পায়চারি করতে করতে কত কথাই মনে হতে লাগল। কোথায় কলকাতা আর কোথায়। এই ছত্রিশগড়!
কিছুকাল আগেও কেউ ছত্রিশগড়-এর নাম শোনেনি। শোনবার কথাও নয়। ভারতবর্ষের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো প্রদেশ ছিল মধ্যপ্রদেশ। চার কোটি পনেরো লক্ষের মতো লোক বাস করত। তার মধ্যে বাঙালিই ছিল দু লক্ষ পঁয়ত্রিশ হাজারের কাছাকাছি। তারপর এই সেদিন মধ্যপ্রদেশের বিরাট শরীর থেকে বেশ কিছু অংশ কেটে হাল্কা করে দিয়ে তৈরি করা হল আলাদা একটা রাজ্য। যার নাম হল ছত্রিশগড়। এর মধ্যে ঢুকল বিলাসপুর, সুরগুজা, রায়গড়, রায়পুর, দ্রুগ, স্যাডোল আর বস্তারের মতো ভালো ভালো জেলাগুলো।
ছত্রিশগড়! পুরাতত্ত্ব বিভাগের তথ্য অনুযায়ী বুদ্ধদেবের সময়ে আজকের এই ছত্রিশগড়েরই নাম ছিল নাকি মহাকোশল!
তাহলে কোশল থেকে ছত্রিশগড় নাম হল কী করে? দুটো নামের মধ্যে তো এতটুকু মিল নেই।
এই সব প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে আমার বেশ ভালো লাগে।
আসলে ইতিহাসবেত্তারা শুনিয়েছেন অন্য কথা। এক সময়ে ঐ মহাকোশলে রাজত্ব করতেন ছেদী বংশের রাজারা। তাদের নাম থেকেই ছেদিসগড়–তা থেকে হয়ে দাঁড়াল ছত্রিশগড়।
বহু প্রাচীন জায়গা এই ছত্রিশগড় বা ছেদিসগড়। তাই মনে হতে লাগল চারিদিকে এই যে শাল-সেগুনের গভীর অরণ্য, দূরে ঐ যে অস্পষ্ট পাহাড়ের রেঞ্জ, এই যে পুরনো পুরনো ভাঙা বাড়ি–এসবের মধ্যে লুকিয়ে আছে না জানি কত ইতিহাস–কত ভয়ংকর কাহিনি।
এখন শরৎকাল। বেলা ছোটো হয়ে এসেছে। বড্ড তাড়াতাড়ি সন্ধে হয়ে আসছে। এখনও দূরে বাতাসে কাশফুলের মাথাগুলো দুলতে দেখা যাচ্ছে।
হঠাৎ দূরে ঘোর কালো কী একটা বস্তু যেন দৈত্যের মতো মাটি খুঁড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে বলে মনে হল। এতক্ষণ ওদিকটায় মেঘ ছিল বলে ওটা দেখা যায়নি। এখন মেঘ সরে যাওয়ায় জিনিসটা চোখে পড়ল।
কী ওটা? ছোটো একটা পাহাড়? অথবা দুর্গের আকারে কোনো উঁচু বাড়ি?
যাই হোক, কেন জানি না ঐ দিকে বেশিক্ষণ তাকানো যায় না। কেমন যেন ভয় করে। তাই ঘোর অন্ধকারে ওটা দৃষ্টির আড়ালে অদৃশ্য হবার আগেই আমি ঘরের দিকে পা বাড়ালাম। কিন্তু
কিন্তু বারে বারেই সেই বস্তুটার দিকে তাকাবার জন্যে মনের মধ্যে উথালপাথাল করতে লাগল। সেই তীব্র আকর্ষণের কাছে আমাকে শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করতেই হল। ঘরের দিকে আমি দুপা এগোই আর একবার করে পিছনে ফিরে দেখি।
এক সময়ে আমার এমনও মনে হল ঐ বিশ্রী বস্তুটা অন্ধকারে গা মিলিয়ে দুলতে দুলতে যেন আমাদের হোটেলটার দিকেই এগিয়ে আসছে।
কেন এরকম মনে হল তার কোনো কারণ আজও খুঁজে পাই না। তখনও জানতাম না একটু পরেই আরও কিছু অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হবে।
আমি যখন ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালাম তখন অন্ধকার হয়ে গেছে। খোলা বারান্দায় পায়চারি করতে আসার আগে আমি ঘরের দরজায় শেকল তুলে এসেছিলাম। এখন দরজা খোলবার জন্যে শেকলে হাত দিতে গিয়ে আঁতকে উঠলাম। লোহার মতো একটা কঠিন হাত শেকলটা মুঠোর মধ্যে ধরে আছে যেন দরজা খুলতে দেবে না। আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, কে?
