সুরঞ্জনবাবু অবাক হয়ে বললেন, দশ নম্বর। যত দূর আমার মনে হচ্ছে এ হোটেলে এর আগে আপনি কখনও আসেননি। তাহলে দশ নম্বর ঘরটাই চাইছেন কেন? কোনো বিশেষত্ব আছে কি?
মিস্টার ভিরাবাগুর চোয়ালটা শক্ত হল যেন। একটু ভেবে ভাঙাভাঙা বাংলায় বললেন, speciality আছে কিনা জানি না তবে আমার পরিচিতদের মধ্যে আগে যাঁরা এখানে থেকে গেছেন তাদের কেউ কেউ বলেছেন, এখানে এলে যেন দশ নম্বর ঘরটা নেবার চেষ্টা করি। কারণ ও ঘরটা নাকি পয়া। অ্যান্ড ইউ নো, আমি যখন নতুন ব্যবসার সন্ধানে এ অঞ্চলে এসেছি তখন ঐ ঘরটাই নেব।
But I am sorry, আমি খুবই দুঃখিত মিস্টার ভিরাবাগু, এ ঘরটা মাত্র ক মিনিট আগে বুকড় হয়ে গেছে।
কিন্তু ঐ ঘরটাই যে আমি চাই। তার জন্যে যদি বেশি টাকা দিতে হয় দেব।
বেশি টাকার কথায় অমন হাসিখুশি সুরঞ্জনবাবুর গলার স্বর বদলে গেল। বললেন, একবার একটা ঘর কাউকে অ্যালট করা হয়ে গেলে ডবল টাকা দিলেও তা আর কাউকে দেওয়া যাবে না।
এররম স্পষ্ট কথায় মিস্টার ভিরাবাগুর দুই চোখ জ্বলে উঠল। তিনি শান্ত গম্ভীর গলায় বললেন, একটা কথা জিগ্যেস করতে পারি?
করুন।
এই হোটেলের মালিক কি আপনি?
সুরঞ্জনবাবু বললেন, না। আমি কর্মচারী মাত্র।
তা হলে মালিকের সঙ্গে আমি কথা বলতে চাই।
তিনি এখানে থাকেন না।
কোথায় থাকেন?
দিল্লিতে।
ব্যবসায়ী ভদ্রলোক যেন হতাশায় ভেঙে পড়লেন, My God!
একটু ভেবে নরম গলায় বললেন, তা হলে কোনো উপায়ই নেই?
অত বড়ো লোকটার ঐ রকম হতাশ হয়ে পড়া অবস্থা দেখে আমার মনটাও ভিজে গেল। আমার কাছে পয়া-অপয়ার কোনো ব্যাপার নেই। ছত্রিশগড়ের আদিবাসীসের নানারকম পরবের কথা শুনেছি, হাতে অঢেল সময়, তাই ছুটে এসেছি এখানে। আদিবাসীদের পরব দেখা ছাড়াও প্রকৃতির দৃশ্য, পুরনো গড় এসব দেখার লোভও আছে। এসবের সঙ্গে পয়া অপয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। কাজেই দশ নম্বর ঘরটার বদলে যদি নয় নম্বর ঘর পাই তাতে আমার ক্ষতিবৃদ্ধি নেই। বরঞ্চ আর একজনের উপকার হবে।
মনে মনে কথাগুলো আউড়ে মুখে প্রকাশ করতে যাচ্ছি, সুরঞ্জনবাবু তা বুঝতে পেরে আমায় হাত টিপে নিরস্ত করলেন। ব্যবসায়ী বাবু তা বুঝতে পারলেন না।
সুরঞ্জনবাবু বললেন, আমি খুবই দুঃখিত মিস্টার ভিরাবাগু, এখনই ঐ ঘরটা দিতে পারছি না।
ভিরাবাগু বললেন, তা হলে দোতলায় নর্থ ফেসিং যে কোনো একটা ঘর দিন। বলে পার্স খুলে একগোছা নোট বের করলেন।
সুরঞ্জনবাবু হোটেলের খাতাটা বের করে সামনে ধরলেন। মিস্টার ভিরাবা নাম-ঠিকানা ইত্যাদি লিখলেন।
ঘর বুক করা রইল। মালপত্তর নিয়ে একটু পরে আমি আসছি।
বলে চলে যাচ্ছিলেন, ফিরে দাঁড়িয়ে বললেন, হয়তো আরও জনা তিনেক আসতে পারেন। আমার নাম করলে অনুগ্রহ করে তাদেরও একটু জায়গার ব্যবস্থা করে দেবেন।
আচ্ছা। বলে সুরঞ্জনবাবু খাতাপত্তর তুলে রেখে কী বোর্ড থেকে চাবি নিয়ে আমাকে ডাকলেন, আসুন।
.
