞ্জনবাবু বললেন, না। টাকা জমা দিয়ে গেছেন যখন আসবেন নিশ্চয়। তবে কী জানেন? এঁদের কথার ঠিক নেই। আমাদের মতো সাধারণ মধ্যবিত্তদের পাত্তাই দিতে চান না।
জিগ্যেস করলাম, ওঁকে কোন ঘরটা দেবেন ভাবছেন?
উনি তো এই ঘরটাই নেবার জন্যে জেদাজেদি করছিলেন।
তা দিলেন না কেন? আমার অন্য ঘর হলেও চলত।
সুরঞ্জনবাবু বললেন, তা জানি। কিন্তু যে ঘরটা একজনকে দেওয়া হয়ে গেছে সেটাই তাঁকে পেতে হবে তার কী মানে আছে? আমায় আবার টাকার লোভ দেখাচ্ছিলেন!
