মালতী চিৎকার করে মাটিতে পড়ে গেল। মূর্তিটা পায়ে পায়ে তার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল।
এমনি সময়ে মা মা বলে টনি ঘরে এসে ঢুকল। চুল উস্কোখুস্কো। দুচোখে ঘুমের ঘোর। কিন্তু মুহূর্তেই তার ঘুম ছুটে গেল। ছুটে গিয়ে মাকে আঁকড়ে ধরল। গুর্গে সমস্ত শক্তি দিয়ে টনিকে ধরতে গেল। টনির হাতের কবচটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। লোহার রঙ বদলাতে লাগল। মূর্তিটা পিছতে লাগল। পিছতে পিছতে খোলা জানলা দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল।
.
ঘুম নেই
সন্ধের আগেই বাড়ি ফিরে সব শুনে জনার্দন থমকে গেল।
মালতী বার বার একই কথা বলতে লাগল, বলো কী খুঁজতে ও এসেছিল? টাকা-পয়সা তো কিছুই নেয়নি। বলো, দোহাই তোমার চুপ করে থেকো না। আমাদের কাছে কি এমন জিনিস আছে যার জন্যে একটা ভয়ঙ্কর প্রেত হানা দিচ্ছে?
এই শীতের সন্ধেতেও জনার্দনের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠল। মিনমিন করে বলল, তা আমি কেমন করে জানব?
হ্যাঁ, জান। নিশ্চয় জান। আমার কাছে তুমি লুকোচ্ছ।
একটু থেমে বলল, তুমি আমায় সব কথা বলো। প্রতিকার করতে হবে। নইলে আমাদের সবাইকে মরতে হবে। টনি তো আজ মরতে মরতে বেঁচে গেছে।
তবু জনার্দন চুপ করে রইল। উত্তর দিতে পারল না।
রাত সাড়ে এগারোটা।
ভালো করে দরজা এমনকি জানলাগুলোও বন্ধ করে জনার্দন শুয়ে আছে। পাশে মালতী। আজও কারো চোখে ঘুম নেই। কিন্তু কথা বলতেও সাহস হয় না। কে জানে হয়তো বাইরে কেউ ওৎ পেতে আছে।
রতিকান্ত……রতিকান্ত….রতিকান্ত…
এখন এই গভীর রাতেও জনাদনের একমাত্র চিন্তা রতিকান্তকে নিয়ে। রতিকান্ত যে সত্যিই খুন হবে জনার্দন তা ভাবতে পারেনি। তার মনে হয়েছিল লক্ষ্মীনারায়ণ ভয় দেখিয়েছিল মাত্র। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রতিকান্ত খুন হয় ডায়মন্ড হারবার রোডের কাছে ইদ্রিশ আলি লেনে ওর গোপন ডেরায়। ঠিকানাটা লক্ষ্মীনারায়ণকে জানিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল।
রতিকান্ত তার কাছে সোনার মুকুটটা গচ্ছিত রেখেছিল। জনার্দন সেদিন সহজ মনেই সেটা রেখেছিল। লকারে রাখার কথা মনে হয়েছিল, কিন্তু পরের জিনিস-ফ্যাসাদ হতে পারে, এইসব সাত-পাঁচ ভেবে সে ওটা গড়িয়ার বাড়িতেই রেখেছিল।
কিন্তু পনেরো দিনের মাথায় খবর পেল রতিকান্ত খুন হয়েছে। তবে তার লাশ যে তার এই বাগানবাড়ির কাছেই ঐ পরিত্যক্ত কবরখানায় পুঁতে দেওয়া হয়েছে তখনও তা জানত না।
রতিকান্তর হত্যার খবর শুনে জনার্দন দুঃখ পেয়েছিল, ভয় পেয়েছিল, আবার খুশিও হয়েছিল। তার মাথায় দুর্বুদ্ধি চাপল মুকুটটার তাহলে দাবিদার কেউ রইল না। তার ছেলে ফিরবে কিনা তার ঠিক নেই। ফিরলেও জিনিসটা যে তার কাছে গচ্ছিত আছে তা জানার উপায় নেই। জনার্দন সেদিনই মনস্থ করে ফেলল মুকুটটা রতিকান্তর ছেলেকে দেবে না।
ওটা কলকাতার বাসায় রাখা নিরাপদ নয়। লক্ষ্মীনারায়ণ চড়াও হতে পারে। তাই খোঁজ পাওয়ামাত্র এতদূরে নিরিবিলি আর নিশ্চিন্ত থাকার জন্য জলের দরে এই বাগানবাড়িটা কিনে ফেলল। রতিকান্তকে কাছেই কবর দেওয়া হয়েছে জানলে হয়তো এদিকেই আসত না।
এখানে আসার পর থেকেই শুরু হলো প্রেতহানা। প্রথমে বুঝতে পারেনি কে সে? এখন পরিষ্কার। কী উদ্দেশ্যে তার আক্রমণ তা এই মুহূর্তে জনার্দনের বুঝতে বাকি নেই। মুকুটটা তাকে ভোগ করতে দেবে না। আর বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি মৃত্যু।
মুকুটটা সে তাদের চৌকির গুপ্ত ড্রয়ারের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছে। তার স্ত্রীও তা জানে না।
কিন্তু এর পর?