অদৃশ্য হাতের চাপ
ঘরের তালা খুলে নিজে হাতে ঝাড়ন দিয়ে বিছানা, চেয়ার, টেবিল, ড্রেসিং আয়না পরিষ্কার করে আমায় সযত্নে ঘরে অধিষ্ঠান করিয়ে দিয়ে সুরঞ্জনবাবু যখন নীচে অফিস ঘরে চলে গেলেন তখন সবে দুপুর গড়িয়ে বিকেল। আশ্বাস দিয়ে গেলেন সন্ধেবেলায় আবার আসবেন। আমি ব্যাগ থেকে হালকা একটা চাদর বার করে বিছানায় পেতে নিলাম। টর্চটা রাখালাম বালিশের পাশে।
একটা পুরনো বাড়ির ঘর আর কত ভালো হতে পারে? তবু চারদিক খোলা উত্তরমুখী ঘরটা ভালোই। সে আমলের মোটা মোটা গরাদ আর খড়খড়ি দেওয়া বড়ো বড়ো জানলা দিয়ে আলো-বাতাসের অবাধ খেলা চলছে।
বাড়ির মতো টেবিল চেয়ারও পুরনো। টেবিলের পায়া বোধহয় ভেঙে গিয়েছিল। সম্প্রতি নতুন একটা পায়া লাগানো হয়েছে। ঘরের লাগোয়া বাথরুমে একটা শাওয়ার আছে বটে তবে জল পড়ে না। বাথরুমের জানলার শার্শি বিপজ্জনকভাবে ভাঙা। বিপজ্জনক এই কারণে যে, পাশেই যে আমগাছটা ডাল মেলে দিয়েছে হোটেলের ছাদের ওপর, সেই ডাল ধরে যে কেউ বাথরুমের জানলাটার নাগাল পেয়ে যাবে। তারপর ভাঙা শার্শির মধ্যে দিয়ে হাত ঢুকিয়ে ছিটকিনি খুলতে অসুবিধে হবে না।
ঠিক করলাম সন্ধ্যায় সুরঞ্জনবাবু যদি আসেন তা হলে কালকেই যাতে নতুন কাচ বসানো হয় সে কথা ওঁকে বলব। আর সেই সঙ্গে জিগ্যেস করব হোটেল করার আগে বহুদিনের এই বাড়িটা কী ছিল? অর্থাৎ আজ থেকে পনেরো-বিশ বছর আগে এই সব জায়গায় ক্কচিৎ লোক বাস করলেও পাকা বাড়ি তৈরি করে কোনো ধনী দুঃসাহসী লোক ছেলেপুলে নিয়ে থাকত এমন তো বিশ্বাস হয় না।
বেলা সাড়ে চারটের সময় হোটেলের বয় বেশ বড়ো কাপে চা আর প্লেটে খানকয়েক বিস্কুট দিয়ে গেল। তার সঙ্গে ভাব জমাবার জন্যে জিগ্যেস করলাম, তোমার নাম কী?
বিরস মুখে উত্তর দিল, মহেন্দ্র সেনাপতি।
দেশ কোথায়?
ভুবনেশ্বর।
তার মানে ওড়িয়া?
হ।
তা এত দূরে এলে কেন? কাছেপিঠে কি খুঁজলে কাজ পেতে না?
মহেন্দ্র তার উত্তর না দিয়ে নীচে নেমে গেল। বুঝলাম ছোকরা আলাপী না। অবশ্য তার ট্রেতে আরও কয়েক কাপ চা আর বিস্কুট ছিল। অন্য বোর্ডারদের বোধহয় এখনি দিতে হবে।
চা খেয়ে সামনের খোলা বারান্দায় পায়চারি করতে লাগলাম। আমার ঘরের ডান দিকে আরও তিনখানা ঘর। আলাপ করার মতো তেমন কেউ আছেন কিনা দেখবার জন্য ওদিকে গিয়েছিলাম। কিন্তু দেখলাম তিনটে ঘরেই তালা ঝুলছে। বুঝলাম ঘরগুলোতে বোর্ডার নেই। অগত্যা চুপচাপ নিজের ঘরের সামনের বারান্দায় পায়চারি করতে লাগলাম।
