মূর্তিটা চলে এল বাড়ির কাছে। খিড়কির দরজার কাছে। হাতে কোদাল!
আবার কারো লাশ পোঁতা হলো নাকি? এবার বাগানবাড়িতেই?
তারপরেই চমকে উঠল টনি। এ কী? বাবা।
টনি দেখল চোরের মতো বাবা পা টিপে টিপে খিড়কির দরজা দিয়ে বাড়ি ঢুকল।
আশ্চর্য! এত রাতে বাবা ওখানে কোদাল নিয়ে কী করতে গেছিল? আর কৌতূহল চেপে রাখতে পারল না টনি। গায়ে সোয়েটার চড়িয়ে টর্চ নিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে পড়ল। বেরোতে গিয়ে জোরে হোঁচট খেল।
আন্দাজে আন্দাজে ঠিক জায়গাটায় গিয়ে পৌঁছল টনি। খুব সাবধানে হাতের আড়ালে টর্চটা একবার জ্বেলে জায়গাটা বুঝে নিল। তারপর দুহাত দিয়ে মাটি তুলতে লাগল। আর তখনই যে কবচটা ছিঁড়ে পড়ে গেল সেটা জানতে পারল না। এক সময়ে হাতে শক্ত মতো কিছু ঠেকল। টেনে তুলল সেটা। একটা বড়ো ক্যাশবাক্স। খুলে ফেলল ডালাটা। অমনি অন্ধকারে ঝলমল করে উঠল সেটা। একটা সোনার মুকুট।
আবার সাবধানে টর্চ জ্বালল টনি। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল মুকুটটা। মুকুটের গায়ে একটা স্লিপ আঁটা–এই মুকুট আমার একমাত্র পুত্র বাসুর জন্যে। অন্য কারো অধিকার নেই। –রতিকান্ত।
টনি অবাক! রতিকান্তকাকা। বাবার বন্ধু! উনি তো দুবছর আগে অ্যাকসিডেন্টে মারা গিয়েছেন। তার জিনিস বাবা কী করে পেল? এক মুহূর্তে সবকিছু তার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। লজ্জায়, দুঃখে টনির দুচোখ জলে ভরে উঠল।
এটা নিয়ে কী করবে এখন? বাবাকে তো বলা যাবে না, মাকেও না। তার চেয়ে যেমন আছে তেমনিই থাক। ভেবে সেটা আবার মাটি চাপা দিয়ে রাখল।
টনি উঠে দাঁড়াল। ঠিক তখনই তার পিঠে গরম নিশ্বাসের ছেকা লাগল। চমকে ফিরে দাঁড়াতেই দেখল মিস্টার গুর্গে একেবারে তার গায়ের কাছে দাঁড়িয়ে। এবার কোটের ভেতর থেকে ডান হাতটা বেরিয়ে এল। হাত নয়, শুধু সাদা হাড়। হাতটা ক্রমশ এগিয়ে আসছে টনির গলার দিকে।
টনি একবার প্রাণপণে চেঁচিয়ে উঠল, বাবা! তারপরেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
.
মৃত্যুর পদধ্বনি
১৬ ফেব্রুয়ারি।
এ বাড়িতে ওরা এসেছিল ৯ ফেব্রুয়ারি। মাত্র আট দিনে তিন জনের এই সংসারের ওপর দিয়ে যেন ঝড় বয়ে গেল। আজ সেই চরম দিনটি।
জনার্দন-মালতীর জীবনে শেষ আশার প্রদীপটি নিভতে চলেছে।
ভোরের আলো ফুটে উঠেছে। বিছানায় পড়ে রয়েছে টনির শীর্ণ দেহ। গোটা শরীর বিছানার চাদরের মতো সাদা।
সারা রাত্রি মাথার কাছে বসে রয়েছে জনার্দন আর মালতী। মালতী ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। জনার্দন যেন নিশ্চল পাথর।
বেলা দশটা।
টনির শরীর হিম হয়ে আসছে। মালতী চেঁচিয়ে উঠে বলল, বসে বসে দেখছ কী? ডাক্তার ডাকো।
ডাক্তার এখানে কোথায় পাব?
