সত্যিই কি ঐশ্বরিক ক্ষমতা বলে কিছু আছে? না কি সম্মোহনী শক্তি?
দশ মিনিটের মধ্যে টনির নিশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে এল। বিবর্ণ মুখে রক্ত চলাচলের লক্ষণ দেখা দিল।
ফাদার আরও আধ ঘণ্টা রইলেন। তারপর বললেন, আর ভয় নেই। এবার আমি চললাম। আর শোনো, যত তাড়াতাড়ি পার এখানে থেকে চলে যেও।
ফাদার চলে গেলেন। ওরা দুজনে কৃতজ্ঞ চিত্তে হাত জোড় করে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিল। বলল, টনি একটু সুস্থ হলেই আপনার কাছে নিয়ে যাব। ও কেবলই আপনার কথা বলে।
ফাদার কিছু বললেন না। একটু হাসলেন মাত্র। ডান হাতটা তুললেন। বিদায়!
ওরা ভেবেছিল ফাদার বোধহয় ট্যাক্সিতে এসেছিলেন। কিন্তু কোথায় ট্যাক্সি? অতখানি পথ হেঁটে এসেছিলেন?
নিশ্চয় তাই। ঐ তো হেঁটেই যাচ্ছেন। ঐ তো এখনও দেখা যাচ্ছে….
.
জনার্দনরা গড়িয়ায় নিজেদের বাসায় ফিরে এসেছে। মাসখানেক পর ফুল আর মিষ্টি নিয়ে ওরা তিন জনে গেল চন্দনপুরে। কিন্তু ফাদারের সঙ্গে দেখা হলো না। এক মাস আগে মারা গেছেন।
মৃত্যুর তারিখটা ছিল ১৬ ফেব্রুয়ারি। সময় বিকেল পাঁচটা।
[শারদীয়া ১৪০৩]
ছত্রিশগড়ের ভাঙা গড়
দশ নম্বর ঘর
হোটেলের ম্যানেজার ভদ্রলোকটিকে প্রথম দর্শনেই আমার ভালো লেগেছিল। এক একটি মুখ আছে যেটা আগে-ভাগেই যেন জানিয়ে দেয় মানুষটি কেমন হবে। এ ক্ষেত্রেও তাই। হোটেলে ঘর বুক করার জন্যে কাউন্টারের সামনে দাঁড়াতেই অপরিচিত মানুষটি নিতান্ত চেনা মানুষের মতো হেসে বললেন, নিশ্চয়ই কলকাতা থেকে আসছেন। একাই এসেছেন বুঝতে পারছি। আর নিশ্চয়ই ওপরে খোলামেলা একটা ঘর চাই যাতে চারদিকে প্রকৃতির শোভা দেখতে পান। তাই তো?
আমি হেসে বললাম, এক্কেবারে ঠিক।
ভদ্রলোক একটা লম্বা খাতা মেলে ধরে বললেন, নিন, এখানে নামধাম লিখুন। ভালো ঘরই দিচ্ছি।
নামধাম লিখতে লিখতে মনে মনে বললাম, ভালো ঘর যে সহজেই পাব তা বুঝতেই পারছি। কারণ ঘর নেবার জন্যে মোটেই ভিড় নেই।
কদিনের জন্যে থাকবেন ভাবছেন?
বললাম, দেখি। ভালো লাগার ওপর সব নির্ভর করছে।
আপনি নিশ্চয় এখানে এসেছেন ছত্রিশ-গড়িয়াদের উৎসব দেখতে?
হেসে বললাম, হ্যাঁ। কিন্তু আলাপ হতে না হতেই কী করে আসার কারণ পর্যন্ত ধরে ফেললেন? গোয়েন্দা-টোয়েন্দা নন তো?