.
এত রাতে কে ও?
ঘুম নেই টনির চোখেও। আজ কত বড়ো বিপদ থেকে যে সে বেঁচে গেছে সেই কথাই ভাবছিল। কিন্তু কেমন করে বাঁচল? কে বাঁচালো? এ কথা ভাবতে ভাবতেই তার ডান হাতটা উঠে গেল কবচটার ওপরে। ইস্! কারটা বদলাতেই হবে। নইলে কখন টুক করে ছিঁড়ে পড়বে।
কবচটার কথা মনে হতেই তার মনে পড়ল পাদ্রীবাবার কথা। সেই শান্ত করুণ স্নেহভরা। মুখখানি। সাদা পোশাক, সাদা দাড়ি। গলায় ঝুলছে কালো কর্ডে বাঁধা ক্রুশ।
কতদিন তাকে দেখেনি। ঠিক করল, এবার একদিন বাবা-মাকে নিয়ে চন্দনপুর যাবে। তখনই অন্য ভাবনা মাথায় এলো। সেই প্রেতমূর্তিটা এখন দিনের বেলাতেই হানা দিচ্ছে। কিন্তু কেন?
তারপরেই ভাবল এভাবে বাঁচা যাবে না। ঐ পিশাচটা বাবাকে তো মারবেই, মারবে মাকেও। আর সেও রেহাই পাবে না।
তাহলে?
বাড়ির দক্ষিণ দিকের জানলাটা খোলা ছিল। এই জানলা দিয়ে তাদের বাড়ির লাগাও যে অংশটা ঢালু হয়ে নেমে গেছে সেটা দেখা যায়। সেইদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ তার মনে হলো জমির শেষপ্রান্তে কী যেন নড়ছে।
লাফিয়ে উঠে বসল টনি। এগিয়ে গেল জানলার কাছে। কী নড়ছে ওখানে?
একটা মানুষ…ও কি ছাতা মাথায় দিয়ে? রাত্রে ছাতা মাথায় কেন? এখন তো বৃষ্টি হচ্ছে না।
চোর? ডাকাত? সমাজবিরোধীদের কেউ? ছাতার আড়ালে লুকিয়ে কিছু করছে? নাকি গুগেই নতুন বেশে? কিন্তু কি করছে ওখানে ছাতা মাথায় দিয়ে?
টনি একবার ভাবল ছুটে গিয়ে জাপটে ধরে লোকটাকে। কিন্তু এই প্রথম সাহস হলো না। অন্ধকারে গা মিশিয়ে সে জানলার গরাদে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
মিনিট পনেরো পরে মূর্তিটা উঠে দাঁড়াল। তারপর
মূর্তিটা এগিয়ে আসছে এদিকে। টনির গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। আজ রাত্রেও তাহলে কী–
অনেকটা এগিয়ে এসেছে মূর্তিটা। পরনে কালো প্যান্ট, গায়ে চাদর জড়ানো। মাথায় কালো ছাতা। অন্ধকারে বেশ মিশে গেছে।