এখানে না পাও যেখান থেকে পার নিয়ে এসো।
অগত্য বেরোতে হল জনার্দনকে।
জোরে হেঁটে চলল জনার্দন-যেন ছুটছে।
তারপর যখন ট্যাক্সিতে করে ডাক্তার নিয়ে এল, বেলা তখন একটা।
ডাক্তার দেখলেন। প্রেশার মাপতে গিয়ে তিনি হতাশ হলেন। মুখ গম্ভীর করে তিনি উঠে গেলেন।
কেমন দেখলেন ডাক্তারবাবু? ওষুধপত্তর?
কোনো লাভ নেই। রাত কাটবে না।
জবাব দিয়ে ডাক্তার চলে গেলেন। নিরুপায় স্বামী-স্ত্রী চুপচাপ বসে রইল। মালতীর বুঝি কদার শক্তিও নেই। সে কেবল বলছে, আমি ওর মা নই। কিন্তু যিনি ওর সত্যিকার মা তিনি যেখানেই থাকুন তার ছেলেকে রক্ষে করুন।
যে জনার্দন জীবনে কখনো ভগবানের নাম মুখে আনেনি, হঠাৎ তার ঠোঁট কেঁপে উঠল। বিড়বিড় করে বলল, টনিকে বাঁচিয়ে দাও। আমি আর পাপের পথে যাব না।
কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। সন্ধে সাড়ে পাঁচটা।
শেষ শীতের বেলা–এখনও ছোটো। এরই মধ্যে ধূসর হয়ে আসছে। দেওয়ালের গায়ে অস্তসূর্যের একফালি রশ্মি কী করুণভাবে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে।
টনির দুচোখ বসে যাচ্ছে। ঘাড় বেঁকে যাচ্ছে। জোরে জোরে নিশ্বাস টানছে। শেষ প্রাণশক্তি দিয়ে নিশ্বাস নেবার চেষ্টা করছে।
জনার্দন চেঁচিয়ে উঠল, মালতী, মন শক্ত করো। টনি চলে যাচ্ছে।
মালতী ডুকরে কেঁদে উঠল।
ঠিক তখনই কে যেন দরজায় মৃদু কড়া নাড়ল। দুজনেই চমকে উঠল। কে এল আবার?
নিঃসংকোচে, নির্ভয়ে আজ জনার্দন উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিল।
এ কী আপনি!
সামনে দাঁড়িয়ে চন্দনপুরের পাদ্রীবাবা। সাদা গাউন, সাদা দাড়ি, সাদা চুল। গলায় ঝুলছে কালো কর্ডে কুশ। হেসে বললেন, টনিকে অনেকদিন দেখিনি। মন কেমন করল তাই চলে এলাম।
মালতী হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল। আর কী দেখবেন পাদ্রীবাবা? টনি তো–
ফাদার ধীরে ধীরে টনির বিছানার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। একবার কপালে হাত রাখলেন। তারপর চমকে উঠে বললেন, ওর কবচটা কোথায়?
তাই তো!
তন্ন তন্ন করে খুঁজতে লাগল ওরা। কিন্তু পাওয়া গেল না।
পাদ্রী বললেন, নিশ্চয় কোথাও ছিঁড়ে পড়ে গেছে। কোথায় পড়েছে শিগগির খুঁজে দেখুন।
জনার্দনের কী মনে হলো, সে তখনই ছুটল যেখানে কাল রাত্তিরে টনি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল। ভাগ্যক্রমে পেয়ে গেল কবচটা। হাঁপাতে হাঁপাতে হাতের মুঠোর মধ্যে ধরে নিয়ে এল ওটা।
ফাদার আর দেরি করলেন না। একটানে ছিঁড়ে ফেললেন নিজের গলার ক্রুশটি। সেই ছেঁড়া কর্ড দিয়ে কবচটা বেঁধে দিলেন টনির হাতে।
আপনাব ক্রুশ ছিঁড়ে ফেললেন। ওরা অবাক।
ফাদার হাসলেন। বললেন, এই তো পকেটে রাখলাম। এটা এবার আমার সঙ্গে কবরে যাবে।