ভদ্রলোক হেসেই বললেন, আরে না মশাই, ওসব কিছু নয়। আসলে দেখেছি কলকাতায় এক রকমের টিপিক্যাল বাঙালি আছেন যাঁরা প্যান্ট আর হাওয়াই শার্টের সঙ্গে কাঁধে একটা শান্তিনিকেতনী ব্যাগ ঝোলাতে ভোলেন না। এঁরা প্রায়ই হন কবি, শিল্পী কিংবা গবেষক। আপনার হাতে তো আবার দেখছি এ অঞ্চলের আদিবাসীদের নাচগানের ওপর লেখা ইংরিজি বইও রয়েছে–ফোক ডান্স।
মনে মনে ভদ্রলোকের লক্ষ করার শক্তির প্রশংসা করলাম। মুখে বললাম, হ্যাঁ, বইটা পড়তে পড়তে আসছিলাম, হাতেই থেকে গেছে।
ভদ্রলোক বললেন, কদিনের জন্য থাকবেন? আপাতত এক সপ্তাহ না হয় লিখুন।
আমি তাই লিখে টাকাপয়সা চুকিয়ে দিলাম।
আপনার নামটা জানতে ইচ্ছে করছে।
ভদ্রলোক তখনই ব্যাগ থেকে একটা কার্ড বের করে দিলেন। বললেন, নাম জানার ইচ্ছে বললে কম হয় মিস্টার বর্ধন, আমার নামটা জানতেই হবে। নইলে এই সাত দিন ধরে কি কেবল মিস্টার মান্না মিস্টার মান্না করবেন?
হেসে বললাম, আপনি ঠিকই বলেছেন, সুরঞ্জনবাবু। ধন্যবাদ।
সুরঞ্জনবাবু বললেন, দাঁড়ান, এবার আপনার ঘরের ব্যবস্থা করে দিই। লাগেজ তত বেশি নেই দেখছি। বলে টেবিলের ওপর রাখা পেতলের ঘণ্টিটা বাজালেন। একবার…দুবার……তিনবার। কিন্তু কেউ এল না।
নাঃ, এদের একটাকেও পাবার উপায় নেই। আসলে হয়েছে কী, বোর্ডার কম তো, কঁহাতক আর বসে বসে গামছা নেড়ে মাছি তাড়ায়। বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে একটু আড্ডা দিতে বেরিয়েছে আর কি। চলুন, আমিই আপনাকে ঘরটা দেখিয়ে দিই। বলে কী-বোর্ড থেকে চাবি নেবার জন্যে উঠতে যাবেন, একটা গাড়ি এসে থামল।
কে এল রে বাবা? বলে সুরঞ্জনবাবু চেয়ার থেকে অর্ধেক উঠে উঁকি মারলেন।
দেখলাম লম্বা-চওড়া বিরাটবপু একজন ভদ্রলোক গাড়ি থেকে নেমে ঝকঝকে জুতোয় মস মস শব্দ তুলে এগিয়ে এলেন। ভদ্রলোকের গায়ের রং কালো। পুরু গোঁফ। উজ্জ্বল দৃষ্টি। পরনে দামী সুট। তিনি যে যথেষ্ট ধনী তা তাঁর হাবভাব আর দুহাতের ছটা আঙুলে হিরে সমেত অন্য দামী পাথরের আংটির বহর দেখলেই বোঝা যায়।
সুরঞ্জনবাবু অন্তরঙ্গ বন্ধুর মতো আমার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললেন, উনি কী উদ্দেশ্যে এখানে থাকতে চান বলতে পারেন?
মাথা নাড়লাম।
বললেন, আমার ধারণা যদি ভুল না হয় তাহলে উনি হচ্ছেন একজন ঝানু ব্যবসাদার। এখানে এসেছেন নতুন কোনো ব্যবসার তাগিদে।
বিপুল চেহারার লোকটি কাউন্টারের সামনে এসে সুরঞ্জনবাবুর দিকে ডান হাতটা বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করে বললেন, I am Kartik Virabagu from Ranchi.
কার্তিক! চমকে উঠে বললেন সুরঞ্জনবাবু। বাঙালি?
মিস্টার ভিরাবাও যেন অনেক কষ্টে একটু হাসলেন। ক্ষণেকের জন্য ওপরের সারিতে তার সোনা বাঁধানো দাঁতটা দেখা গেল। বললেন, হ্যাঁ, আমি বাঙ্গালি খৃস্টান আছি। তবে বাঙ্গালা দেশের সঙ্গে আমার সম্পর্ক খুব কম আছে। আমার যা কিছু বিজনেস্ সব এদিকে। যাই হোক, কয়েক দিনের জন্যে একটা ভালো ঘর দিন। দোতলার দশ নম্বর ঘরটাই আমার পসন্দ।