সঙ্গে সঙ্গে সেই অপরিচিত হাতখানি অদৃশ্য হয়ে গেল। শেকলটা ঝনাৎ করে আপনিই খুলে গেল।
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে গাঢ় অন্ধকারের মধ্যে আমি বিভ্রান্ত হয়ে পড়লাম। কোন দিকে সুইচ, কোন দিকে আমার বিছানা, কোন দিকে ড্রেসিং টেবিল সব যেন খুলিয়ে গেল। এদিকে বুকের মধ্যে হৃৎপিণ্ডটা লাফালাফি করছে। এই শরতের সন্ধ্যাতেও কপালে বিনবিনে ঘাম। এখন সর্বাগ্রে দরকার আলো। কিন্তু সুইচটা কোন দিকে?
বেশ কয়েকবার এদিক থেকে ওদিক ঘুরে, দেওয়ালে বার কতক ঠোক্কর খেয়ে সুইচটা খুঁজে পেলাম। আলো জ্বলে উঠল, এতক্ষণে আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম।
পুরো এক গেলাস জল খেয়ে আমি বিছানায় বসলাম। তারপর শুয়ে পড়লাম।
এবার ভাবতে লাগলাম, ব্যাপারটা কী হল? আমি শহর কলকাতায় থাকি। এই ধরনের অলৌকিক, অবৈজ্ঞানিক ব্যাপার মোটেই বিশ্বাস করি না। তা হলে একটু আগে এই যা ঘটল তার ব্যাখ্যা কী? প্রথমটার কথা ছেড়েই দিলাম। ওটা না হয় পরিবেশের প্রভাবে মনের ব্যাপার, কিন্তু শেকল চেপে ধরেছিল যে হাতটা সেটা তো শুধুই মনের ব্যাপার নয়। কে? বলে হুংকার দিতেই হাতটা যে সরে গেল সে ব্যাপারটাকে তো কিছু না, মনের ভুল বলে উড়িয়ে দিতে পারব না। তাছাড়া ঝনাৎ করে শেকলটার খুলে পড়া? আমি তো খুলিনি।
এই সব ভাবছি, এমনি সময়ে সিঁড়ির দিকের দরজায় শব্দ হল ঠুকঠুকঠুক।
কে আবার এল এখন? মনে পড়ল সুরঞ্জনবাবুর আসার কথা। উনি এলে ভালোই। কিন্তু ওঁকে কি এই যা সব ঘটল, যার কোনো প্রমাণ নেই, তা বলা যাবে?
.
পাহাড়ের উপর কেল্লা
সুরঞ্জনবাবু ঢুকলেন হাসতে হাসতে। প্রথমেই বললেন, সিঁড়ির দরজাটা শুধু ভেজিয়ে রেখেছিলেন, খিল দেননি?
অন্যমনস্কভাবে উত্তর দিলাম, তা হবে। সন্ধেবেলাতেই খিল লাগাতে হবে ভাবিনি।
সুরঞ্জনবাবু গার্জেনের মতো উপদেশ দিয়ে বললেন, নানা, সব সময়ে খিল দিয়ে রাখবেন। পাহাড়-জঙ্গলের জায়গা, বিপদ ঘটতে কতক্ষণ?
অবাক হবার ভান করে বললাম, বিপদ? কিসের বিপদ?
সুরঞ্জনবাবু সহজভাবেই বললেন, বিপদ যে কত রকমের হয় আর কখন কোন দিক দিয়ে ঘাড়ে এসে পড়ে তা কেউ বলতে পারে না, সোমেশ্বরবাবু। মোট কথা একটু সাবধানে থাকতে হয়। বাঃ, এর মধ্যেই ঘরটা বেশ গুছিয়ে ফেলেছেন তো!
